লোহাগড়ায় চা বিক্রেতা তুর্কি হত্যা নিয়ে চলছে বাণিজ্যিক দেনদরবার

oniom
লোহাগড়া (নড়াইল) প্রতিনিধি॥ নোংরা গ্রাম্য রাজনীতির উর্বরত্রে নড়াইলের লোহাগড়ার কোটাকোল ইউপির দিঘলিয়া পূর্বপাড় গ্রামের দরিদ্র চায়ের দোকানদার তরিকুল ইসলাম তুর্কি মোল্লা হত্যার ঘটনায় গত তিনদিনেও মামলা হয়নি। তুর্কির লাশ নিয়ে গ্রামের কথিত মোড়লদের নোংরা রাজনীতি শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। সকাল-সন্ধ্যা যেন চলছে লাশ বিক্রির দেনদরবার। প্রকৃত হত্যাকারীদের বাদ দিয়ে অর্থশালী ও গ্রাম্য প্রতিপদের আসামি করার চেষ্টা চলছে। চলছে দরকষাকষি। বার বার পরিবর্তন করা হচ্ছে মামলার কপি । হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত তুর্কির ভাই সরোয়ার মোল্লা লোহাগড়া থানায় মামলা দায়েরের জন্য প্রস্তুতকৃত এজাহারের কপি ওই এলাকার সলেমান ঠাকুর ও বেবি গাজীসহ কয়েকজনের ইশারায় বারবার পরিবর্তন করছেন বলে অভিযোগ। গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত থানায় এজাহার জমা দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লোহাগড়ার কোটাকোল ইউপির কয়েকটি গ্রামে স্থানীয় মাতব্বরদের নোংরা গ্রাম্য রাজনীতির কারণে ইতিপূর্বে ২/৩ জন হত্যার শিকার হয়েছে। পঙ্গুত্ব বরণ করেছে ৭/৮ জন। অন্তত তিন শতাধিক ঘরবাড়িতে ভাংচুর-লুটপাট হয়েছে । গ্রাম্য রাজনীতির কারণে ঘাঘা গ্রামে ২০০৯ সালে রাভেল নামে একজন খুন হন । এরপর ২০১১ সালে কোটাকোল গ্রামের আক্কাস শেখ খুন হন । আর সর্বশেষ গত ২৯ জানুয়ারি রাতে গ্রাম্য রাজনীতির বলি হলেন দরিদ্র চায়ের দোকানদার তুর্কি মোল্লা ।
সর্বশেষ হত্যার ঘটনায় তুর্কির পরিবার তিগ্রস্ত হলেও পরিবার পরে ওই এলাকার কয়েকজন গ্রাম্য মাতুব্বর মামলা করা নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন। যে কারনে এখনো পর্যন্ত থানায় এজাহার জমা দেওয়া হয়নি । নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে কয়েকদফায় সম্ভাব্য এজাহারে আসামীর নামের তালিকা পরিবর্তন করা হয়েছে। কয়েকজন গ্রাম্য মাতব্বর মামলায় আসামি করবেন না এ শর্তে সম্ভাব্য আসামিদের কাছ থেকে ২৫ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করতে দেনদরবার শুরু করেছেন ।
তুর্কি মোল্লা হত্যার পর তার পরিবারের প থেকে একেক সময় একেক রকম তথ্য দেওয়া হচ্ছে। নিহত তুর্কির বড় ভাই আব্দুর রহমান মোল্লা সাংবাদিকদের বৃহস্পতিবার সকালে জানান, ওই এলাকার হামিদ মুন্সী, রবিউল মুন্সী, বদু মুন্সী, জামান মুন্সী ও কাসেম সরদারদের সাথে আমাদের জমি নিয়ে পূর্ব বিরোধ রয়েছে। জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে প্রতিপরা তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। একইদিন দুপুরে তুর্কির আরেক ভাই সরোয়ার মোল্লা সাংবাদিকদের বলেন, পূর্বপাড়ার লিটু মোল্লা, আকরাম মেম্বর , রনি মোল্লার সাথে জমি নিয়ে বিরোধ আছে। তারাই তুর্কিকে হত্যা করেছে। অথচ গত শুক্রবার বিকালে নিহত তুর্কির স্ত্রী ফেরদৌসী বলেন, আমাদের সাথে কারো জমি নিয়ে বিরোধ ছিলনা তবে গ্রাম্য দলাদলি নিয়ে এ এলাকার আলম মুন্সী, ডাবলু মোল্লাা, পিকুলদের সাথে বিরোধ ছিল ।
