বঙ্গভবন ‘আরামদায়ক’ নয় আবদুল হামিদের কাছে

Abdul Hamid
সমাজের কথা ডেস্ক॥ তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনীতিকদের জন্য বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রিত জীবন ‘সব সময় আরামদায়ক’ নয় বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
“খাঁচার পাখিরে যতই ভালো খাবার দেয়া হোক, সে তো আর বনের পাখি না। আমি একটা দায়িত্ব হিসেবে এখানে এসেছি। সংসদে মনের খোরাক পেতাম, বঙ্গভবনে পাই না। মনটা অনেক কিছু চায়।”
রাষ্ট্রপতি হিসেবে এক বছর পূর্তিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক একান্ত আলাপচারিতায় একথা উঠে আসে আবদুল হামিদের কণ্ঠে।
১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত হওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশে যতটি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন প্রতিটিতে বিজয়ী হয়ে সংসদে যাওয়ার কৃতিত্বধারী আবদুল হামিদ ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।
তার পর থেকে বঙ্গভবনের বাসিন্দা ভাটি অঞ্চলের এই মানুষকে এখনো টানে তার পেছনের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, যে জীবনে দুই বার সংসদের স্পিকারের দায়িত্বও ছিল।
“ইচ্ছা করলেই অনেক কিছুই করতে পারি না। আর ইচ্ছা করতেও তো অনেক সমস্যা। আসলে বেশি পলিটিক্যাল মানুষের জন্য, মানে গ্রাসরুটে রাজনীতি করা মানুষের জন্য এ জায়গাটা সব সময় আরামদায়ক হবে বলে মনে হয় না।”
“যারা ফ্রিলি মানুষের সঙ্গে মেশে না, তাদের কথা আলাদা। এখানে বেশিরভাগই ছিলেন বিচারপতি-শিক্ষক। উনারা তো বেশি মানুষের সঙ্গে মেশেন না।”
কিশোরগঞ্জের আবদুল হামিদ ১৯৯৬ সালে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর স্বভাবজাত হাস্যরস দিয়ে সংসদ মাতিয়ে তুলে বেশ জনপ্রিয়তা পান।
জিল্লুর রহমানকে বঙ্গভবনে শেষশ্রদ্ধা জানানোর সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে আবদুল হামিদ
পরে স্পিকারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এক মেয়াদে সংসদ উপনেতাও ছিলেন আওয়ামী লীগের এই নেতা, রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর যাকে দলের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটাতে হয়।
বঙ্গভবনে বছরপূর্তিতে আলাপচারিতার শুরুতেই কৈশোরজীবন তুলে ধরতে গিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন আবদুল হামিদ।
১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কামালপুর গ্রামে জন্ম নেয়া আবদুল হামিদ কৈশোরেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
“ক্লাস নাইনে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের মধ্য দিয়ে আসলে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীবিরোধী চেতনা শুরু হয়। মানে ওই সময়ের শাসক যে আমাদের না, রাষ্ট্রভাষা বাংলা করলেও শাসক গোষ্ঠী যে আমাদের ভাষার বিরুদ্ধে, সেই চেতনার কথা বলছি। ৬০ সালে নিকলী স্কুলে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করেছিলাম।”
“তখন তো আর এখনকার মতো শহীদ মিনার ছিল না। বাঁশ দিয়ে কাঠামো তৈরি করে তার ওপর কাগজ লাগিয়ে তৈরি করতাম শহীদ মিনার। এগুলো তৎকালীন সরকার ভালোভাবে নেয়নি।”
