আসছে খরা, বাড়ছে ঝড়, আবহাওয়ার বিরূপ দশায় দেশ

weather
সমাজের কথা ডেস্ক॥ আবহাওয়ার বিরূপ দশার মধ্য দিয়ে কাটবে ২০১৪ সাল! আবহাওয়ার বিশ্লেষণ তেমনটাই বলছে। বলা হচ্ছে একটি মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী খরার দিকে যাচ্ছে দেশ। আর একই সঙ্গে রয়েছে দিনের পর দিন বজ্রঝড়ের সম্ভাবনা।

এরই মধ্যে ছয় দশকের সবচেয়ে গরম দিনটি পার করেছে দেশবাসী। যশোরে সর্বোচ্চ ৪২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। সারা দেশে একইভাবে চলছে তাপদাহ। জনজীবন বিপর্যস্ত। খেটে খাওয়া মানুষগুলোর কাজ বন্ধ। অসুস্থ্য হয়ে পড়ছেন অনেকেই। ডায়রিয়া-চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ছে। শুক্রবার বিকেলে আকাশে কিছুটা মেঘ জমে তাপমাত্রা কমিয়ে আনলেও বৃষ্টির দেখা পায়নি ঢাকাবাসী। অদূরে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের কোথাও কোথাও বৃষ্টি ঝড়লেও তা ছিলো ছিটেফোঁটা মাত্র।

এই তাপমাত্রায় দেশবাসী যখন অতিষ্ঠ। একটু বৃষ্টির অপেক্ষায় যখন তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত তখন আবহাওয়া বিশ্লেষকরা সামনে নিয়ে এসেছেন আরও ভয়াবহ এক তথ্য। তাদের মতে, মারাত্মক এবং দীর্ঘ খরার কবলে পড়তে যাচ্ছে দেশ। আর তা হতে যাচ্ছে এল-নিনোর প্রভাবে।

এদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচ- তাপদাহের মধ্যেই হঠাৎ হঠাৎ বয়ে যাচ্ছে ঝড়। বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। আরও এমন বজ্রঝড়ের পুর্বাভাসও পাওয়া আবহাওয়া বিশ্লেষণে। মে মাসেই অন্তত ১৩ দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রঝড়ের পূর্বাভাস রয়েছে।

একটি এল নিনোর সম্ভাবনা তীব্রভাবেই দেখছেন আবহাওয়াবিদরা। আর এর অন্যতম শিকার হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কা। এছাড়া পাকিস্তান, মায়ানমার, নেপাল, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানেও দেখা দিতে পারে একই সঙ্কট। এল-নিনোর প্রভাবে অতীতে যেমন মারাত্মক খরার ঘটনা ঘটেছে, এবারেও তেমনটাই ঘটতে যাচ্ছে বলে দাবি আবহাওয়াবিদদের।

তারা বলছেন এখনো মৌসুমী বায়ুর কোনো আনাগোনা নেই। ফলে বৃষ্টিপাতের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যও নেই। ভয়াবহ তাপদাহ, প্রচ- গরমের দীর্ঘসূত্রীতা আর বৃষ্টিহীনতা আবহাওয়াকে করে তুলবে অসহনীয়। ফসল উৎপাদন হতে পারে চরমভাবে ব্যহত। মানুষের জীবনযাত্রার পাশাপাশি কৃষিকাজ, গবাদি পশু পালন, মাছের চাষ সবকিছুই ব্যহত হতে পারে এই সম্ভাব্য অনাবৃষ্টিতে। আর এই পরিস্থিতি বিরাজ করবে আগামী সাত মাস।

এই হিসেবে নভেম্বরেও চলবে খরা। মাঝে পুরো বর্ষার মওসুম। কেমন হবে সে মওসুম। আবহাওয়ার বিশ্লেষণ বলছে বর্ষায়ও খরা দেখবে বাংলাদেশ-ভারতের মানুষ।

যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও প্যাসিফিক ক্লাইমেট চেঞ্জ সেন্টারের প্রধান বিজ্ঞান কর্মকর্তা ড. রাশেদ চৌধুরী তার একটি লেখায় এই এল-নিনোর আগাম বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আগামী নভেম্বর পর্যন্তই অনেকটা বৃষ্টিহীন থাকবে বাংলাদেশ। যে এল-নিনো বাংলাদেশ-ভারত তথা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে আগামী নভেম্বরের আগে তার গতিপথ পাল্টাবে না।

