কালীগঞ্জে তালপাতার পাখা পল্লীতে ব্যস্ততা বেড়েছে কারীগরদের

Pakha Picture in Kaligonj
নয়ন খন্দকার, কালীগঞ্জ॥ প্রচণ্ড গরমে কদর বেড়েছে তালপাতার পাখার। ধনী-গরীব সবাই পাখা কিনছেন। ক্রেতার চাহিদা মেটাতে কালীগঞ্জের পাখাপল্লীর কারীগরদের ব্যস্ততাও বেড়ে গেছে। কেউ পাতা কেটে সাইজ করছেন, কেউ করছেন সেলাই। সুতা-শলায় রং-তুলির আঁচড় টেনে কেউ প্রস্তুত করছেন পাখা। এরফাঁকে বকেয়ার হিসেব কষছেন মহাজন, সেই সাথে চলছে আপ্যায়ন। কিন্তু মজার ব্যাপার, ঘাম শুকাতে পাখা প্রস্তুতে ব্যস্ততা কারীগরদের শরীর ঘেমে মাটিতে পড়লেও তাল পাখার বাতাস নেয়ার সময় তাদের জীবনে নেই। পরের সুখেই সুখি তারা। পেটের ভাত যোগাতে তাদের চাই কিছু রোজগার। মৌসুম শেষে এরা আবার হয়ে পড়ে বেকার। তাই এই গরম মৌসুমে কিছু রোজগার করে তারা সারা বছরের রুটি-রুজির গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে মরিয়া।
কালীগঞ্জের পাখা পল্লী দুলালমুন্দিয়া ও পারিয়াট। সেখানে সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় দুলালমুন্দিয়া গ্রামের মজনু, ফজলু, খালেক, নুর আলী, আব্দুল বারিক, চাঁনমিয়া, মোস্তফা ও আব্দুর রহিমের সাথে। তারা জানান পূর্ব পুরুষরা এই পাখা তৈরির কাজ করতেন। রুটি-রুজির প্রশ্ন তো আছেই, তারপর পুর্ব পুরুষের পেশাটাকে তারা ঐতিহ্য হিসেবে ধরে রাখতে চান। কালীগঞ্জের দুলালমুন্দিয়ার ৫০ পরিবার ও পারিয়াট গ্রামের প্রায় ৩৩ টি পরিবার তাল পাখা তৈরি করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছেন। এসব পরিবারের ছেলে মেয়েরাও বিভিন্ন নকশার পাখা তৈরীতে পারদর্শী। পাখা কারিগর জানান, হাত পাখার তৈরির প্রধান উপকরণ তালপাতা কিন্তু এ এলাকায় পাওয়া যায় না। শীত মৌসূমে ফরিদপুর ও মাগুরা জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে চারা গাছের পাতা কিনে আনেন। তারপর পাতা রোদে শুকিয়ে পানিতে ভিজিয়ে রাখেন। পরে পানি থেকে উঠিয়ে নরম ভেজা পাতা গোলাকার করে কেটে মাঝখান থেকে দু’খন্ড করেন। এরপর বোঝা বেধে পাতা ঘরে রেখে দেন এবং সেখান থেকে নিয়ে সারাবছর বাড়ীতে বসে পাখা প্রস্তুত করে সরবরাহ করেন বাজারে। একটি তাল পাতা থেকে দুটি হয়। তিনি আরও জানান, পুঁজি না থাকায় এবং অনেক দূর থেকে পাতা কিনে আনতে পরিবহণ খরচ পড়ে যায় বেশি। কারিগর মজনু মিয়া জানান, বছরে ২/৩ মাস তাল পাখার বেশী চাহিদা থাকে। চৈত্র থেকে শুরু করে জৈষ্ঠ্য মাস পর্যস্ত বিক্রির মৌসূম হলেও চৈত্র ও বৈশাখ মাসই পাখা বিক্রির উপযুক্ত সময়। প্রচন্ড তাপদাহ ও বিদ্যুতের লোডশেডিং এ সময়টাতে বেশী হওয়ার কারণে তাল পাখার কাটতি হয় বেশি। ফলে তাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। বছরের অন্যান্য মাসে তালপাখার তৈরীর কাজ ও বিক্রি চললেও শীত আসলে একদম বন্ধ হয়ে যায়। শীত জন্য যেন এক অভিশাফ। তিনি জানান পরিবারের ছোটরাও বাবা মায়ের ব্যস্ততা দেখে বসে থাকতে পারে না। পড়াশুনার পাশাপাশি পাখা তৈরীর বিভিন্ন কাজ করে তার বড়দের সাহায্য করে। নুর আলী নামের একজন কারিগর জানান, গত বছরগুলোর চেয়ে এবার পাখা প্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৩ টাকা। কিন্তু তারপরও লাভ হচ্ছে কম। কারণ প্রতিটি জিনিসেরই দাম বেশী। তিনি জানান, প্রতিটি পাখায় তৈরি পর্যন্ত প্রায় ৮ থেকে ১০ টাকা খরচ হচ্ছে। বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১২ থেকে ১৫ টাকা টাকা। একজন কারিগর প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টি তালপাখা তৈরী করতে পারেন। ফলে প্রতিটি কারিগর বিক্রির মৌসূমে দিনে যাবতীয় খরচ বাদে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করেন। পাইকাররা এখন বাড়ী থেকেই পাখা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে পরিবহন খরচ থেকে রেহাই পাচ্ছেন প্রস্তুতকারকরা। জোছনা নামের এক গৃহবধু জানান, পাতা দিয়ে পাখা তৈরী করে, শরীর ঘেমে মাটিতে পড়লেও বাতাস নেয়ার সময় তাদের হয় না। কারণ রান্না-বান্না ও গৃহস্থলীর কাজের পাশাপাশি তাদের পাখা তৈরীর কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। অমেলা বেগম নামে এক বৃদ্ধা মহিলা জানান, প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি পাখা তৈরীর কাজ করছেন। বাড়ীর বৌদেরকেও তৈরীর কাজ শিখিয়েছেন।

শেয়ার