মাগুরায় প্রশাসনের প্লট বাণিজ্য! ॥ অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর অপচেষ্টা কর্মকর্তাদের

Plot banijjo
আবু বাসার আখন্দ, মাগুরা॥ জায়গাটি সড়ক ও জনপথের। অথচ সেখানেই প্লট বাণিজ্য শুরু করেছে খোদ জেলা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা। ইতোমধ্যে বরাদ্দ প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত করা হয়েছে। অথচ এ বিষয়ে কিছুই জানেন না উল্লেখ করে গা বাঁচিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা মাগুরার শালিখা উপজেলার সীমাখালিতে রমরমা এই বাণিজ্য শুরু করেছে বলে চাঞ্চল্যকর খবরটি পাওয়া গেছে।
মাগুরা সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মাগুরা ও যশোর জেলার সীমান্তবর্তী একটি বাস স্ট্যান্ড সীমাখালি। ১৯৭৬-৭৭ সালে সড়ক ও জনপথের সুবিধার্থেই ৪২ নং সীমাখালি মৌজায় বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ওইসব জমি এখনো ব্যবহার করা হচ্ছে। সড়কের সঙ্গে সেখানে বড়পিটও বিদ্যমান। অথচ সড়ক ও জনপথের ব্যবহৃত সেই জমিতেই বাণিজ্যিক প্লট বরাদ্দের প্রক্রিয়া চুড়ান্ত করা হয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার সহায়তায়। ইতোমধ্যেই সেখানকার মোট ৮০টি প্লটের মধ্যে ৩০টির বরাদ্দ থেকে মোটা অংকের অর্থ আয় করা হয়েছে। বাকি প্লটগুলো অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
দায়িত্বশীল ভূমি সংশ্লিষ্ট একাধিক আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সীমাখালির মূল বাজারটি সড়কের পূর্বে ওই মৌজার এসএ ২১৪ নং দাগে। অথচ মূল বাজার থেকে বেশ দূরে সড়কের অপরপ্রান্তে ৪৪ থেকে ৫০ নং এসএ দাগে বাজার পেরিফেরির কথা বলে বাণিজ্যিক প্লট বরাদ্দ করা হচ্ছে। যেটি রোডসের ব্যবহৃত জায়গা। নকশা অনুযায়ী ৪৩ শতকের ওই জায়গাটিতে ০.৫ শতাংশ পরিমাপের ৮০টি প্লট দেখানো হয়েছে। যেখানে চান্দিনা ভিটা ও তোহা বাজারের কোন অস্তিত্বই নেই। যেটি হাট বাজারের নীতিমালা এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থের পরিপন্থি বলে তারা অভিযোগ করেছেন।
সীমাখালি স্ট্যান্ড সংলগ্ন হোটেল ব্যবসায়ী বাদশা মিয়া, মুদি দোকানদার আরজ আলি, রাইস মিলের মালিক মোতালেব বিশ্বাস, আমজাদ হোসেন, রেজাউল ইসলামসহ আরো অনেকে অভিযোগ করেছেন, সড়ক ও জনপথের ব্যবহৃত জমিতে কখনো বাণিজ্যিক প্লট নির্মাণের কথা শুনিনি। অথচ অতি গোপনীয়তার সাথে কাজটি করায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে দারুণ ক্ষোভ ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন জানান, বাণিজ্যিক প্লট বরাদ্দ দেবার খবর জেনে তিনি শালিখা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। এ সময় সমীর বিশ্বাস নামে একজন নায়েব তাকে সীমাখালির জয়দেব চক্রবর্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন যিনি এই কাজের মধ্যস্থতা করছেন। একেকটি প্লটের বিপরীতে ন্যূনতম ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলেও এসময় তাকে জানানো হয়।
মধ্যস্থতাকারী জয়দেব চ্যাটার্জির বিষয়টি অপর ব্যবসায়ী রেজাউল ইসলামও নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, চ্যাটার্জি বাবু প্লট প্রতি বিভিন্ন অংকের টাকা আদায় করলেও ৩০টি প্লটের জন্য নিজে হাতে দুটি দফায় ১৫ লাখ টাকা এবং ৯ লাখ টাকা জমা দিয়েছেন। নগদ ওই অর্থ পরিশোধের পরই ৬ এপ্রিল তারিখে প্লট বরাদ্দের অনুমোদন মিলেছে।
এ বিষয়ে জয়দেব চ্যাটার্জির সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে আরো ৫০টি প্লট অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানান। তবে সেগুলো বরাদ্দের জন্য ১ লাখ টাকা করে নেয়া হচ্ছে বলে তিনি স্বীকার করেছেন। তবে এই টাকা ডিসির ফান্ডে জমা করা হবে বলে তিনি জানান। সড়ক জনপথের জায়গায় প্লট বরাদ্দের মাধ্যমে মোটা অংকের বাণিজ্য চললেও এর বণ্টন নিয়ে জেলা প্রশাসনের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। যার জের ধরে প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের মাঝে একদিকে যেমন সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে বলে জানা গেছে।
শালিখা উপজেলা ভূমি অফিসার মহসিনা আকতার বানু ট্রেনিং এর জন্য স্টেশনের বাইরে থাকায় প্লট বরাদ্দ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন। তবে তার অবর্তমানে শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুন নাহার সে সময় উপজেলা ভূমি অফিসারের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। বিধায় বিষয়টি তিনিই ভাল বলতে পারবেন বলে উল্লেখ করেন।
অথচ শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উপর সব দোষ চাপিয়ে নিজে কিছুই জানেন না বলে এড়িয়ে যান।
এদিকে শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এমন বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মাগুরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কালাচাঁদ সিংহ। তিনি বলেন, তা কি করে হয়! সব কাজইতো তার। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতেই যাচাই বাছাই শেষে জেলা পর্যায় থেকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার নিজস্ব কোন স্বার্থ নেই। বরাদ্দের বিপরীতে নগদ অর্থ লেনদেনের বিষয়েও তার কিছু জানা নেই। তবে এ জাতীয় কাজকে তিনি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে সড়ক ও জনপথের জায়গা ব্যবসায়ীদের মধ্যে অর্থের বিনিময়ে বরাদ্দের খবরটি এই প্রথম শুনছেন বলে জানিয়েছেন এই বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুব্রত দত্ত। তিনি বলেন, সড়ক বিভাগের প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে বাণিজ্যিক প্লট বা দোকান ঘর নির্মাণের প্রশ্নই আসেনা। জেলা প্রশাসন কিভাবে তাদের জমি প্লট করে অন্যের নামে বরাদ্দ দিচ্ছে সেটি একটি বিরাট রহস্য। তবে এ বিষয়ে তিনি আপত্তি দেবেন। প্রয়োজনে আদালতে মামলা করার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
তবে প্রশাসনিক অনিয়ম বা দুর্নীতির বিষয়ে কোন অভিযোগ পাননি বলে জানিয়েছেন মাগুরা জেলা প্রশাসক মাসুদ আহমেদ। সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ পেলে সেটি খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি জানান।

শেয়ার