রেলওয়ের তেল চোর সিন্ডিকেট প্রধান অরিফ শূন্য থেকে কোটিপতি

tel chor
নিজস্ব প্রতিবেদক, কালীগঞ্জ॥ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেলওয়ের তেল চোর সিন্ডিকেটের প্রধান অরিফ গত কয়েক বছরে রেলওয়ের তেল, যন্ত্রাংশ ও গাছ কেটে কোটিপতি বনে গেছেন। বাহিনী প্রধান অরিফের সঙ্গে রয়েছে প্রায় অর্ধ শতাধিক চোর সদস্য। রেলওয়ের নি¤œ পদস্থ কর্মকর্তাসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজসে তিনি এ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে আসলেও রয়েছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এই সিন্ডিকেটের কাছ থেকে মাসিক চুক্তি নিয়ে রেলওয়ে পুলিশ ও কর্মকর্তা তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে কালীগঞ্জ উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় তেল চোর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ করা হয়েছে কিন্তু কোন ফল হয়নি। যার কারনে প্রতিদিন রেলগাড়ী থেকে শত শত লিটার তেল চুরি হচ্ছে। সিন্ডিকেট প্রধান অরিফ কয়েক বছরে গাড়ী, বাড়িসহ ব্যাংক ব্যালেন্স করে বনে গেছেন কোটিপতি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের ঈশ্ববরা মোড়ে বাড়ি ও মার্কেট করেছেন। করেছেন তানিজ ফার্নিচার। মূলত ফার্নিচারের ব্যবসার আড়ালে তিনি তেল চুরির ব্যবসা করছেন দীর্ঘ বছর ধরে। যা সবাই জানেন। রাজনৈতিক ছত্র ছায়ায় তিনি তার বাহিনী দিয়ে এ ব্যবসা করছেন। আর বড় বড় অফিসারদের বাড়িতে মাছ, গোশসহ মাসিক চুক্তি পৌঁছে দেন নির্দিষ্ট সময়ে। এদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলে হুমকির মুখে পড়েন সাংবাদিকরা। ঘটনার প্রধান নায়ক আরিফ নেপত্রে থাকলেও এখন তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রায়ই তাকে দেখা যাচ্ছে কালীগঞ্জ থানা বারান্দায়। সম্প্রতি মাগুরায় কয়েক ট্রাক তেল চুরির ঘটনায় পুলিশ তার বাড়িতে অভিযান চালায়। কিন্তু অভিযানের পূর্বে স্থানীয় থানা পুলিশ আরিফকে খবর দিয়ে দেয়। ফলে সহজে বাড়ি থেকে সে পালিয়ে যায় রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলাধীন সুন্দরপুর রেলস্টেশন এলাকার একটি সংঘবদ্ধ চক্র ও রেলওয়ের কিছু কর্মকর্তা, কর্মচারি এবং ট্রেনের চালকসহ স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কিছু দুর্নীতিবাজ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত দলটি দীর্ঘদিন ধরে তেল নামিয়ে বিক্রি করে আসছে। যে কারনে প্রশাসন কখনো এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
রেলওয়ের একটি সূত্র জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চলাচলকারী রেল ইঞ্জিনে খুলনা, ঈশ্বরদী ও পার্বতীপুর তেল ডিপো থেকে প্রতিদিন তেল দেওয়া হয়। চলাচলকারী এসব রেল ইঞ্জিনে ৩৫শ লিটার তেল ধরে। নিয়ম রয়েছে প্রয়োজন ছাড়া এক লিটার তেল বেশি খরচ হলে তা চালকদের বেতন থেকে কেটে নেয়া হবে।
সূত্রটি আরো জানায়, এত কিছুর পরও সবার চোখে ধুলা দিয়ে কিছু দুর্নীতিবাজ তেল ডিপো ইনচার্জ চালকদের সাথে আঁতাত করে প্রতিদিন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তেল বিক্রি করছে। এসব ঘটনায় র‌্যাবের অভিযানে বিভিন্ন সময় রেলের চোরাই তেল আটক ও একাধিক মামলা হলেও খোদ রেলের নিরাপত্তা বিভাগের সদস্যরা কিছুই জানেনা। প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার তেল ট্রেন ইঞ্জিন থেকে নামিয়ে চোরাই পথে বিক্রি করছে এই সিন্ডিকেট। ফলে রেলওয়েকে প্রতি বছর লোকসান দিতে হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। সংঘবদ্ধ তেল চোর সিন্ডিকেট ঝিনাইদহ জেলার মোবারকগঞ্জ, সুন্দরপুর, চুয়াডাঙ্গা জেলার হালসা, পোড়াদহ, রাজবাড়ির পাঙ্গসা, দৌলতদিয়াঘাট, চাপাইনবাবগঞ্জের আমনুরা ও খুলনার বেজেরডাঙ্গা, চেঙ্গুটিয়া এবং সিঙ্গিয়া রেলস্টেশনসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ১০টি স্পটে তেল নামিয়ে বিক্রি করে আসছে।
