মহানায়িকার মহাপ্রয়াণ

suchitra6
সমাজের কথা ডেস্ক॥ অভিনয় ও সৌন্দর্যে তিনি ছিলেন বাংলা ছবির মহানায়িকা। ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে জুটি বেঁধে সিকি শতাব্দী শাসন করেছেন দর্শক হৃদয়।
বাংলা চলচ্চিত্রের সেই কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন আর নেই।
২৫ দিন কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর শুক্রবার সকালে পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চ ছেড়ে চিরবিদায় নেন মহানায়িকা।
জীবনের শেষ ৩৫টি বছর সচিত্রা কাটিয়েছেন অন্তরালে। ‘অগ্নি পরীক্ষা’, ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘পথে হলো দেরী’, ‘শাপমোচন’ বা ‘শিল্পী’ চলচ্চিত্রে সুচিত্রার যে রূপ দর্শক দেখেছে, তাতে আর পড়বে না বলিরেখা, জরার ছাপ।
বাংলা সিনেমার ক্ল্যাসিক জুটি উত্তম-সুচিত্রা ছবির মতোই দর্শক হৃদয়ে থাকবে চির অমলিন।
এ বাংলার মেয়ে সুচিত্রার পারিবারিক নাম রমা দাশগুপ্ত।
১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল পাবনা জেলায় তার জন্ম।
বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন স্থানীয় স্কুলের প্রধানশিক্ষক। মায়ের নাম ইন্দিরা দেবী। পাবনাতেই তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়।
১৯৪৭ সালে ঢাকার অভিজাত পরিবারের সদস্য শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।
১৯৫২ সালে তিনি কলকাতার চলচ্চিত্র অঙ্গনে প্রবেশ করেন। ‘শেষ কোথায়’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রূপালি পর্দায় তার যাত্রা শুরু হলেও ছবিটি মুক্তি পায়নি।
১৯৫৩ সালে উত্তম কুমারের বিপরীতে অভিনীত ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ তার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি। ছবিটি ব্যবসা সফল হয়। তবে সেটি ছিল কমেডিনির্ভর ছবি এবং এর মূল আকর্ষণ ছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়।
১৯৫৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবিকে তার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট বলা হয়। এ ছবিতেই উত্তম- সুচিত্রা বাংলা সিনেমার ক্ল্যাসিক রোমান্টিক জুটিতে পরিণত হন।
এরপর একের পর এক হিট সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকদের মহানায়িকায় পরিণত হন সুচিত্রা সেন। ‘হারানো সুর’, ‘শাপমোচন’, ‘বিপাশা’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘শিল্পী’, ‘সাগরিকা’, ‘পথে হলো দেরী’, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’, ‘কমললতা’, ‘গৃহদাহ’, ‘প্রিয় বান্ধবী’, ‘দত্তা’, ‘পথের দাবী’, ‘সবার উপরে’, ‘সপ্তপদী’, ‘দীপ জ্বেলে যাই’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘সাতপাকে বাঁধা’-সহ অসংখ্য ব্যবসাসফল ও শিল্পসম্মত ছবিতে অভিনয় করে বাংলা ছবির প্রধান নায়িকায় পরিণত হন তিনি।
সিনেমায় তার ব্যক্তিত্ব এবং সৌন্দর্য দুটিই দর্শককে মোহাবিষ্ট করে রাখে। তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অশোক কুমার, বসন্ত চৌধুরী, দীলিপ কুমারসহ অনেক বিখ্যাত নায়কের বিপরীতে অভিনয় করেছেন। কিন্তু উত্তম কুমারের বিপরীতে তার জুটি সবচেয়ে বেশি দর্শকনন্দিত হয়। এবং উত্তম-সুচিত্রা জুটি চিরকালের সেরা রোমান্টিক জুটিতে পরিণত হয়।
‘সাতপাকে বাঁধা’ চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৬৩ সালে মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর সম্মাননা অর্জন করেন। তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রেও সাফল্য পেয়েছিলেন। কিন্তু বাংলা ছবির জগত ত্যাগ করেননি। এ জন্য তার অভিনীত হিন্দি ছবির সংখ্যা খুবই কম।
১৯৫৫ সালে পরিচালক বিমল রায়ের হিন্দি ছবি দেবদাসে পার্বতীর ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন।
১৯৭২ সালে তিনি পদ্মশ্রী খেতাবে ভূষিত হন।
১৯৭৪ সালে তাঁর অভিনীত হিন্দি ছবি ‘আঁধি’ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। এই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর মনোনয়ন পান। আর তার বিপরীতে অভিনয়ের জন্য সঞ্জীব কুমার সেরা অভিনেতার পুরস্কার জয় করেন।
২০১২ সালে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ সরকার রাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মাননা বঙ্গ বিভূষণে ভূষিত করে সুচিত্রা সেনকে।
দিবানাথ সেনের সঙ্গে তার বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি। তাদের একমাত্র সন্তান মুনমুন সেন এবং নাতনি রিয়া ও রাইমা সেনও চলচ্চিত্রাভিনেত্রী।
১৯৭৮ সাল থেকে সুচিত্রা সেন চলচ্চিত্রজগতকে বিদায় জানিয়ে নির্জনে বসবাস শুরু করেন। এবং রামকৃষ্ণ মিশনের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা বজায় রাখেন। তিনি কখনও কোনো জনসমাগমে অংশ নেননি। জনসম্মুখে আসতে হবে বলে ২০০৫ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন ।
মৃত্যুর অন্ধকার জগতে চিরতরে প্রস্থান করলেও মহানায়িকা সুচিত্রা সেন দর্শকদের মনে চিরসবুজ, চিরতরুণ, রোমান্টিক নায়িকারূপে বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

শেয়ার