ভিয়েতনামে হারানো সন্তানের খোঁজে

veatnam
সমাজের কথা ডেস্ক॥ ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় সেখানে বাবা হয়েছিলেন বহু মার্কিন সেনা। যুদ্ধের চার দশক পরও পিতৃপরিচয়হীন ওই সন্তানদের হন্যে হয়ে খুঁজছেন প্রবীণ মার্কিন সেনাদের অনেকেই।
এমনই এক মার্কিন সেনার হারিয়ে যাওয়া সন্তানের খোঁজে হো চি মিন নগরীর রাস্তায় চষে বেড়ানো এবং অনেক চেষ্টার পর সন্তানকে খুঁজে পাওয়ার কাহিনী তুলে ধরেছে বিবিসি’র দনিউজ নাইট প্রোগ্রাম’। প্রবীণ এই মার্কিন সেনার নাম জেরি কুইন।
১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম ছাড়ার পর সম্প্রতি ৪০ বছর বয়সী ছেলেকে খুঁজে পান জেরি । অবসর নিয়ে জেরি এখন কাজ করছেন খ্রিস্টান মিশনারী হিসেবে।
সন্তানকে খোঁজার জন্য জেরির সম্বল ছিল মাত্র একটি ছবির অ্যালবাম। আর তাকে একাজে সাহায্য করেছেন হাং পান নামের এক ভিয়েতনামী দোভাষী। প্রবীণ মার্কিন সেনাদের হারানো সন্তানদের খুঁজে পেতে ‘ফাদারস ফাউন্ড্ডে’ স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন চালানোর মধ্য দিয়ে যিনি কাজ করে আসছেন গত ২০ বছর ধরে। সর্বশেষ তার কাছে হারানো সন্তানের খোঁজ চান লম্বা পাতলা গড়নের জেরি কুইন।
‘৪০ নম্বরে থাকতাম আমরা’- বান্ধবীকে নিয়ে বসবাসের স্মৃতিঘেরা বাড়িটি খুঁজতে খুঁজতে বলেন জেরি। তবে বাড়ির কাছে গিয়ে ৬০ বছর আগের সেই নম্বরটির খোঁজ আর মেলেনি।
এরই মধ্যে আগন্তুককে দেখে রাস্তায় জমে গেল ছোটখাট ভিড়। একটি বাড়ির ভেতর থেকে বয়স্ক এক লোক বেরিয়ে এসে জানালেন, ভিয়েতকোং বাহিনী সাইগোনে (হো চি মিন সিটির আগের নাম) আসার পর তারা সড়কের নাম এমন কি বাড়ি নম্বরও পরিবর্তন করে ফেলেছে।
যুদ্ধের সময় দক্ষিণ ভিয়েতনামের পক্ষে অবস্থান নেয়া যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে ২০ লাখের বেশি সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছিল। তাদেরই একজন ছিলেন জেরি কুইন।
দশককালেরও বেশি সময় ধরে সেখানে অবস্থানকালে স্থানীয় ভিয়েতনামী নারীদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে এক লাখেরও বেশি সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন মার্কিন সেনারা। এখন তাদের তাদের বয়স হয়েছে। অনেকেই অনুশোচনায় ভুগে হারানো সন্তানদের খুঁজছেন। আবার অনেকেই পথে নেমেছেন সন্তানদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা জানার কৌতুহল থেকে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর বিদেশি সেনারা ভিয়েতনাম ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় নবাগতদেরকে হতে হয়েছে পিতৃপরিচয়হীন। অনেক সন্তানই জন্মের চার দশক পরও জানতে পারেনি কে ছিল তাদের বাবা।
যুদ্ধোত্তর পরিপস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর সেনাদের অনেকেই সন্তানদের খোঁজ পাওয়ার চেষ্টা চালান। তবে ফেলা আসা ওই প্রজন্মকে অস্বীকার করেন কিংবা তাদের নিয়ে কথা উঠলে বিরক্ত হন এমন সেনা সংখ্যাও কম নয়, বলছেন ভিয়েতনামে ‘অনাথদের’নিয়ে কাজ করা মানবাধিকারকর্মীরা।
হাং পান এর দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কর্মী ব্রায়ান হর্ট এর ভাষ্য, অনেক মার্কিন সেনাই তাদের সন্তানদের সঙ্গে পরিচিত হতে চান না।
সন্তানদের সন্ধান নিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে অনেকেই বলেন, “আপনি কেন বার বার ফোন করছেন? আপনারা কি চান? ভিয়েতনাম নিয়ে আমার সঙ্গে কেন কথা বলছেন? আমি এসব অবৈধ সন্তানকে নিয়ে কথা বলতে চাই না, আর ওরা আমার সন্তান নয়। সে আমার মেয়ে নয়; এসব নিয়ে আমাকে ফোন করা বন্ধ করুন।”
