খুলনা অঞ্চলে লোকসানের মুখে বন্ধ হয়ে গেছে ১২টি পাটকল

pat kol
এসএম সাঈদুর রহমান, খুলনা ব্যুরো॥ খুলনাঞ্চল দেশের অন্যতম পাট শিল্পের সূতিকাগার হিসেবে স্বাধীনতার পর থেকে চিহ্নিত। শুধু এই অঞ্চলেই নয় পাট শিল্প রায় গোটা দেশে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অগ্রযাত্রার রোড ম্যাপ ছিল অদূরদর্শীতায় ভরপুর। যেকারণে সরকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারী পাটকলগুলোও লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে খুলনাঞ্চলে বেশকিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন পাটকল গড়ে
উঠলেও দেশের বিভিন্ন স্থানের ১২টি পাটকল ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধের পথে রয়েছে আরও অন্তত ১২টি পাটকল। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ‘সোনালী আঁশ’ খ্যাত পাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পাটকলগুলো অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেন।
সূত্রমতে, মহাজোট সরকার মতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বন্ধ পাটকল চালু এবং রুগ্ন শিল্পকে চাঙ্গা করতে বেশ কয়েকটি নির্দেশনা ও প্রকল্প হাতে নেয়। এটি এ অঞ্চলের নির্বাচনী প্রতিশ্র“তিও ছিল। দু’টি পাটকল চালু করলেও অন্যান্য েেত্র আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দূরদর্শীতার অভাবে তা সঠিক সময় আলোর মুখ দেখতে পারেনি। গত ৫ বছর প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের চেয়ে আশার আলোয় গাধার সামনে মুলা ঝুলিয়ে রাখার মত করে রাখা হয়েছে। এই শিল্পে অগ্রগতির চেয়ে অনেকেেত্র মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতায় অবনতি হয়েছে বেশি। ফলে এই শিল্পের সাথে জড়িত সংশ্লিষ্টরা পড়েছে চরম বিপাকে। যেখান থেকে এই মুহুর্তে উত্তরনের তেমন কোন সম্ভনাই দেখা যাচ্ছে না। কারণ সকল প্রতিকুলতার সাথে যোগ হয়েছে এখন রাজনৈতিক চরম অস্থিরতা।
ব্যক্তি মালিকানাধীন পাটকলের সাথে সংশিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি এবং সরকারের দেয়া সাবসিডির পরিমাণ কমিয়ে দেয়ায় দেশের বেসরকারী পাটকলগুলোতে দৈন্যদশা চলছে। সূত্রটি জানায়, মহাজোট সরকারের গোড়ার দিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন পাটকলে সাবসিডির পরিমাণ ৭% থেকে বাড়িয়ে ১০% করা হলেও সরকারের শেষ সময়ে এসে তা’ আবারও কমিয়ে সাড়ে ৭% করা হয়। অর্থাৎ পাটকলের ব্যবসাকে উৎসাহিত করে আবারও সাবসিডির পরিমাণ কমিয়ে দেয়ায় প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না অনেকে। যে কারণে সাম্প্রতিককালে বরিশালের খান সন্স, আশুলিয়ার ফাতেমা জুট মিল, ফরিদপুরের শরীফ জুট মিল ও আজিজ ফাইবার, নারায়ণগঞ্জের সুরুজ মিয়া, চরমুগুরিয়ার আলহাজ্ব আমিন উদ্দিন ও চরমুগুরিয়া জুট মিল, মাদারীপুরের ফেরদৌস জুট মিল, নারায়ণগঞ্জের নিশান জুট মিল, রাজবাড়ির আল নাস এবং পটুয়াখালীর পটুয়াখালী জুট মিল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া কুমিলার উষা জুট মিল তিন শিফট থেকে এক শিফটে নিয়ে যাবার পাশাপাশি ফরিদপুরের বিএস জুট মিলও বন্ধের পথে বলেও সূত্রটি জানিয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের ১২টি প্রাইভেট জুট মিল বন্ধ ও ১২টি বন্ধের পথে রয়েছে বলে স্পীনার্স এসোসিয়েশনের এক জরিপে দেখা যায়।
সূত্র মতে, বাংলাদেশের পাটকলগুলোতে উৎপাদিত পণ্য তিউনিসিয়া, লেবানন, সৌদি আরব, মিশর, তুরস্ক, ইরানসহ বেশকিছু দেশে রপ্তানি হত। কিন্তু ওইসব দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নাজুক হওয়ায় বাজার ধরে রাখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা হ্রাস অপরদিকে সরকারের দেয়া সাবসিডি কমানোই দেশের বেসরকারি পাটকল বন্ধের অন্যতম কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে অপর একটি সূত্র বলছে, দেশের বড় কয়েকটি বেসরকারি পাটকলের মালিক চাচ্ছেন ছোট ছোট পাটকল বন্ধ হয়ে যাক। তাহলে ওইসব বড় প্রতিষ্ঠানগুলো মনোপলি ব্যবসা করতে পারবে। যে কারণে সরকারের সাথে গোপন আঁতাত করে সাবসিডির পরিমাণ কমানো হয়েছে বলেও ওই সূত্রটি উল্লেখ করেছে।
খুলনার ফুলতলার সুপার জুট মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ ভূইয়া বলেন, ভারতের ডলার রেট বেশি থাকায় সেদেশের পাটকলগুলো লাভজনক হচ্ছে। পান্তরে বাংলাদেশের ডলার রেট যেমন কম তেমনি সরকারি সাবসিডিও কমানো হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমার পাশাপাশি চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় দেশের ব্যক্তি মালিকানা পাটকল লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। সুতরাং দেশের পাটকলগুলো টিকিয়ে রাখতে সরকারি সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। ঘোড়াশালের জনতা জুট মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হোসেন বলেন, সরকারি সাবসিডি কমানোর ফলে দেশের প্রাইভেট জুট মিলগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ইতোমধ্যে দেশের ১২টি জুট মিল বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ১০/১২টি বন্ধের উপক্রম হয়েছে।

SHARE