“ক্লাস নাইনে থাকতেই প্রথম থানায় ধরে নিয়ে গিয়েছিলো। আমাদের চার-পাঁচ জনকে। তবে লকআপে রাখেনি। সারাদিন-সারারাত থানায় ছিলাম। পরে শুনলাম মেজর আসবে, এটা ৫৯ সালের কথা বলছি। ৫৮ তে মার্শাল ল দিয়েছে আইয়ুব খান। মেজর আসার কথা শুনে লকআপে ঢুকালো। পরে মেজর আমাদের দেখে বললো-‘এ তো বাচ্চা লোগ, ছোড় দো।’”
“আসলে পলিটিক্যাল টার্ন এর কথা যদি বলেন, সেটা মেট্রিক শেষ করে যখন কলেজে গেলাম ওই সময়। ৬২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করলাম বিশাল করে। ওই সময় ২১ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন ডিগ্রির এক বড় ভাই। আমি ছিলাম যুগ্ম আহ্বায়ক। দেড়-মাইল ধরে মিছিল হল। ওখান থেকে সবার কাছে পরিচিত হলাম।”
১৯৬২ সালের ৩১ ডিসেম্বর তখনকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী (সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা) কিশোরগঞ্জে গেলে তার সভা ভণ্ডুল করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আবদুল হামিদ।
“পরদিন শুধু কিশোরগঞ্জ নয়, আশে-পাশের ১০ মাইলের মধ্যে যত স্কুল আছে, সব ছাত্র মিছিল করল। সারা কিশোরগঞ্জে শুধু ছাত্র আর ছাত্র। তৎকালীন এসডিও সাইদ সাহেব বুঝলেন, যদি জামিন না দেন, তাহলে কোর্টের একটা ইট-কাঠ দরজা-জানালও থাকবে না। পরে ছাত্ররা আমাকে কাঁধে করে মিছিল করে নিয়ে গেল।”
“৬২-৬৩ সেশনে কলেজ ছাত্র সংসদে জিএস পদে দাঁড়ালাম। আমার বিরুদ্ধে ছয়জন দাঁড়ালো। ওরা ছয়জন ভোট পাইলো ১০ শতাংশ। আর আমি ৯০ শতাংশ। এইটা ছিলো প্রথম নির্বাচন করা।”
তারপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি আবদুল হামিদকে। ছাত্রলীগ পেরিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় পদচারণার ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১৮ আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে গত বছর আব্দুল হামিদকে স্বাধীনতা পদকেও ভূষিত করা হয়।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বঙ্গভবনকে জেলখানার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন…
আবদুল হামিদ: আসলে এখনো ভালো লাগে না। খাঁচার পাখিরে যত ভালো খাবারই দেয়া হোক না কেন, সে তো আর বনের পাখি না। আমি একটা দায়িত্ব হিসেবে এখানে এসেছি। সংসদে মনের খোরাক পেতাম, বঙ্গভবনে পাই না। ইচ্ছা করলেই অনেক কিছুই করতে পারি না। আর ইচ্ছা করতেওতো অনেক সমস্যা।
ধরেন, মনে হলো কারো বাসায় যাবো। হাফ এন আওয়ারের মধ্যে গাড়ি রেডি হবে। কিন্তু রাস্তা বন্ধ হবে। যে বাসায় যাবো সেখানকার রান্নাঘর থেকে শুরু করে সব কিছু চেক হবে। ইচ্ছা হইলেও ইচ্ছা করা যায় না। নিতান্তই বিশেষ প্রয়োজন বা সরকারি কোন অনুষ্ঠান ছাড়া বের হই না। বাইরে যদিও যাই ১০টা মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারি না। ওখানেও নিরাপত্তা কর্মী থাকে। আই এম নট ফ্রি।
যখন কোর্টে প্র্যাকটিস করতাম চেম্বারে মানুষ আসতো। কথা বলতাম। যদি কখনো না আসতো, তবে যেখানে আড্ডা হতো, সেখানে চলে যেতাম। সংসদেও আড্ডা দিতাম। এমপিরা আসতো, সাংবাদিকরা আসতো। এখানে সে সুযোগ নেই। মনটা অনেক কিছু চায়।”
এলাকায় যেতে না পারার ব্যথা দূর করেন কিভাবে?
