এবার রায় মীর কাসেমের

mir kashem
সমাজের কথা ডেস্ক॥
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর মামলার রায় ঘোষণা করা হবে যেকোনো দিন। রোববার মামলার সর্বশেষ ধাপ যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপন শেষ হওয়ায় মামলাটির রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
রোববার আসামিপক্ষে আইনি পয়েন্টে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন মীর কাশেম আলীর আইনজীবী ব্যারিস্টার তানভীর আহমেদ আল আমীন। এর পর আসামিপক্ষের জবাবে পাল্টা ও সমাপনী যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ।

এর মধ্য দিয়ে বিচারিক কার্যক্রম শেষ হলে বেলা ১২টার দিকে আইন অনুসারে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখে দেন চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল।

এ সময় চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, আমরা উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনলাম। সঙ্গে সঙ্গেই তো রায় দেওয়া যায় না। রায় লিখতে হবে, অনেক কিছু পর্যালোচনা করতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী মামলার রায় অপেক্ষমাণ রাখলাম।

প্রসিকিউশন মীর কাশেম আলরি বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন দাবি করে আইনি যুক্তিতর্কে মীর কাশেমের আইনজীবী তানভির আহমেদ আল আমীন আসামির খালাস চান। তিনি দাবি করেন, প্রসিকিউশন মীর কাশেম আলী যে আলবদর কমান্ডার ছিলেন সেটা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তার সুপ্রিম কমান্ড বা সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি (উর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) প্রমাণেও ব্যর্থ হয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষ।

সমাপনী যুক্তিতর্কে প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, টিক্কা খানরা খান খান করে দিয়েছিলেন এ দেশটিকে। সেখানে সৃষ্টি হয় আরেক ‘বাঙালি খানের’ নির্মম ইতিহাস।

১৯৭১ সালে মীর কাশেম আলীর নির্যাতনের প্রমাণ উঠে এসেছে। সেই ‘বাঙালি খান’ মীর কাশেম আলীর বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছি। আমরা তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাই।

গত ২৯ ও ৩০ এপ্রিল এবং ৪ মে রোববার মীর কাশেম আলীর পক্ষে ৩ কার্যদিবসে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তার আইনজীবী ব্যারিস্টার তানভীর আহমেদ আল আমীন ও অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম। আসামিপক্ষ মীর কাশেম আলীর বিরুদ্ধে ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১২ অভিযোগের বিষয়ে ঘটনাভিত্তিক এবং আইনি পয়েন্টে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন। ১ ও ৫ নম্বর অভিযোগে প্রসিকিউশনের সাক্ষী না থাকায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেননি আসামিপক্ষ।

অন্যদিকে গত ২৭ ও ২৮ এপ্রিল এবং ৪ মে রোববার মীর কাশেম আলীর বিরুদ্ধে ৩ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, জেয়াদ আল মালুম, সুলতান মাহমুদ সীমন ও রেজিয়া সুলতানা চমন। তারা মীর কাশেম আলীর বিরুদ্ধে ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১২টি অভিযোগের বিষয়ে ও আইনি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। ১ ও ৫ নম্বর অভিযোগে সাক্ষী না থাকায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেননি প্রসিকিউশন।

গত ২১ ও ২২ এপ্রিল মীর কাশেম আলীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন ৩ জন সাক্ষী। তারা হচ্ছেন- মীর কাশেম আলীর ছোট বোন মমতাজ নুরুদ্দিন, মোহাম্মদ আলী ও আবু তাহের খান। তাদেরকে জেরা করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ।

অন্যদিকে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর থেকে গত ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত মীর কাশেম আলীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলামসহ ২৪ জন সাক্ষী। তাদের মধ্যে ঘটনার অন্য ২০ সাক্ষী হলেন সৈয়দ মো. এমরান, মো. সানাউল্লাহ চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক নাসিরুদ্দিন চৌধুরী, সুনীল কান্তি বর্ধন দুলাল, শহীদপুত্র শিবু দাস, মৃদুল কুমার দে, প্রদীপ তালুকদার, মুক্তিযোদ্ধা এস্কান্দার আলম চৌধুরী, মো. সালাহউদ্দিন ছুট্টু মিয়া, মো. জাকারিয়া, নাজিমুদ্দিন, মো. হাসান (১), মো. হাসান (২), ফয়েজ আহমেদ সিদ্দিকী, জুলেখা খান, মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর চৌধুরী, হাসিনা খাতুন, এসএম জামাল উদ্দিন, এস এম সরওয়ার ঊদ্দিন এবং লুৎফর রহমান ফারুক।

