বাংলা ভাষার জাতিসংঘ স্বীকৃতির প্রচেষ্টা চলছে: প্রধানমন্ত্রী

Ekuse
সমাজের কথা ডেস্ক॥ জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
২১ ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে সফলতার কথা তুলে ধরে শনিবার এই বছরের একুশের গ্রন্থমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে একথা জানান তিনি।
বর্তমানে জাতিসংঘে ছয়টি ভাষা দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃত, এগুলো হল- ইংরেজি, চীনা, আরবি, স্পেনিশ, ফ্রেঞ্চ ও রুশ।
শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার উদ্যোগ নিয়েছি। কিছু সমস্যা আছে। তারপরও আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”
এই প্রসঙ্গে জাতিসংঘে বাংলায় দেয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণের স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেন, “তার ধারাবাহিকতায় আমিও জাতিসংঘে যতবার বক্তৃতা দিয়েছি, বাংলায় দিয়েছি।”
প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে শুরু হওয়া গ্রন্থমেলা ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারিজুড়ে চলবে।
সরকার জাতীয় গ্রন্থ নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “লেখক-প্রকাশকদের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক। প্রকাশকদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।”
বাংলাকে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে বিদেশি ভাষায় বাংলা সাহিত্যের অনুবাদের জন্যও লেখকদের প্রতি আহ্বানও জানান তিনি।
বরাবর বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে গ্রন্থমেলা হলেও এবার তা পাশের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও সম্প্রসারিত হয়েছে।
এই বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলা করা নিয়ে মত-দ্বিমত থাকতে পারে। তবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একটা ঐতিহাসিক মূল্য আছে।”
এই বলে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এই উদ্যানে দেয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এবং ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের কথা তুলে ধরেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার ওপরও জোর দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমী মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, “মেলার পরিধি প্রতিবছরই নিজেকে অতিক্রম করছে। এ কারণে মেলার বিস্তৃতি শুধুমাত্র একাডেমি প্রাঙ্গণে সীমাবদ্ধ রাখা আর সম্ভব হচ্ছে না।”
তবে মেলার মূল আয়োজন একাডেমী প্রাঙ্গণেই থাকবে বলেও জানান তিনি।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে বাংলা একাডেমী সংযোগ করে করে আন্ডারপাস করার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পরিধি আরো সম্প্রসারিত করা হবেও জানান তিনি।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রী মেলার কয়েকটি স্টল পরিদর্শন করেন। এরপরই মেলা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।
আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমী জানিয়েছে, ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। ছুটির দিন খুলবে সকাল ১১টায়। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টায় মেলার ফটক খুলবে।
সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদানের জন্য নয়টি শাখায় ১১ জনের বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। শনিবার মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানেই এই পুরস্কার দেয়া হয়।
কবিতায় হেলাল হাফিজ, কথাসাহিত্যে পূরবী বসু, প্রবন্ধে মফিদুল হক, গবেষণায় জামিল চৌধুরী ও প্রভাংশু ত্রিপুরা, অনুবাদে কায়সার হক, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে হারুণ হাবীব, আত্মজীবনী/ স্মৃতি কথা/ ভ্রমণ কাহিনীতে মাহফুজুর রহমান, বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও পরিবেশে শহীদুল ইসলাম এবং শিশু সাহিত্যে কাইজার চৌধুরী ও আসলাম সানী এবছর পুরস্কার পেয়েছেন।
পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে এক লাখ টাকার চেক, একটি করে শুভেচ্ছা স্মারক ও সনদ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এদের মধ্যে পূরবী বসু ও মাহফুজুর রহমান দেশের বাইরে থাকায় তারা অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি।
অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মূকাভিনেতা পার্থ প্রতিম মজুমদারকে সম্মানসূচক বাংলা একাডেমী ফেলোশিপ দেয়া হয়।
বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান বলেন, বিদেশি প্রকাশকরাও যেন মেলায় অংশ নিতে পারে, সেজন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
শামসুজ্জামান খান তার ও গোলাম মুর্শিদের সম্পাদনায় তিন খণ্ডের ‘বাংলা ভাষা বিবর্তনের অভিধান’ প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বাংলা একাডেমী, শিশু একাডেমিসহ শিল্পকলা একাডেমিকে নিয়ে রাজধানীতে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বাংলা একাডেমীর সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, “অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন তথ্য প্রযুক্তির যুগে হয়ত কাগজে ছাপা বই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা অনেক ইতিবাচক। মনে হয় আরো কিছু কাল হয় তো এ ধরনের আশঙ্কা না করলেও চলবে।”
জাতীয় সঙ্গীত ও চার ধর্মের গ্রন্থ থেকে পাঠের মাধ্যমে শুরু হয় উদ্বোধন অনুষ্ঠান। এর পর ভাষা শহীদদের স্মরণে বাজানো হয় ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’। এরপর ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিটের নীরবতা পালন করা হয়।

SHARE