আবদুল হামিদ: স্পিকার থাকার সময় মাঝে-মধ্যে ৫-৭ দিন এলাকায় গিয়ে থাকতাম। এখন সে অবস্থা নেই। বললে হয়তো পারবো। কিন্তু আমি গেলে আশে-পাশের এলাকা থেকে পুলিশ ফোর্স নিয়ে আসে। ৫-৬’শ মানুষ। ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রামে এত লোক রাখার উপায় নেই। আমিতো আরামে থাকবো। কিন্তু পুলিশের কনস্টেবল, যারা আসে, তারা হয়তো ভালো করে খেতে-ঘুমাতেও পারবে না।
…আমাকে মুক্ত বলা যাবে না। মনের ব্যাথা মনে আছে।
আগে তো এলাকার লোক আসতো…
আবদুল হামিদ: এখনো আসে। আমার কাছে খবর আসলে আসার পারমিশন দেই। আসলে লোকজন তো কাজ নিয়ে আসে। আগে চেষ্টা করতাম। নিয়মের মধ্যে থাকলে করে দিতাম এখনতো আর ফোন করে বলতে পারি না-এটা একটু করে দিয়েন।
বাংলাদেশে আসা ফিফা বিশ্বকাপ হাতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ
আসলে এখানে পারসোনাল, প্রাইভেট লাইফ নেই। বিদেশে গেলেও শান্তি পাই না। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর প্রথম যে বার গেলাম, ভাবলাম কিছুটা হলেও ফ্রি। কিন্তু সেখানেও একা থাকতে দেবেনা। নিরাপত্তাকর্মীরা সঙ্গে থাকে। আই এম নট অ্যাট অল ফ্রি ম্যান।”
আর বিদেশে তো সব সময় যাওয়া যায় না। চার মাস পর পর সিঙ্গাপুর যাই চিকিৎসার জন্য, ওইটুকুই। এখন চিকিৎসার নাম করে তো আর শুধু শুধু বিদেশ ঘুরতে যেতে পারি না।
বঙ্গভবনে তো এক বছর পার করলেন। এই সময়টা কিভাবে মূল্যায়ন করবেন।
আবদুল হামিদ: আসলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তেমন কোনো কাজ নেই। যেটা করি রুটিন কাজ। সংসদে থাকার সময়ে অনেক কিছু পরিকল্পনা করেছি। এটা-ওটা বাদ দিয়েছি। এখানে দেখার কিছু নেই। তবে বিদেশ সফরে হোটেলের ভাড়া কমিয়েছি। সিঙ্গাপুরে আমার হোটেলের ভাড়া ছিলো ৬ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার। সেটা কমিয়ে ৬শ’ ডলারে এনেছি। স্পিকার থাকার সময় একা যেতাম। এখনতো আর সে উপায় নেই। সফরসঙ্গীদের হোটেল ভাড়াও অর্ধেক করেছি।
এখানে আসলে আমার কোন কাজ নেই। সব অন্যরা করে। রাজনৈতিক যে পরিস্থিতি গেলো সে সময় বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে পরামর্শ দিয়েছি।
নিয়ন্ত্রিত জীবনে অভ্যস্ত হতে পেরেছেন?
আবদুল হামিদ: একটা গল্প আছে। একটা লোককে বলা হলো কিল কয়টা খাবি? বললো-একটাও না। যদি বাইন্ধা মারি তবে? তখন যত খুশি। বুঝছেন…
বারের সভাপতি, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় উপনেতা, স্পিকার, রাষ্ট্রপতি-কোন দায়িত্ব বেশি উপভোগ করেছেন?
আবদুল হামিদ: ডেপুটি স্পিকার। দায়-দায়িত্ব বেশি নাই। স্পিকার হাউজে (সংসদ) না গেলে হাউজ পরিচালনা করা। আর কোনো কাজ নেই। কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব নেই। স্পিকারকে অনেক কিছু খেয়াল রাখতে হয়। অ্যালার্ট থাকতে হয়। অনেক সজাগ থাকতে হয়েছে। আর এখনতো-বানের বাতাসও আমারে পায় না।

শেয়ার