খরায় পুড়ছে গোটা অঞ্চল, দুবির্ষহ জনজীবন ॥ অর্ধশত বছরের রেকর্ড তাপমাত্রা যশোরে

gorom
নিজস্ব প্রতিবেদক॥ যশোরে তাপমাত্রার পারদ ক্রমশই উপরের দিকে উঠছে। বেশ কয়েকদিন আগেই এ জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা বাংলাদেশে ৫৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড। এদিন রাজধানী ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
তাপমাত্রার এই উর্ধ্বমুখী প্রবণতা আর বৃষ্টিহীনতা মিলে তৈরি হয়েছে এক দুঃসহ পরিবেশ। গত একমাস ধরেই গোটা এ অঞ্চল খরায় পুড়ছে। বৈশাখের ১০দিনে পা রেখেছে নতুন বছর। কিন্তু এখনও এ অঞ্চলে একফোটা বৃষ্টির দেখা মেলেনি। বরং পানির স্বাভাবিক স্তর থেকে ১০ ফিটের বেশি নীচে নেমে গেছে। ফলে পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বেশিরভাগ টিউবওয়েলে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে গেছে। আর যে সব টিউবওয়েলে পানি উঠছে তা পরিমানে খুবই কম।
আবহওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, এর আগে ১৯৬০ সালে দেশের সর্বোচ্চ ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। তিনি আরো জানান, এই তাপপ্রবাহ আরো বাড়তে পারে। বৃষ্টি হওয়ার কোন সম্ভবনা আছে কি না জনতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন বৃষ্টি সম্ভবনা কম থকলেও যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। ’
লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ এবং তৎসংলগ্ন এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে।
আকাশ অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলাসহ সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে।
ঢাকা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, রাজশাহী, ঈশ্বরদী, খুলনা, মংলা, যশোর ও চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলসমূহের উপর দিয়ে তীব্র তাপ প্রবাহ এবং দেশের অন্যত্র মাঝারী থেকে মৃদু তাপ প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়া পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ এবং তৎসংলগ্ন এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। আকাশ অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলাসহ সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে।
ঢাকা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, রাজশাহী, ঈশ্বরদী, খুলনা, মংলা, যশোর ও চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলগুলোর উপর দিয়ে তীব্র তাপ প্রবাহ এবং দেশের অন্যত্র মাঝারি থেকে মৃদু তাপ প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।
যশোর বিমান বাহিনীর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। যা দেশের ৫৪ বছরের মধ্যে রেকর্ড। বুধবার এই জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা ওই দিন দেশের মধ্যেই সর্বোচ্চ ছিল। এর আগের দিন মঙ্গলবার যশোরে সর্বোচ্চ ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
প্রচণ্ড এ তাপমাত্রার সঙ্গে বৃষ্টিহীনতা মিলে তৈরি করেছে এক দুঃসহ্য পরিবেশ। দুপুরের দিকে খরতাপে পুড়তে থাকা গোটা এলাকায় যেন লু-হাওয়া বইতে শুরু করে। উত্তপ্ত এ পরিবেশে শ্রমজীবী মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। শুষ্কতায় পানির স্তর নেমে যাওয়ায় এ দুর্ভোগের মাত্রা বেড়ে গেছে আরও কয়েকগুন।
রিকসা চালক আব্দুল আজিজ জানান, গরমে রিকসা টানা দায় হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দুপুরের দিতে তো রোদ গরমে তো মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা হচ্ছে।
যশোর বিএডিসির পানি পরীক্ষাগার কর্মকর্তা ফজলে রাব্বি জানান, জানুয়ারি মাস থেকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমতে শুরু করে। এপ্রিল মাসে পানির স্তর সর্বোচ্চ নীচে নেমে যায়। পানির স্তর ২৫ ফিটের নীচে নেমে গেলে অধিকাংশ টিউবওয়েলে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে যায়। আর যে গুলোয় পানি ওঠে তা খুবই কম। এছাড়া কৃষি কাজে সেচের কারণেও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নেমে যায়। এ সময় ভূগর্ভ থেকে গভীর নলকূপ দিয়ে পানি উঠানো হয়। ফলে ভূগর্ভের উপরের স্তর থেকে পানি নীচে নেমে যায়। পানির স্তর স্বাভাবিক হতে প্রায় মাস খানেক সময় লাগে। তিনি জানান, সাধারণত পানির স্তর স্বাভাবিকভাবে থাকে ২০ থেকে ২২ ফিটের মধ্যে। কিন্তু এখন প্রচন্ড খরায় পানির স্তর ৩২ থেকে ৩৩ ফিট নীচে নেমে গেছে।
শহরের ঘোপ জেলরোডের বাসিন্দা সাইদুর রহমান জানান, গত একমাস তাদের টিউবয়েরে পানি উঠছেনা। আবার পৌরসভার পানির সংযোগ থাকলেও তাতেও পানি পাওয়া যাচ্ছেনা। বাধ্য হয়ে তারা দূর থেকে ডিপ টিউবয়েলের পানি নিয়ে আসছেন। শহরের সব এলাকায় এখন এরকম চলছে তীব্র পানি সংকট। বৃষ্টির দেখা না হলে এই সংকট কাটবেনা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর যশোর অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী মীর আবদুস সাহিদ জানান, যে সব এলাকায় পানির সংকট দেখা দেয় ওই সব এলাকায় সাড়ে চার হাজার টাকার বিনিময়ে গভীর নলকূপ বসিয়ে খাবার পানিসহ গৃহস্থালীর কাজে ব্যবহারের জন্য পানির ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে পৌর এলাকায় পানির স্তর ৩২ ফিট নীচে নেমে গেছে। আমরা পানি সংকট কাটাকে কাজ করে যাচ্ছি। গত বছরও জেলার বিভিন্ন এলাকায় গভীর নলকূপ বসিয়ে পানির সংকট মোকাবেলা করা হয়।
যশোর পৌরসভার পানি বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান জানান, পৌর এলাকায় কাগজ কলমে পানির গ্রাহক সংখ্যা ১৫ হাজার ৬শ’। একটি পরিবারে একজন গ্রাহকের অধীনের ৫ জন লোক পানি ব্যবহার করে। একজন লোকের একদিনে পানি লাগে ১শ’ ২০ লিটার। আর এসব গ্রাহকদের পানি সরবরাহ করা হচ্ছে ২৯টি ডিপ টিউবয়েলের মাধ্যমে। প্রতিদিন পাম্পগুলি টানা ৯ ঘন্টা করে চলে। পৌরসভার হিসাব অনুযায়ি প্রতিদিন পানি সরবরাহ করা হয় ১ কোটি ৪০ লাখ ৪০ হাজার লিটার। বর্তমানে পৌর এলাকায় ৩২/৩৩ ফিট নীচে গেমে গেছে পানির স্তর।

শেয়ার