কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে ভাংচুর গুলি॥ ১৩ আনসার পুলিশ প্রত্যাহার ॥ তদন্ত কমিটি গঠন

vhangchur copy
লাবুয়াল হক রিপন ॥
যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে ‘বন্দি’ কিশোর ও দায়িত্বরত পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে ভাংচুর ও গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এতে পুলিশের দুই কনস্টেবল ও ১১জন বন্দি কিশোর আহত হয়েছে। ঘটনার সময় শুভ নামে এক কিশোর পালিয়ে গেলেও বিকেলে তাকে স্কাউট ভবন থেকে আটক করা হয়েছে বলে জানাগেছে। কিশোরদের নির্যাতন, নি¤œমানের খাবার পরিবেশন এবং পুলিশের ঘুষ আদায় নিয়ে রোববার সকালে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের ১৩ জন পুলিশ ও আনসার সদস্যকে প্রত্যাহার এবং তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।
কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের বন্দি সজিব জানায়, তার বাড়ি কুষ্টিয়া জেলার খোকশা এলাকায়। ৬ মাস আগে একটি হত্যা মামলায় সে যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে আসে। শনিবার সকালে তার মা ঢাকা থেকে তাকে দেখতে আসেন। এ সময় সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তার মায়ের কাছে ৩’শ টাকা ঘুষ দাবি করে। ওই ঘুষের টাকা দিতে না পারায় সারা দিন বসে থেকে বিকেলে তার মা আবার ঢাকায় ফিরে যান। এ নিয়ে সজিবের সাথে সেখানকার পুলিশের বাকবিতণ্ডা হয়। এরই জের ধরে রোববার সকালে পুলিশ সজিবকে মারপিট শুরু করে। এসময় আরো কয়েকজন কিশোর এসে সজিবকে মারপিটে বাধা দেয়। এক পর্যায়ে সজিবের সাথে থাকা অপর কিশোরদের উপরে পুলিশ এলোপাতাড়ি লাঠিপেটা শুরু করে। ঘটনাটি জানতে পেরে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের ভেতরে থাকা সকল কিশোররা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা রোববার সকালে অ্যাসেম্বিলি শেষ করে কেন্দ্রটির সহকারী সুপার আবুল বাশারের সঙ্গে দেখা করে ঘটনার প্রতিবাদ জানায় এবং প্রতিকার দাবি করে। সহকারী সুপার অভিযোগ করতে আসা কিশোরদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় উত্তেজিত কিশোররা উন্নয়ন কেন্দ্রের অন্তত ২০টি জানালা, প্রিজন ভ্যান, পুলিশ ব্যারাক, লাইব্রেরি, ডাইনিং রুম ভাংচুর করে। কয়েকজন কিশোর ভাঙ্গা গ্লাস দিয়ে নিজেদের হাত-পা কেটে রক্তাক্ত জখম করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ এবং পরে গুলি চালায়। দু’পক্ষের সংঘর্ষে পুলিশ (১৭৫৭) কনস্টেবল তুহিন ও (১৭৫৯) আলমগীর হোসেন এবং কিশোর নাজমুল, উজ্জল, শাকিল, রুবেল, জীবন, সজিব, জুনায়েদ, শাহাদৎ, সাগর ও লিটনসহ অন্তত ১৩ জন আহত হয়। ঘটনার সময় পুলিশ৫/৬ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমান ও পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম, সহকারী পুলিশ সুপার মিলু মিয়া বিশ্বাস, কোতোয়ালি থানা ও ডিবি পুলিশের ওসি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তা, দায়িত্বরত পুলিশ ও ভেতরে অবস্থানরত কিশোরদের সঙ্গে কথা বলেন।
এ সময় লিটন নামে এক কিশোর জানায়, পাহারার দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তা কর্মচারীদের টাকা না দিলে কোন অভিভাবকদের সাথে সাক্ষাত করতে দেয়া হয় না। কোন অভিভাবক এলে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা ঘুষ দেয়া লাগে।
আরিফুল ইসলাম ও মতিউর রহমান নামে দুই কিশোর জানায়, উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে তারা এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দেয়ার জন্য সহ-সুপার আবুল বাসারসহ কর্তৃপক্ষকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।
