শ্যামনগরে ব্রিজ নির্মাণে নিয়োজিত ঠিকাদারের ব্যাংক গ্যারান্টি জালিয়াতি ॥ পাইলিং শেষ না হতেই এলজিইডি’র যোগসাজসে আড়াই কোটি টাকা উত্তোলন

shathira bridge
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা॥ জেলার শ্যামনগর উপজেলার নওয়াবেকি গ্যারেজ হাট এলাকায় ৯০ মিটার আরসিসি গার্ডার ব্রীজ নির্মাণ কাজে নিয়োজিত মেসার্স হাজী এন্টারপ্রাইজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পৌনে এক কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি জালিয়াতি ও যৎ সামান্য কাজ করে প্রায় আড়াই কোটি টাকা উত্তোলনের তথ্য ফাঁসের ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে বিষয়টির সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে এই জাল-জালিয়াতির সাথে এলজিইডি’র এক কর্মকর্তার যোগসাজস থাকায় কর্তৃপক্ষ নিশ্চুপ রয়েছে বলে এলজিইডি’র একাধিক সুত্রে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানাগেছে, দণি পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সাতীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলাধীন নওয়াবেকি গ্যারেজ হরিনগর হাট সড়কে চুনা নদীর উপর ৯০ মিটার আরসিসি গার্ডার ব্রীজ নির্মাণ কাজের জন্য প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা বরাদ্ধের বিপরিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গুলোর নিকট থেকে বিগত ২০১২ সালে দরপত্র আহবান করেন সাতক্ষীরা এলজিইডি কর্তৃপক্ষ। এতে দরপত্র দাখিল করেন বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ থানার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাজী এন্টারপ্রাইজের স্বত্তাধিকারি গোলাম কবীর শিকদার। দরপত্র জমাদানের পর টেণ্ডার কমিটির সভাপতি এম ফারুক হোসেনসহ কমিটির অন্যান্যরা তা যাচাই বাছাই করে প্রতিষ্ঠানটির অনুকুলে কার্যাদেশ প্রদানের সিদ্ধান্ত দেন। সে লে তৎকালিন নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ারুল ইসলাম গেল বছরের ২১ জানুয়ারী ২৫৬ নং স্মারকে উক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকুলে “নোয়া” প্রদান করেন। এরই প্রেেিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির নিকট থেকে ব্যাংক গ্যারান্টি চাওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের স্বত্তাধিকারি গোলাম কবির শিকদার ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড বরিশাল শাখা কর্তৃক প্রদত্ত ইএ/ইজখ/২০১৩/১৭, উঅঞঊউ ০৩.০২.২০১৩ সালে ৬২ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দেন এলজিইডির দপ্তরে। এরপর এলজিইডি কর্তৃপ সাত/১২/২০১৩ স্মারকমুলে সংশিষ্ট ব্যাংক গ্যারান্টি সঠিক আছে কি না যাচাইয়ের জন্য এলজিইডি’র প্রকল্পের অফিস সহকারি মোস্তাফিজুর রহমানকে ঢাকা ব্যাংক লিঃ বরিশাল ব্রাঞ্চে প্রেরণ করা হয়। সেখান থেকে প্রদত্ত পত্রটিতে ব্যাংক গ্যারান্টি সঠিক আছে মর্মে পুনরায় এলজিইডির সাতীরা নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবহিত করেন। এক পর্যায়ে নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ারুল ইসলাম হাজী এন্টারপ্রাইজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদান পূর্বক ১৮ ফেব্র“য়ারি ২০১৩ তারিখের মধ্যে নির্মাণ কাজ শুরু করে চলতি বছরের ২০ শে মার্চের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু কার্যাদেশটি যথা সময়ে শেষ না হতেই ব্যাংক গ্যারান্টি জালিয়াতির বিষয়ে ফাঁস হয়ে পড়ে এবং এবিষয়ে অফিস অভ্যন্তরে অসন্তোষ দেখা দেয়। এরই মধ্যে জালিয়াত চক্রের হোতা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির স্বত্ত্বাধিকারি গোলাম কবীর শিকদার নির্মানাধীণ ব্রীজের এখনও পর্যন্ত পাইলিং এর কাজ শেষ করতে পরেননি। অথচ সংশিষ্ট অফিসের কতিপয় কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে ৩ দফায় ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকার বিল উত্তোলন করেছেন। একই সময়ে নির্মিত ব্রীজের কাজের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৬৬ ভাগ। যা কাজের তুলনায় অগ্রগতি অনেক বেশি। এদিকে যথা সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারী অতি গোপনে বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শাহেদুর রহিম প্রদত্ত ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ বৃদ্ধির লে ঢাকা ব্যাংক লিঃ বরিশাল ব্রাঞ্চকে একটি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রে ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি ৬২ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা এলজিইডি সাতীরার এসটিডি হিসাব নং ৫০১.১৫০.৫৪৪ ঢাকা ব্যাংক সাতীরা শাখার অনুকুলে জমা করার নির্দেশ দেন। উক্ত নির্দেশ পত্রে নির্বাহী প্রকৌশলী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির জালিয়াতির বিষয়ে সন্দেহ হওয়ায় ব্যাংক গ্যারান্টির ভ্যালিডিটির সময় বৃদ্ধির বিষয়টি ইতোপূর্বে জানানো হলেও সে বিষয়য়ে ব্যাংক কর্তৃপ সন্তোসজনক জবাব দেয়নি।
এদিকে এপত্রের জবাবে ঢাকা ব্যাংক বরিশাল ব্রাঞ্চ’র বর্তমান ভিপি এ্যাণ্ড ম্যানেজার আব্দুল মালেক হাওলাদার ও সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার এমডি হাসান আলী স্বারিত ফিরতি বার্তায় জানানো হয়েছে প্রদত্ত ব্যাংক গ্যারান্টির অনুকুলে উক্ত ব্যাংকে কোন রেকর্ড পাওয়া যায়নি। ফলে এটি ভূয়া বলে তারা মনে করেন। একই সাথে কথিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাজি এন্টারপ্রাইজের স্বত্তাধিকারি গোলাম কবির শিকদারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সুপারিশ করেন। এঘটনায় এলজিইডির হিসাব সহকারি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ব্যাংক গ্যারান্টি যাচাই বাছাই করবে নির্বাহী প্রকৌশলী এবং তার সহকারি। আমাকে পাঠিয়ে যাচাই বাছাই করা হয়নি। তিনি যাননি উলেখ করে বলেন, আমাকে পাঠাতে হলে চিঠি দিয়ে ব্যাংকে পাঠাতে হয়। সে ধরণের কোন চিঠি ইস্যু করেননি। ঘটনাটি জানার পর তিনি নিজেই লিখিত ভাবে নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবহিত পূর্বক কপি নিজ দায়িত্বে রেখেছেন। একই সাথে তিনি বলেন, ল ল টাকা নিয়ে অনিয়ম করেছেন বড় বড় কর্মকর্তারা আর এখন জায়েজ করার চেষ্টা করছেন আমাদের মত চুনোপুটির ঘাড়ে চাপিয়ে। অফিস সহকারি শহিদুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকের পত্র পেয়ে ওই ব্যাংকের ম্যানেজার এবং সংশিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঢাকা ব্যাংকের মহাপরিচালক বরাবর সম্প্রতি অভিযোগ প্রেরণ করা হয়েছে। মেসার্স হাজী এন্টারপ্রাইজের স্বত্তাধিকারি গোলাম কবির শিকদারের ব্যক্তিগত সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে তার সাইড ম্যানেজার পরিচয়ে জনৈক আব্দুল হক জানান, ওই ব্যাংকের কর্মকর্তারা একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ভূয়া ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে ৫ জন পালিয়ে গেছে। এঘটনায় পলাতকদের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানদের প থেকে রিট পিটিশন দাখিল করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা অতি দ্রুত পুনরায় ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে তিনি হাজী এন্টারপ্রাইজের স্বত্তাধিকারির সাথে কথা বলতে চাইলে এড়িয়ে যান। এব্যাপারে এলজিইডির সিনিয়ার এ্যাসিসটেন্ট ইনজিনিয়ার টেণ্ডার কমিটির সভাপতি কেএম ফারুক হোসেনের সাথে যোগাযোগ করে ফোন রিসিভ না করায় কথা বলা সম্ভব হয়নি। সার্বিক বিষয়ে সাতীরা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম শাহেদুর রহিম জানান, আমি যোগদান করেছি কয়েক মাস হয়েছে। বিষয়টি জানার পর ওই প্রতিষ্ঠানের দেয়া ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য পত্র পাঠিয়ে আমি দেশের বাইরে গিয়েছিলাম। অফিসে বসলে বলতে পারবো শেষ অবস্থা কি। তবে যদি ব্যাংক গ্যারান্টি ভূয়া হয় তাহলে অবশ্যই ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে জানান তিনি ।

শেয়ার