তিনি আরো বলেন, আমার ভাসুর সরোয়ার মোল্লা, কিবরি মোল্যা, রহমান মোল্লা দীর্ঘ দুই বছর বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন গ্রামের প্রতিপদের ভয়ে।
একাধিক সূত্র জানায়, ঘটনাস্থল থেকে তুর্কির লাশ উদ্ধারকারী ঘাঘা গ্রামের নুর বিশ্বাস, মনির বিশ্বাস, কোটাকোল গ্রামের দিদার, মহসীন, ভাটপাড়া গ্রামের নওশাদ ও আল-আমিনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যার প্রকৃত রহস্য বের হয়ে আসবে। প্রতিপদের ফাঁসাতে পরিকল্পিতভাবে তুর্কির লাশ উদ্ধারকারীরাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে কয়েকটি সূত্র দাবি করছে। সূত্র আরো জানায়, গ্রাম্য দলাদলির কারণে নিহত তুর্কি মোল্লাদের পরে ১৫/২০ জন প্রতিপরে ভয়ে প্রায় দুই বছর ধরে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। তারা ইচ্ছে করলেও বাড়িতে ফিরতে পারছিলেন না। তাই দীর্ঘদিন ধরে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়ানোদের বাড়ি ফেরানো এবং এলাকায় পুনরায় আধিপত্য বিস্তার করার জন্য তুর্কি মোল্যাদের পরে মাতব্বররা একটি কৌশল খুঁজছিলেন। আর এই কৌশলটি ছিল নিজ গ্র“পের দূর্বল কাউকে হত্যা করে প্রতিপদের শায়েস্তা করা। শুক্রবার বিকালে ওই এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, তুর্কি মোল্লাদের পরে মাতুব্বরদের পরিকল্পনা মোতাবেক হত্যার শিকার হয়েছেন তুর্কি মোল্লা। আরেকটি সূত্র জানায়, হত্যা করার টার্গেট ছিল তুর্কির মেঝ ভাই রবু মোল্লাকে কিন্তু মিস টার্গেটে হত্যার শিকার হন তুর্কি মোল্লা ।
তুর্কি মোল্লার ভাই সরোয়ার মোল্লা শনিবার জানান, প্রকৃত দোষিদেরই আসামি করা হবে। টাকা নিয়ে আসামির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে তিনি জানেন না বলে জানান। তিনি আরো বলেন যেহেতু ঘটনার সময় আমরা উপস্থিত ছিলাম না তাই তদন্ত করে থানায় মামলা দিতে দেরি হচ্ছে।
লোহাগড়া থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই আতিকুজ্জামান বলেন, তুর্কি হত্যার ঘটনায় এখনো থানায় কেউ এজাহার দিতে আসেনি। তবে শুনেছি মামলার ব্যাপারে একেক সময় একেক রকম সিদ্ধান্তে আসছেন তারা। তবে অবশ্যই যাচাই-বাছাই করে মামলা রেকর্ড করবো। যাতে নিরীহ লোক হয়রানির শিকার না হন। উল্লেখ্য, তরিকুল ইসলাম তুর্কি মোল্লা (৩৪) গত বুধবার রাত ৯টার দিকে দিঘলিয়া থেকে দোকান বন্ধ করে বাড়ি যাবার পথে হত্যার শিকার হন ।

SHARE