যশোরে সর্বোচ্চ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড তাপমাত্রা ॥ যশোরে বইছে আগুনের হলকা

tapmattra
উত্তম ঘোষ ॥
চলতি বছরে যশোরের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গিয়ে ঠেকেছে। মানুষের কাছে এ তাপমাত্রা যেন আগুনের হলকা। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে দেশের এযাবতকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছুঁয়ে যাবে বলেও আবহাওয়া বিভাগ আভাস দিয়েছে। এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল যশোরে। এরপর বিগত বছরগুলোতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ছিল ৪১.৫ ডিগ্রি। কিন্তু দিনে দিনে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে তাপমাত্রা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। বর্তমান সময়ে তীব্র তাপদাহে অস্থির চারদিক। স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে ৩/৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়তি থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে বাড়ছে বিভিন্ন ধরণের রোগবালাই। একই সাথে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
চৈত্র মাস শেষ হয়ে বৈশাখের বেশ কয়েকদিন অতিবাহিত হলেও বৃষ্টির দেখা নেই। এতে করে গরমের তীব্রতা ক্রমে বাড়ছে। গতকাল যশোরে মৌসুমের সর্বোচ্চ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দু’এক দিনের মধ্যে তাপমাত্রা ৪২ থেকে ৪৩ ডিগ্রিতে উন্নীত হতে পারে বলে আবহাওয়া বিভাগ আভাস দিয়েছে।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সাইবুর রহমান মোল্যা গতকাল দৈনিক সমাজের কথার সাথে আলাপকালে জানিয়েছেন, অন্তত পঞ্চাশ বছর আগে যশোরে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। ওই সময় যশোরের তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর ১৮০৮ সালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড রয়েছে শ্রীমঙ্গলে। ওই সময় শ্রীমঙ্গলের তাপমাত্রা ছিল শূণ্য ডিগ্রি। অধ্যাপক ড. সাইবুর রহমান মোল্যা আরও জানান, ভৌগলিক অবস্থার কারণে যশোরে গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে। তবে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বৃষ্টি না হলে তাপমাত্রা এবং গরমের তীব্রতা আরও বাড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
আবহাওয়াবিদদের মতে, সাধারণত ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মৃদু, ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রিকে মাঝারি ও ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রাকে তীব্র তাপপ্রবাহ বলা হয়। ওই হিসাবনুযায়ী যশোরে গতকাল মাঝারি মাত্রার তাপপ্রবাহ প্রবাহিত হলেও আদ্রতার কারণে তা তীব্র অনুভূত হয়েছে। এাছাড়া পরিবেশ বিপর্যয়ের কবলে পড়া বাংলাদেশের চিরচেনা আবহাওয়া পাল্টাতে শুরু করেছে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ৩ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তি তাপমাত্রার মোকাবেলা করতে হচ্ছে মানুষকে। এছাড়া প্রখর তাপমাত্রার পাশাপাশি তাপমাত্রার অস্থিতিশীলতা মানুষকে বেশি কাহিল করে তুলছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে মানুষের রোগবালাইয়ের আশঙ্কাও বেড়ে যাবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে আরও জানা গেছে, চলতি মাসে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একটি বা দুটি লঘুচাপের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আগামী সপ্তাহে কিছুটা বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টি হলেই কেবল তাপমাত্রা কমবে।
এদিকে, সারাদেশের ন্যায় যশোরে ভ্যাপসা গরম ও গুমোট আবহাওয়ার কারণে ব্যপকহারে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়ায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে লোডশেডিং। আগের তুলনায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কয়েকগুন লোডশেডিং বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিং করা হচ্ছে। তীব্র গরম এবং বিদ্যুতের অভাবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যশোর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত এক মাস আগে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় গত কয়েকদিনের চাহিদা প্রায় দ্বিগুন। এই বাড়তি চাহিদার যোগান দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
অপরদিকে, তীব্র গরমে ভ্যান-রিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালক, দিনমজুরসহ শ্রমজীবী মানুষের জীবন অতিমাত্রায় দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। শিশু ও বৃদ্ধদের ভোগান্তিটা অন্যদের চেয়েও বেশি। দিনের মতো রাতেও গরম থাকায় বৈদ্যুতিক ফ্যানের বাতাসেও শরীর জুড়াচ্ছে না। তীব্র গরমে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। হিট স্ট্রোকের আশংকা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অবস্থায় তরল জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া এবং গরমের সময় বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে কর্মরত চিকিৎসক ডা. গৌতম ঘোষ। যশোরের কেশবপুর উপজেলার কড়িয়াখালী গ্রামের কৃতি সন্তান ডা. গৌতম ঘোষ বলেন, গরমে শিশুরা কাহিল হয়ে যায়। তাদেরকে সর্বোচ্চ যতেœ রাখতে হবে। গরমে বাচ্চার চিকেন ফক্স হওয়ার আশংকা বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশুদের ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, রক্ত আমাশয়ে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা থাকে প্রকট। অতিরিক্ত গরমের কারণে পানি শূন্যতা মারাত্মক হতে পারে বলে মন্তব্য করে ডা. গৌতম ঘোষ বলেন, হিট স্ট্রোকের ব্যাপারেও অবশ্যই সজাগ থাকতে হবে। তিনি বাসি-পঁচা খাবার না খাওয়া, ধুলাবালি থেকে শিশুদের দূরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। এবং গরমের সময় ফুটপাতে ধারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি করা বিভিন্ন ধরনের শরবত থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

শেয়ার