বাপ্পি নামে অপর এক কিশোর জানায়, তারা বিভিন্ন ট্রেডে কাজ শেখার জন্য চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানকার প্রশিক্ষকরা তাদের নিয়মিত ও সময় মত প্রশিক্ষণ দেয় না। তাদের তেল সাবান দেয়া হয় না। খাবারের মান খুবই খারাপ এবং সংখ্যায় ও অনেক কম। বিনোদনের জন্য পুরোনো আমলের একটি টিভি আছে কিন্তু ডিস লাইন নাই। খেলাধূলার জন্য জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সরঞ্জামাদি দেয়া হয়। সে গুলো বস্তায় করে আটকে রাখা হয়েছে। এমনকি জামিনের জন্য ওকালত নামায় স্বাক্ষর করতে লাগে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। বরাদ্ধকৃত ওষুধ সরবরাহ করা হয় না। পানির সংকটও রয়েছে।
পরে তারা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সাথে তাদের অভিযোগ তুলে ধরে।
এ সময় জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল হাসানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেনÑ সহকারী পুলিশ সুপার (সদর) রেশমা শারমিন ও সমাজসেবা অধিদফতরের সহকারী পরিচালক শাজাহান মিয়া।
তিনি আরো জানান, সাতদিনের মধ্যে এই কমিটিকে তদন্ত রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরো জানান, কেন্দ্রটিতে অবস্থানরত কিশোরদের জন্য দিনে খাবারের জন্য বরাদ্দ মাত্র ৫১ টাকা। আর মাসিক চিকিৎসা খরচ ৫০ টাকা। যৎসামান্য এই টাকাও সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় কি না তা খতিয়ে দেখবে নবগঠিত তদন্ত কমিটি।
পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান জানান, কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের ব্যারাকে দায়িত্বরত আট পুলিশ ও ৫ আনসার সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাদের স্থলে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অন্য পুলিশ ও আনসার সদস্যদের। পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের একজন করে প্রতিনিধি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন বলেও তিনি জানান।
কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহবুদ্দিন জানান, একজন অভিভাবক এক কিশোরের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে দায়িত্বরত পুলিশের সন্দেহ হয়। একারণে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করায় কিশোরদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে তারা হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও মারপিট করে। তবে বন্দিদের মা,বাবা, ভাই, বোনসহ নিকট আত্মীয় স্বজন ছাড়া আর কারোর দেখা করা সুযোগ নেই। কিন্তু জিসান নামে এক বন্দির বান্ধবী দেখা করতে এসেছিল। তাকে দেখা করতে না দেয়ায় তারা ক্ষিপ্ত হয়।
কেন্দ্রটিতে অবস্থানরত ‘বন্দিরা’ অভিযোগ করে, কর্মকর্তারা বিশেষ করে সহকারী সুপার আবুল বাশার ও ডে-গার্ড নূর ইসলাম কিশোরদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজও করেন। যেকারণে কিশোরদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
কেন্দ্রের সহকারী পলিচালক শাহবুদ্দিন জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই শুভ (১৮) নামে একবন্দি কিশোর পালিয়ে যায়। দ্বিতলা ভবন থেকে বিছানার চাদরের সাহায্যে সে পাশের স্কাউট ভবনের ছাদে পালিয়ে থাকে। তাকে বিকেলে উদ্ধার করা হয়। তার বাড়ি লালমনিরহাট জেলায়। সেখানকার এতিমখানা থেকে পালানোর পর যশোরের এই কেন্দ্রে আনা হয়।
উল্লেখ্য, কিশোর অপরাধীদের সংশোধনের জন্য স্থাপিত দেশের দুটি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের একটি যশোরে অবস্থিত। নানা অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে কেন্দ্রটি পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে। যেকারণে প্রায়ই এখানে অপ্রীতিকর ঘটনা এমনকী ‘বন্দি’ পালিয়ে যাওয়া এবং মৃত্যুর ঘটনার মতো গুরুতর অপরাধ সংগঠিত হয়।

শেয়ার