এ বছরে এখনো মৌসুমী বায়ুর গঠিত হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, সেটি নিশ্চিত করেছে আবহাওয়া দফতরও। গ্রীস্মের গোড়ার দিনগুলোতে ঠিক যতটা বৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন কিংবা স্বাভাবিক তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া দফতরের হিসাবে মার্চে বৃষ্টিপাতের কথা ছিলো ৫২ মিলিমিটার, কিন্তু বৃষ্টি হয় মাত্র ১৮ মিলিমিটার। আর এপ্রিলে তা কমে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ২২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় যা স্বাভাবিকের এক-চত’র্থাংশেরও কম। স্বাভাবিক হিসাবে এই সময়ে ১৩০ মিলিমিটার হওয়ার ছিলো।

এল-নিনোর প্রভাব এবারও দেশকে ভয়াবহ খরার দিকে ঠেলে দেবে এই অনাবৃষ্টি তারই পূর্বাভাস বলে মনে করেন আবহাওয়া বিশ্লেষকরা। ১৯৭২, ১৯৮২, ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ যেমন ভয়াবহ খরার মথ্য দিয়ে গিয়েছে এবারও তেমনটাই হতে পারে বলে আশঙ্কা ড. রাশেদ চৌধুরীর।

এবারের এল-নিনো কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা মে মাসে বোঝা যাবে বলেও জানান তিনি।

এল-নিনো সম্পর্কে একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এল-নিনো বা লা-নিনা জলবায়ু চক্রে বাংলাদেশের জলবায়ু খুবই সংবেদনশীল। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বেসিনে সাউদার্ন ওসিলেশন ইনডেক্স (এসওআই) ও বৃষ্টিপাতের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক দেখা যায় ফলে শুষ্ক মৌসুমে (এল-নিনো বছর যখন বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়) এসওআই-র মান ঋণাত্মক এবং বর্ষা মৌসুমে (লা-নিনা বছর যখন বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী হয়) এসওআই-র মান ধনাত্মক দেখা যায়।

ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ইন্সটিটিউট ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড সোসাইটি (আআরআই) এবং ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার (সিপিসি)ও একই ধরনের মত দিয়েছে। তাদের মতে, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে একটি এল-নিনোর সৃষ্টি হচ্ছে। ২০১৪ এর গ্রীস্ম ও বর্ষা গোটা মওসুম জুড়েই এল-নিনোর প্রভাবে মারাত্মক খরা দেখা দেবে এমন সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ, বলছে সিপিসি ও আইআরআই। কোনো কোনো আবহাওয়া বিশ্লেষণ এই সম্ভাবনা ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত দেখাচ্ছে।

গবেষকরা প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় তাদের তীক্ষè নজর রাখছেন।

তাদের হিসেবে একটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল এল-নিনোরও যদি সৃষ্টি হয় তাতে দক্ষিণ এশিয়ার গোটা অঞ্চলের মানুষই কম বৃষ্টিপাত দেখবে। সেই খরার দশা জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে।

তবে এটি যদি অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী হয়ে পড়ে তাতে এর ভয়াবহ প্রভাবই দেখবে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ। এর আগে গত শতাব্দীতে এমন দুটি শক্তিশালী এলনিনো দেখা গেছে ১৯৮২-৮৩ এবং ১৯৯৭-৯৮ সালে।

ড. রাশেদ চৌধুরী মনে করেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া দফতরের উচিত বিষয়টি গভীর ভাবে ও গুরুত্বের সঙ্গে নিয়মিতভাবে নজরদারি করা।

জুন থেকে সেপ্টেম্বর অব্দি এল-নিনোর প্রভাবে খরা বিরাজ করলে বাংলাদেশে আমন ধান চাষ মারাত্মকভাবে ব্যহত হবে। নদী-নালা ও পুকুর-জলাশয়ের পানি শুকিয়ে গেলে মাছের চাষও হবে ক্ষতিগ্রস্ত। গবাদি-পশুর ওপর পড়বে এর মারাত্মক প্রভাব।

শেয়ার