ভয়াবহতম রানা প্লাজা দুর্ঘটনার বর্ষপূর্তি আজ ॥ ধসে পড়তে পারে জেনেও শ্রমিকদের কাজে বাধ্য করা হয়েছিল

Rana plaza
সমাজরে কথা ডস্কে ॥ গত বছরের ২৪ এপ্রিল ইতিহাসের ভয়াবহতম রানা প্লাজা ভবন ধসের ঘটনা ঘটে। ইতিহাসের ভয়াবহতম এ দুর্ঘটনার বর্ষপূর্তি আজ। ঢাকার জেলা প্রশাসক অফিসে রক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, রানা প্লাজার ধ্বংসস্তুপ থেকে ২ হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত এবং ১ হাজার ১১৭ জনকে মৃত উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১৯ জন মারা যান। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ১৩৬ জনে।
সর্বশেষ গত ১২ ফেব্রুয়ারি পাবনার বেড়ায় রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিক আব্দুস সোবহান মারা যান।
৮৪৪ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিএনএ নমুনা রেখে ২৯১ জনের অশনাক্তকৃত লাশ রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। অশনাক্তকৃত মরদেহের মধ্যে পুরুষ ৫৫ জন এবং মহিলা ২৩৬ জন। পরে ১৮৬ জন শ্রমিকের লাশের ডিএনএ টেস্ট মেলানো সম্ভব হয়। এখনো ১০৫ জন শ্রমিকের লাশের ডিএনএ স্যাম্পল মেলানো সম্ভব হয়নি। তাদেরকে নিখোঁজ ও অশনাক্ত বলে দেখানো হচ্ছে।
এছাড়া ১ হাজার পাঁচশ’ ২৪ জন আহত হন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন এমন আহতের সংখ্যা ৭৮ জন।
সরকার তাৎক্ষণিকভাবে নিহতের লাশ দাফনের জন্য প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকার করে ৮৪৪ জনকে ১ কোটি ৬৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা প্রদান করে। এছাড়া আহতদের চিকিৎসার জন্যও ৫ হাজার টাকা করে দেয় সরকার।
এদিকে, রানা প্লাজায় ফাটল ধরা পড়ার পর তা ধসে পড়তে পারে জেনেও শ্রমিকদের কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। কাজ না করলে তাদের দেখানো হয়েছিল চাকরি হারানোর ভয়।
রানা প্লাজা ধসের মামলায় তদন্ত করতে গিয়ে এমন তথ্যই পেয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর।
এছাড়াও ভবনের নকশায় ক্রুটি, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, বাণিজ্যিক ভবনে শিল্প কারখানা স্থাপন, অনুমোদন ছাড়াই ৬ তলা ভবনকে ৯ তলায় সম্প্রসারণ, অত্যধিক শ্রমিক সংখ্যা, কারখানার যন্ত্রপাতি ও ভারি জেনারেটরের ভাইব্রেশনকে ভবনে ফাটল ধরা ও ধসে পড়ার কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ করেন।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির এক বছরেও মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করতে না পারলেও মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা। তবে এপ্রিলে চার্জশিট না হবে না এমনটা তিনি বাংলানিউজকে নিশ্চিত করেছেন।
২১ মে মামলার ধার্য তারিখের আগেই কোনো একদিন চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
বিজয়কৃষ্ণ কর বাংলানিউজকে বলেন, রানা প্লাজায় ফাটল ধরা পড়ার পর তা ধসে পড়তে পারে জেনেও ঘটনার দিন শ্রমিকদের কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। কাজ না করলে তাদের দেখানো হয়েছিল চাকরি হারানোর ভয়।
রানা প্লাজা ধসের মামলায় তদন্ত করতে গিয়ে এমন তথ্যই পেয়েছেন তিনি।
ভবন তৈরিতে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, বাণিজ্যিক ভবনে শিল্প কারখানা স্থাপন, অনুমোদন ছাড়াই ৬ তলা ভবনকে ৯ তলায় সম্প্রসারণ, নকশায় ক্রুটি, অত্যাধিক শ্রমিক সংখ্যা, কারখানার যন্ত্রপাতি ও ভারি জেনারেটরের ভাইব্রেশন ভবনে ফাটল ধরা ও ধসে পড়ার জন্য দায়ী ছিল বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।
রানা প্লাজা ধসের গত ১ বছরে ২১ আসামির মধ্যে ৯ জন উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। চার্জশিট দাখিলে দেরি হওয়ায় আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে (আইও) কারণ দর্শাতে বলেছেন। চার্জশিট দাখিলে বিলম্ব হওয়ার কারণও আদালতে দাখিল করেছেন মামলার আইও। কিন্তু রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির এক বছরেও আদালতে দাখিল হয়নি মামলার চার্জশিট।
ওই ঘটনায় দু’টি মামলা দায়ের করা হয়। একটি মামলা হয় অবহেলার দ্বারা মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগে দণ্ডবিধির ৩০৪ক/৩৩৭/৩৩৮ ধারায় এবং অপর মামলাটি করা হয় ইমারত নির্মাণ আইন’১৯৫২ এর ১২ ধারায়। পরবর্তীতে প্রথম মামলাটিতে ৩২৩/৩২৫/৩২৬/৩০৭ ও ৩০৪ ধারা সংযোজন করা হয়।
