যে কারণে তাপদাহে পুড়ছে যশোর

Gorome Dhan kata
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ তীব্র তাপমাত্রায় দেশের শুষ্কতম অঞ্চল যশোর এবারের গ্রীষ্মে তাপদাহে পুড়ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বস্তির বৃষ্টি নামলেও যশোরে নেই এক কণা বৃষ্টির দেখা। গতকালও যশোরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি।
পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভৌগলিকভাবেই যশোর দেশের শুষ্কতম অঞ্চল। নানা কারণে সারাদেশের ন্যায় যশোরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি ভৌগলিক কারণে হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হবে এ অঞ্চলের মানুষকে।
যশোর মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আব্দুল হাই বলেন, বাৎসরিক গড় তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ভিত্তিতে যশোর, খুলনা ও চুয়াডাঙ্গা বাংলাদেশের শুষ্কতম অঞ্চল। যশোরের অবস্থান বাংলাদেশের পশ্চিম অঞ্চলে। গ্রীষ্মকালে মৌসুমী বায়ু দণি দিক থেকে আসে। এরপর দণি-পশ্চিম অঞ্চল থেকে মৌসুমী বায়ু উত্তর-পূর্ব দিক প্রবাহিত হয়। এসময় মৌসুমী বায়ু সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে বৃষ্টিপাত হয়। ওই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পর অবশিষ্ট মেঘ পশ্চিম অঞ্চলে আসার পর তাপমাত্র বৃদ্ধি পেলে ঘনীভূত হতে পারে না। ফলে বৃষ্টি হয় না। তবে এপ্রিল মাসে ৬০-৭০ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু এবার এপ্রিল মাসে মোটেই বৃষ্টি হয়নি। ফলে যশোর অঞ্চলের উত্তাপ বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, গ্রিণ হাউজ ইফেক্ট, নগরায়ন, কল-কারখানা নির্মাণ, জীবাশ্ম জ্বালানী ব্যবহার বৃদ্ধিতে কার্বন-ডাই অক্সাইড বেশি নির্গত হচ্ছে। এতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য বাংলাদেশের মত দেশগুলো তিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে দেশের শুষ্ক অঞ্চলের বেশি তাপ পড়ছে।
যশোর বিএডিসি অফিস সূত্র জানায়, জেলায় গভীর নলকুপের সংখ্যা ১৩শ’ ৮৮ টি। এরমধ্যে বিদ্যুৎ চালিত ১২শ’ ৭২ টি এবং ডিজেল চালিত ১শ’ ১৬ টি। এসব নলকূপ দিয়ে ২৫ হাজার ৪শ’ ৮২ হেক্টর জমিতে পানি দেয়া হয়। অন্যদিকে স্যালোটিউবওয়েলের সংখ্যা প্রায় ৫৫ হাজার ৮শ’। যার মধ্যে বিদ্যুৎ চালিত প্রায় ৬ হাজার ৭শ’ ৮৪ টি এবং ডিজেল চালিত ৪৮ হাজার ৯শ’ ৯৩ টি। এসব স্যালোটিউবওয়েল দিয়ে ১ লাখ ২৩ হাজার ৪শ’ ৮২ হেক্টর জমিতে পানি দেয়া হয়।
অপরদিকে পৌর এলাকায় ৮০ শতাংশ নলকূপে পানি উঠছে না। প্রচণ্ড খরায় এ অঞ্চলে পানির স্তর ৩২ থেকে ৩৩ ফিট নিচে নেমে গেছে। অতিরিক্ত সেচ ও পানি উৎসগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খরা মৌসুমে কমছে পানির স্তর। এতে সংকট আরও বেশি ঘনীভূত হচ্ছে।
পানি সংকটের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রায় স্থবিরতা এনেছে অতিরিক্ত গরম। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আগুনে পুড়ে মানুষ দৈনন্দিন কাজ করছেন। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন শ্রমিক শ্রেণির মানুষ। দুবেলা-দু মুঠো খাবার জোগাড় করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে তারা।
বাড়ছে মৌসুমী রোগীর সংখ্যাও। গরমজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। কয়েকদিনের উচ্চ তাপমাত্রার কারণে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। চাহিদার তুলনায় সরবারহ কম থাকায় শহর ও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেড়েছে। শেষ মুহূর্তে ধানের েেত সেচ দিতে গিয়ে আরও বেশি বিপাকে পড়ছে কৃষকরা। একদিকে খরা অপর দিকে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। রৌদ্রের খরতাপে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক প্রফেসর ড. সাইবুর রহমান মোল্যা বলেন, পৃথিবীতে কার্বণ ডাই অক্সাইডের নির্গমনের পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে ওজন স্তর হালকা হয়ে যাচ্ছে। এজন্য পৃথিবীতে তাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য বৃষ্টি হয় না। একই সাথে নদ-নদীতে পানি প্রবাহ না থাকায় পানির স্তর কমে যাচ্ছে।
দেশের শুষ্কতম অঞ্চল যশোরের ভৈরব, কপোতাসহ বহু নদী মরে গেছে। যার প্রভাব পড়ছে প্রকৃতিতে। একই সাথে উজাড় হয়ে যাচ্ছে বনভূমি। ফলে একদিকে তাপমাত্র বৃদ্ধি পাচ্ছে অপরদিকে পানির উৎস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

শেয়ার