আর জব্দ তালিকার তিন সাক্ষী হলেন চট্টগ্রাম পাবলিক লাইব্রেরির বুক সর্টার কাউসার শেখ, বাংলা একাডেমির সহকারী গ্রন্থাগারিক এজাব উদ্দিন মিয়া এবং বাংলা একাডেমির প্রধান গ্রন্থাগারিক মোবারক মিয়া।

তাদেরকে জেরা করেছেন আসামিপক্ষ।

গত বছরের ১৮ নভেম্বর মীর কাশেমের বিরুদ্ধে সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সিমন ও রেজিয়া সুলতানা চমন।

গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর মীর কাশেমের মামলা দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করেন ট্রাইব্যুনাল-১।

৫ সেপ্টেম্বর হত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও লুন্ঠনের ১৪টি মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করে মীর কাশেম আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল-১।

এর আগে ২১ আগস্ট অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ হয়।

১৬ মে প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুমসহ প্রসিকিউশন ১৪টি অভিযোগে মীর কাশেম আলীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেন।

২৬ মে এ অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।

গত বছরের ২ মে মীর কাশেম আলীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৪টি অভিযোগে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে জমা দেন তদন্ত সংস্থা। এ তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে ট্রাইব্যুনালের আদেশে মীর কাশেম আলীকে ২০১২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ও ১২ নভেম্বর দু’দফা সেফ হোমে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্ত সংস্থা।

২০১২ সালের ১৭ জুন মীর কাশেম আলীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে ওইদিন বিকেলে মতিঝিলে দৈনিক নয়া দিগন্ত কার্যালয়ের (দিগন্ত মিডিয়া কর্পোরেশন) থেকে তাকে গ্রেফতার করে বিকেল সোয়া চারটার দিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

ট্রাইব্যুনাল মীর কাশেম আলীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিলে ওইদিন রাত সাড়ে আটটার দিকে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর ১৯ জুন মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে মীর কাশেমের জামিন আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়।

মীর কাশেম আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, কাশেম আলী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম কলেজে পদার্থ বিজ্ঞানের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি ওই সময় চট্টগ্রাম কলেজ শাখা ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন। একইসঙ্গে তিনি চট্টগ্রাম শহর শাখারও সভাপতি ছিলেন।

পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক কার্যকরী পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সাধারণ সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত হন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মীর কাশেম আলী জামায়াতসহ অপরাপর রাজনেতিক দলগুলোর সহযোগিতায় ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা সদস্যদের সমন্বয়ে সশস্ত্র আলবদর বাহিনী গঠন করেন। সেই আলবদর বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে মীর কাশেম আলী স্বাধীনতাবিরোধী মূল ধারার সঙ্গে একাত্ম হয়ে সারা বাংলাদেশ বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেন।

চট্টগ্রাম শহরের দোস্ত মোহাম্মদ পাঞ্জাবি বিল্ডিং (চামড়ার গুদাম), সালমা মঞ্জিল, ডালিম হোটেলসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে মীর কাশেম আলী তার সহযোগীদের নিয়ে আলবদর বাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্র গড়ে তোলেন। এসব নির্যাতন কেন্দ্রগুলোতে বহু মানুষকে ধরে নিয়ে তিনি দিনের পর দিন নির্যাতন এবং অনেক লোককে হত্যা করেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’১৯৭৩ এর ৩ (২) (এ) (জি)/৪ (২) ধারায় মীর কাশেমের বিরুদ্ধে আনা ১৪টি অভিযোগের মধ্যে চট্টগ্রামের আসাদনগর ও পাঁচলাইশ এলাকায় আটজনকে নির্যাতনের পর হত্যা ও লাশ গুম এবং ৩৪ জনকে অপহরণের পর চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলে আটকে রেখে নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী বিভিন্ন ঘটনার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগ ছাড়া বাকি সব কটি অভিযোগেই অপহরণ এবং নির্যাতনের বর্ণনা রয়েছে।

মীর কাশেম জামায়াতের অন্যতম প্রধান অর্থ যোগানদাতা হিসেবে পরিচিত। তিনি ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এবং রাবেতা আল ইসলামী নামে একটি এনজিও’র সাবেক আবাসিক প্রতিনিধি।

জামায়াত সমর্থক বলে পরিচিত দিগন্ত মিডিয়া কর্পোরেশনেরও চেয়ারম্যান তিনি। ওই প্রতিষ্ঠানেরই সংবাদপত্র দৈনিক নয়া দিগন্ত এবং টেলিভিশন চ্যানেল দিগন্ত টেলিভিশন।

১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসংঘ নাম বদলে ইসলামী ছাত্রশিবির নামে বাংলাদেশে রাজনীতি শুরু করলে মীর কাশেম আলী তার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন।

শেয়ার