কিন্তু এদিক থেকে একেবারেই আলাদা খ্রিস্টান মিশনারীর কাজে তাইওয়ানে অবস্থান করা জেরি কুইন। নিজ সন্তানকে খুঁজে বের করতে সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে গেছেন তিনি।
“সন্তানের খোঁজে নামতে পারাকে ঈশ্বর প্রদত্ত সুযোগ”বলেই মনে করেন জেরি।“আমি বাবা হিসেবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যেতে চাই। এতে আমার কোনো দোষ নেই বলেই মনে করি,” বলেন জেরি।
জেরি জানান, ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনাম থাকার সময় তার ভিয়েতনামী বান্ধবী ব্র্যান্ডি সন্তানসম্ভবা হন। এরপর থেকে ব্র্যান্ডিকে বিয়ে করার সব কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চালিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হননি।
যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার প্রতিপক্ষ উত্তর ভিয়েতনামের নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করে ফেলায় এর আওতায় ভিয়েতনাম ত্যাগ করতে হয় মার্কিন সেনাদেরকে। আর এতে করেই তড়িঘড়ি করে নিজ দেশে ফিরতে হয় জেরিকে।
“আমি সব সময় তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে চেয়েছি। প্রথম এক বছর প্রতিমাসে তার জন্য ডলার পাঠিয়েছি। তবে সেটা তখন সে পেয়েছিল কিনা জানতে পারিনি,” বলেন জেরি।
মার্কিন সেনারা ভিয়েতনাম ছাড়ার কয়েক বছর পর জেরিকে তিনটি ছবি পাঠিয়েছিলেন ব্র্যান্ডিও। ৪০ বছর পর সন্তানের খোঁজে বের হওয়া জেরি সঙ্গে করে আনেন সেই ছবিগুলোই।
তিনটি ছবির একটি হচ্ছে ব্রান্ডির ২০ বছর বয়সের ছবি। অরেক ছবিতে নবাগত ছেলে শিশুসহ ব্রান্ডি ও জেরি নিজে। আরেকটি ছবিতে সাদা কোর্ট পরা এক নারীর সঙ্গে ব্র্যান্ডি।
হো চি মিনের রাস্তায় তিনদিন ধরে খোঁজাখুঁজির পর মরিয়া হয়ে জেরি একসময় যে বাড়িতে থাকতেন তার পাশেই একটি রেস্টুরেন্টের মালিকের কাছে যান। তাকে দেখান ছবিগুলো।
অ্যালবামের পাতা উল্টাতে উল্টাতে ব্রান্ডির সঙ্গে সাদা কোর্ট পরা নারীর ছবিটি চোখে পড়তেই থামলেন রেস্টুরেন্ট মালিক। বললেন,“তিনি তো আমাদের এখানে খুবই পরিচিত ধাত্রীমা। তিনি এখন তার স্বামীর সঙ্গে আমেরিকায় থাকেন। মাঝে মাঝে আমাদের এখানেও আসেন তিনি। এই তো গতকালও তার মেয়ে নুডুলস কিনতে আমার দোকানে এসেছিল।”
এ কথায় আশার আলো দেখলেন জেরি। পরে তার অনুরোধে সেই নারীর সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করেন রেস্টুরেন্ট মালিক।
পরেরদিনই কিম নামের ওই নারী এলেন তার ক্যালিফোর্নিয়াবাসী ডাক্তার স্বামীকে নিয়ে। অ্যালবাম হাতে নিয়ে ব্র্যান্ডিকে চিনতে একটুও কষ্ট হলো না তার। একটি ছবির পেছনে লোখা ব্র্যান্ডির ভিয়েতনামী বুই নামটিও মনে করতে পারলেন কিম।
“আমি তাকে ভালোভাবেই চিনতে পেরেছি। আমরা দুজন খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। আর আমিই তো তোমাদের ছেলের জন্মের সময় সাহায্য করেছিলাম।”
কিন্তু জেরির ছেলের সন্ধান দিতে পারেননি কিম। এমনকি ছেলের নামের আদ্যক্ষরও বলতে পারেননি তিনি। তবে অ্যালবামে থাকা ব্র্যান্ডির ছবি দেখিয়ে জানালেন-ভিয়েতনামে তার স্থানীয় নাম ছিল বুই।
কিম আরো জানান, ভিয়েতকং বাহিনী হো চি মিন শহরে ঢুকে পড়ার পর শত্রুদের সঙ্গে (মার্কিন সেনা) কোনো ধরনের সম্পর্ক থাকা নারী ও তাদের সন্তানদের হত্যা করার হুমকি দেয়। সে সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব জিনিসপত্র আগুনে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলেন তার মা।
কথা শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন জেরি। সন্তানের খোঁজ না পেলেও যেন তার কাছাকাছিই পৌঁছার আস্বাদ পেলেন তিনি। জন্মের পর প্রথম যে হাত তার সন্তানকে স্পর্শ করেছে, আদর করেছে, সস্নেহে কিমের সেই হাতটি ধরেই জেরি তার সন্তানকে কাছে পাওয়ার অনুভূতি পেতে চাইলেন।

শেয়ার