বিশেষ ধরণের পলিব্যাগ ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার ডিজেল তেল যাত্রাবাহি চলন্ত ট্রেন থেকে নামিয়ে নিচ্ছে। বিশেষ এই পলিথিনে ৩০ থেকে ৩৫ লিটার তেল ভরে নির্দিষ্ট স্থানে পৌছানোর পর চলন্ত ট্রেন থেকে মাটিতে ফেলে দেয় খোদ ট্রেনের চালকরা। এই পলিথিন ফেটে যাওয়ার সাম্ভাবনা খুবই কম যে কারনে রেলেওয়ের কিছু দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির সাথে আঁতাত করে এই জ্বালানী তেল নামিয়ে থাকে।
এছাড়া মালবাহী ট্রেনগুলো ফাঁকা মাঠের মধ্যে থামিয়ে তেল নামানো হয়। ২০১০সালের ১ মার্চ রাতে সুন্দরপুর স্টেশন এলাকায় একটি মালবাহী ট্রেন থামিয়ে চোরেরা ইঞ্জিনের সব তেল নামিয়ে নেওয়ার পর ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। পরে মোবারকগঞ্জ স্টেশনে দাড়িয়ে থাকা ঢাকাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস-৭২৫ আপ ট্রেনের ইঞ্জিন খুলে মালগাড়ি সরিয়ে নিলে আড়াই ঘন্টা পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
একইভাবে ২০০৯ সালের ৫ মার্চ ভোরে সুন্দরপুর এলাকায় একটি মালবাহী ট্রেন থামিয়ে তেল নামানোর সময় ট্রেনে থাকা প্রায় দুইশত বস্তা চাল লুট হয়। ফলে তেল চুরির ঘটনা আরো পরিস্কার হয়। এঘটনায় কালীগঞ্জ থানার পুলিশ অভিযান চালিয়ে ৯০ লিটার তেল ও বেশ কয়েক বস্তা চাল উদ্ধার করে।
২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সুন্দরপুর বাজারে র‌্যাব-৬ এর একটি দল অভিযান চালিয়ে ৬টি তেল রাখার কন্টেনারসহ প্রায় ৩শ’ লিটার ডিজেল উদ্ধার করে।
একই অভিযোগে ২০০৭ সালে নাটোরের লালপুর থানায় ঈশ্বরদীর মালবাহী ট্রেনের চালক ইউছুপ আলী, ফায়ারম্যান রফিকুল ইসলাম, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর হাবিলদার আব্দুর রাজ্জাক, একজন প্রহরী ও গার্ড জিয়াউর রহমানসহ ৫ জনের নামে পুলিশ মামলা করে।
এদিকে স্থানীয় থানা পুলিশ কর্মকর্তারা দ্বায়িত্ব এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে বলেন, তেল চুরির ঘটনা শুনেছি যদি হয়ে থাকে তাহলে সেটা রেলওয়ে পুলিশের ব্যাপার। আমাদের করার কিছু নেই। রেলওয়ে নিরাপত্তা পুলিশের চীফ ইন্সপেক্টর (খুলনা অঞ্চল) শহীদ জানান, ট্রেন ইঞ্জিন থেকে তেল নামানো হয় এটা আমরা জেনেছি। কিন্তু যে সব জায়গায় তেল নামানোর কথা শোনা যাচ্ছে সেখানে কোন স্থায়ী স্টাফ নেই। যে কারনে আমরা সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিতে পারি না। তারপরও চেষ্টা করে যাচ্ছি তেল চোর সিন্ডিকেট সদ্যদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য।
এ ঘটনায় পাকশী বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম জানান, আমরা এ রকম সংবাদ শুনেছি। যদি তাই হয় তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিভিশনাল ট্রান্সপোর্টেশান অফিসার সুজিত কুমার বিশ্বাস জানান, তেল চুরির সাথে জড়িত প্রমান হওয়ায় আমরা বেশ কয়েকজন রেল কর্মীকে ইতিমধ্যে শাস্তি প্রদান করেছি। সম্প্রতি তেল চুরির ঘটনায় বেশ কয়েকটি অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। এরপরও তেল চুরি হচ্ছে। বিষয়টি আন্তরিকভাবে দেখা হবে।

SHARE