আগামি ২১ মে মামলা দু’টির চার্জশিট দাখিলের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিজয় কৃষ্ণ কর বাংলানিউজকে আরও বলেন, মামলাটির তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে কোনো গ্যাপ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আইনের ফাঁক গলে যেন কোনো আসামি বের হয়ে যেতে না পারেন, মূলত সে কারণেই একটি সময় নিয়ে বিশ্লেষণ করে চার্জশিট দেওয়া হচ্ছে।
চার্জশিট দাখিলে বিলম্ব হওয়া প্রসঙ্গে তিনি আরও জানান, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের মধ্যে কয়েকশ’ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ, জীবিত উদ্ধারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দি গ্রহণ, বিভিন্ন হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সদের জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দি গ্রহণ, উদ্ধারকর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দি গ্রহণ, বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ ও তাদের জবানবন্দি গ্রহণ, রানা প্লাজার বাণিজ্যিক ভবনে গার্মেন্টস কারখানা স্থাপনে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ ও দায়িত্ব নির্ধারণ প্রক্রিয়া নির্ণয়, নকশা অনুমোদনকারীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দি গ্রহণ, আসামিদের নাম-ঠিকানা যাচাই এবং নিরপেক্ষ সাক্ষী মিডিয়া কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দি গ্রহণের জন্যই এতো সময় লাগছে।
সব মিলিয়ে প্রায় এক হাজার সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ লিপিবদ্ধ করা হতে পারে বলেও তিনি জানান।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, একই ঘটনায় দায়ের করা ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় ১৬ থেকে ১৭ জন আসামি হতে পারেন। হতাহতের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামির সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৪০ জনে।
মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে থাকলেও এপ্রিলে চার্জশিট হচ্ছে না বলে বিজয়কৃষ্ণ কর বাংলানউজকে নিশ্চিত করেছেন। মামলার পরবর্তী তারিখ ২১ মের আগে চার্জশিট দেওয়া হতে পারে বলেও তিনি জানান।
সিআইডি জানায়, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ভবনটির মালিক সোহেল রানা, তার পিতা আবদুল খালেক, ভবনটির অন্যান্য গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিকরাও থাকছেন আসামির তালিকায়।
চাঞ্চল্যকর এ মামলার চার্জশিট প্রদানে ধীরগতির কারণ জানতে চেয়ে গত বছরের ২৪ নভেম্বর ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক শহিদুল ইসলাম তদন্ত কর্মকর্তাকে নোটিশ করেন।
৮ ডিসেম্বর বিজয়কৃষ্ণ কর ওই নোটিশের জবাব দেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনাটি একটি ভয়াবহ মানবসৃষ্ট বিপর্যয়মূলক হত্যাকাণ্ড। যা বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বকে আলোড়িত করেছে। এ রকম হত্যাকাণ্ডে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সিআইডি দালিলিক সাক্ষ্যসহ প্রত্যক্ষদর্শী আহত ও নিহতদের স্বজনসহ বিশেষজ্ঞ মহলের জবানবন্দি গ্রহণ ও প্রমাণ সংগ্রহ করছে। বিপুল সংখ্যক সাক্ষীর জবানবন্দি ১৬১ ধারায় রেকর্ড করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। মামলাটির তদন্তে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত সমাপ্ত করার চেষ্টা করছি।
হতাহতের মামলায় জামিনের থাকা ৯ আসামি হলেন, আব্দুল খালেক ওরফে খালেক কুলু, মোহাম্মদ আলী খান, রেফাত উল্লাহ, আবুল হাসান, অনীল কুমার দাস, শাহ আলম মিঠু, এমতেমাম হোসেন, রাকিবুল ইসলাম ও আলম মিয়া।
মামলায় কারাগারে থাকা ১২ আসামি হলেন, বজলুস সামাদ আদনান, মাহমুদুর রহমান তাপস, সোহেল রানা, আমিনুল ইসলাম, আনিসুর রহমান, রফিকুল ইসলাম, আ. রাজ্জাক খান, আলমগীর, আব্দুল মান্নান, রাসেল, মধু ও সারোয়ার।
আসামিদের মধ্যে শাহ আলম মিঠু, অনীল কুমার দাস ও আবুল হাসান ভবন মালিক রানাকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
রানা প্লাজার তিনতলা থেকে আটতলা পর্যন্ত ছিল বিভিন্ন গার্মেন্টস। তিনতলায় ছিলো নিউ ওয়েভ বটমস গার্মেন্টস লিমিটেড। বজলুস সামাদ আদনান ও মাহমুদুর রহমান তাপস এ গার্মেন্টসটির মালিক। সেখানে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৫শ’ থেকে সাড়ে ৫শ’ জন। এ মালিকদের সাততলা ও আটতলায় একই নামে গার্মেন্টস ছিলো। সেখানে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৬শ’ থেকে সাড়ে ৬শ’ জন। অন্যদিকে আটতলায় শ্রমিকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০ জন।

শেয়ার