সাতক্ষীরায় জামায়াত-শিবিরের তান্ডবে দীর্ঘ হচ্ছে লাশের তালিকা ॥ স্কুলছাত্রসহ আ.লীগের ১৯ নেতাকর্মী খুন ॥ ১৮ সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার

satkhira
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা ॥ রক্তাত্ব জনপদ সাতক্ষীরায় জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র তান্ডবে লাশের তালিকা দির্ঘ হচ্ছে। তাদের নৃসংশতার শিকার হয়ে চলতি বছরের ১০ মাসে অনন্ত: ১৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এরমধ্যে ১০ বছরের স্কুলছাত্র রয়েছে। অন্যরা সবাই ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মী ছিলেন। পিটিয়ে কুপিয়ে ও গুলি করে তাদের হত্যা করা হয়েছে। এ সময়ে জামায়াত শিবিরের প্রকাশ্য ও গুপ্ত হামলায় আহত হন আরো শতাধিক নারী-পুরুষ। এসব সংবাদ লিখে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের হাতে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৮ সংবাদকর্মী। এ পরিস্থিতিতে সরকারি নির্দেশে যৌথবাহিনী অভিযান শুরু করেছে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানাগেছে, চলতি বছরের ২৮ ফেব্র“য়ারী থেকে এ পর্যন্ত জামায়াত-শিবির কুপিয়ে, পিটিয়ে ও গুলি করে সাতক্ষীরা সদরে ৩, কলারোয়ায় ৫, দেবহাটা উপজেলায় ৩ ও কালিগঞ্জে ৮ জনকে হত্যা করেছে। এরমধ্যে ১০ বছরের স্কুলছাত্র রিয়াদকে অপহরণের পর গুলি করে হত্যা করে শিবিরের দুর্বৃত্তরা। আ.লীগ পরিবারে জন্ম হওয়ায় তাকে অকালে প্রাণ দিতে হয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। সূত্রমতে, চলতি বছরের ২৮ ফেব্র“য়ারী যুদ্ধাপরাধ মামলায় দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীকে আদালত মৃত্যুদন্ডর রায় ঘোষনা করে। রায়ের খবরে এদিন বিকেলে কয়েক হাজার জামায়াত শিবির সশস্ত্র অবস্থায় শহরের কদমতলায় জড়ো হয়। তারা সাতক্ষীরা শহরে জঙ্গি মিছিল নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে সার্কিট হাউজ মোড়ে পুলিশ বিজিবি ও র‌্যাব সদস্যরা তাদের বাধা দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জামায়াত শিবির সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তারা আইন রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। জবাবে পুলিশ সহশ্রাধিক রাউন্ড টিয়ারগ্যাস ও শর্ট গানের গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। এতে জামায়াত শিবিরের কয়েকজন ক্যাডার মারা যায়। সেখান থেকে পিছু হটে তারা শহরের কদমতলা এলাকায় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি প্রভাষক এবিএম মামুনের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। তারা মামুনকে পিটিয়ে কুপিয়ে ও পানিতে চুবিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। মামুনের সহকর্মী সদরের পায়রাডাঙ্গা গ্রামের যুবলীগ কর্মী শাহিনুর রহমান শাহিনকেও (৩০) তারা কুপিয়ে হত্যা করে। এরআগে ১৫ ফেব্র“য়ারী দেবহাটার সখিপুর ধোপাডাঙ্গা মোড়ে জামায়াত শিবিরের মিছিল থেকে হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মী আব্দুল আজিজ (৪০) কে হত্যা করে শিবিরের ক্যাডাররা। ১৪ আগস্ট ১৮ দলের মিছিল থেকে হামলা চালিয়ে দেবহাটা উপজেলা শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি আলমগীর হোসেন (৩৮) কে জখম করা হয়। পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। ২৬ আগস্ট রাত ১০ টার দিকে সাতক্ষীরা সদরের শিবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম (৫০) কে শিবিরের ক্যাডাররা হরিশপুর নামক স্থানে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে লাশ ফেলে রেখে যায়। খুনিরা তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ২১ নভেম্বর রাত ৮টার দিকে দেবহাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক আবু রায়হান দলীয় কর্মীদের নিয়ে পারুলিয়া বাজারে মোমেনা বস্ত্রালয়ের সামনে কথা বলছিলেন। এসময় ১০/১২ জন মুখোশধারীরা সশস্ত্র মিছিল নিয়ে এসে তাকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা স্লোগান দিতে দিতে বীর দর্পে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এর মাত্র ১৫ মিনিট আগে দেবহাটা-কালিগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) লস্কর তাজুল ইসলাম ও দেবহাটা থানার ওসি কিরামত আলী ঘটনাস্থলে আবু রায়হানের সাথে গল্প করেন। তারা চলে যাওয়ার পরই এই নৃসংশ খুনের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত ২৬ নভেম্বর জেলার কলারোয়া উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়ন যুব লীগের সাধারন সম্পাদক মাহমুদুল হাসান বাবুকে (৩২) ১৮ দলের নেতাকর্মীরা পিটিয়ে হত্যা করে। ওইদিন জোটের অবরোধ চলছিল। একই দিন বিকালে ১৮ দলের বেপরোয়া নেতাকমীরা কলারোয়ার দেয়াড়া ইউনিয়ন সেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলামকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে। তারা লাশ চুরিরও চেষ্টো করে বলে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। ২৭ নভেম্বর সাতক্ষীরা যশোর সড়কের কলারোয়ার যুগিবাড়ি এলাকায় পথচারি এক গৃহবধুর ওপর গাছের গুড়ি ফেলে হত্যা করা মৃত্যু হয়। নিহত আম্বিয়া খাতুন (২৪) কলারোয়ার গোপিনাথপুর গ্রামের হারুণ অর রশিদের স্ত্রী ছিলেন। ৩ নভেম্বর বিকালে সাতক্ষীরার ভোমরা সড়কের মাহমুদপুর এলাকায় যুবলীগ কর্মী গিয়াস উদ্দীন (৩০) কে পিটিয়ে হত্যা করে অবরোধকারিরা। ৩ ডিসেম্বর রাতে নিজ বাড়িতে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দীন খোকন (৬৫) কে তুলে মাথায় কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে শিবির। ৫ ডিসেম্বর রাত অনুমান সাড়ে ৯টার দিকে সাতক্ষীরা শহর থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দুরে কুচপুকুর গ্রামের বাসিন্দা আগরদাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামের বাড়িতে ৬/৭ জনের দু:স্কৃতিকারি সশস্ত্র অবস্থায় প্রবেশ করে। তারা নজরুলকে না পেয়ে তার বড় ভাই আওয়ামী লীগ কর্মী সিরাজুল ইসলামকে মাথায় গুলি করে হত্যা করে। এ সময় নিহতের ভগ্নিপতি কওছার আলী ও ভাগ্নে শিমুল গুরুত্বর আহত হয়। এরআগে একাধিকবার নজরুলকে হত্যার জন্য হামলা চালায় জামায়াত শিবির। ৭ ডিসেম্বর রাতে সদর উপজেলার বল্লি গ্রামে আ.লীগ কর্মী এজাহার আলীকে তার দোকান ঘরের ভেতর থেকে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় টেনে-হেঁচড়ে বের কুপিয়ে করা হয়। গত ১০ ডিসেম্বর রাতে সদরের মাধবকাটি বাজারে আব্দুল হামিদ (৫৭) কে অপহরণ করে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এরআগে শিবিরের ক্যাডাররা তাকে কয়েকবার হত্যার হুমকি দেয়। ১২ ডিসেম্বর রাতে কাদের মোল্যার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পরমুহুর্তে সাতক্ষীরায় জামায়াত-শিবির সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়। ব্যাপক লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে তারা। এদিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার গোপিনাথপুর গ্রামে আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুর রহমান আজু (৫৩) কে কুপিয়ে হত্যা করে জামায়াত শিবির। সে কলারোয়া পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। একই সময়ে পাশের বাড়ীর আওয়ামীলীগ নেতা রোস্তম আলীর বাড়ীতে ভাংচুর লুটপাট ও আগুন ধরিয়ে দিয়ে চলে যায় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। ওইরাতে শিবির ক্যাডাররা উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান জজ মিয়া (৩৫) কে কুপিয়ে হত্যা করে। ১২ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কুচপুকুর এলাকায় রিয়াদ হোসেন (১০) নামের এক শিশুকে অপহরণের পর গুলি করে ও খুচিয়ে হত্যা করে দূর্বৃত্তরা। ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশ্যে দিনের বেলায় সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেমউদ্দিনকে (৬৫) কুপিয়ে হত্যা করে জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, এসব চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনায় আসামীদের নাম উল্লেখ করে একাধিক মামলা হলেও পুলিশ উল্লেখযোগ্য কোন আসামীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এখন যৌথবাহিনী মাঠে থাকা অবস্থাতেও অনেক এলাকা জামায়াতের দখলের রয়েছে। সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে মানুষের শঙ্কা কাটছে না। তবে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের দাবী বিচ্ছিন্ন কারণে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছেন, প্রতিটি খুনের সাথে জড়িতদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। যৌথবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জোর অভিযান চালাচ্ছে বলেও তিনি দাবী করেছেন।

শেয়ার