সরকারের ব্যাংকঋণ কমছে

Savings certificate
সমাজের কথা ডেস্ক॥
সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম সাড়ে ছয় মাসে (১ জুলাই থেকে ১৬ জানুয়ারি) সরকার ব্যাংক থেকে তিন হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা ধার করেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা।

জাতীয় সঞ্চয় পরিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরের সাড়ে ছয় মাসে সঞ্চয়পত্রের প্রকৃত (নিট) বিক্রি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২২ গুণ বেড়ে তিন হাজার ৮৫৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

২০১২-১৩ অর্থবছরের একই সময়ে সঞ্চয়পত্রের প্রকৃত বিক্রির পরিমাণ ছিল মাত্র ১৭৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

নির্দিষ্ট সময়ে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মোট পরিমাণ থেকে আগের বিক্রীত সঞ্চয়পত্রের নগদায়নের পরিমাণ বাদ দেওয়ার পর অবিশিষ্টাংকে সঞ্চয়পত্রের প্রকৃত বিক্রি বলা হয়। নগদায়নের ক্ষেত্রে গ্রাহককে সুদসহ আসল পরিশোধ করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার কমিয়ে আনায় এবং পুঁজিবাজারে দীর্ঘ মন্দা পরিস্থিতি থাকায় ‘ঝুঁকিমুক্ত’ বিনিয়োগ হিসাবে পরিচিত সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বেড়েছে। ফলে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার পরিমাণও কমেছে।

“জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি গত কিছুদিন কিছুটা ধীর ছিল। সে কারণে সরকারের খরচও কম ছিল। যে অর্থের প্রয়োজন ছিল তার একটি বড় অংশ সঞ্চয়পত্র থেকে পাওয়ায় সরকারকে আর ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে খুব বেশি ঋণ নিতে হয়নি।”

পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ২০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ শতাংশ কম।

ফরাসউদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ব্যাংকগুলো তাদের আমানতের সুদের হার কমিয়েই চলেছে। শেয়ার বাজারের মন্দা কাটেনি। সে কারণে মানুষ একটু বেশি মুনাফার আশায় ‘নিরাপদ’ বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্র কিনছে।

“এটা একটা ভালো দিক। সরকার এই খাত থেকে ঋণ নিয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালাতে পারবে। গত দুই-তিন বছরের মতো ব্যাংক ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করতে হবে না।”

সঞ্চয় পরিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে ৬২৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকার বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রের প্রকৃত বিক্রি হয়েছে। অগাস্টে ৬৯১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, সেপ্টেম্বরে ৭৮০ কোটি ৭০ লাখ টাকা ও অক্টোবরে ছিল ৬০১ কোটি ৪১ লাখ টাকা।

নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৯০৯ কোটি ১৮ লাখ এবং ৯৫৭ কোটি টাকা।

সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে গত অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সাত হাজার ৪০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরলেও কাঙ্খিত বিক্রি না হওয়ায় তা কমিয়ে এক হাজার ৯৭৩ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

তবে সে লক্ষ্যও পূরণ হয়নি। ২০১২-১৩ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের প্রকৃত বিক্রির পরিমাণ ছিল ৭৭২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৩৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে সরকার। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ২৫ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা এবং জাতীয় সঞ্চয়পত্র প্রকল্পগুলো থেকে চার হাজার ৯৭১ কোটি টাকা ধার করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছে।

চলতি অর্থবছরের সাড়ে ছয় মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৮৫৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ বাজেট ঘাটতি মেটাতে চলতি অর্থবছরের পুরো সময়ে (১২ মাসে) সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে যে পরিমাণ ঋণ নেওয়ার লক্ষমাত্রা ধরেছিল তার প্রায় ৮০ শতাংশ সাড়ে ছয় মাসেই নিয়েছে।

জাতীয় সঞ্চয় পরিদপ্তরের মাধ্যমে বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্র, প্রতিরক্ষা সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, ছয় মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়।

২০১১-১২ অর্থবছরে ৪৭৯ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে যেসব সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে তার ৮০ শতাংশই পরিবার সঞ্চয়পত্র। ১৫ শতাংশ পেনশনার সঞ্চয়পত্র। বাকি ৫ শতাংশ অন্যান্য সঞ্চয়পত্র।

সাবেক এই গভর্নর বলেন, সাধারণত মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে থাকে। এই সরকার আসার পর পরিবার সঞ্চয়পত্র আবার চালু করে।

“সে কারণেই এই সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বেশি হচ্ছে।”

বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্রের সুদের হারই সবচেয়ে বেশি, ১৩ শতাংশের মতো। নারীদের জন্য ‘বিশেষ’ সুবিধার অংশ হিসেবে সরকার এই সঞ্চয়পত্রটি চালু করে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রথম পরিবার সঞ্চয়পত্র চালু হয়। এরপর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে তা বন্ধ করে দেয়। আওয়ামী লীগ ফের ক্ষমতায় এসে আবার সেটি চালু করে।

২০১২-১৩ অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ২৩ হাজার কোটি টাকা ধার করবে বলে লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল। অর্থবছর শেষে তা সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ২৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছিল।

SHARE