যৌতুকের জন্য হত্যা

jowtuk
বাংলাদেশের নারী এখন অনেক দিক দিয়ে এগিয়ে গেছে। শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা থেকে শুরু করে তারা এখন চ্যালেজিং অনেক পেশায় পুরুষের সমপর্যায়ে কাজ করছে। ব্যাংক-কর্পোরেট সেক্টর থেকে শুরু করে সৈনিকের ভূমিকায় মেয়েরা অবতীর্ণ হচ্ছে। বাংলাদেশের দুই তরুণী এভারেস্ট বিজয় করেছে। এখানে প্রথমবারের মতো এক নারী স্পীকার হয়েছেন। দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনটি দুই নারীর হাতে রয়েছে গত ২০ বছর ধরে। তাই নারীকে অবমাননার আর কোন কারণ নেই। দেশের অনেক নারী স্বাবলম্বী হয়েছে, আধুনিক জীবন যাপন করছে। এই সময় যৌতুক নিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতা খুব একটা দেখা যায় না। যৌতুক নেয়াটাকে চরমতম অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। যৌতুক গ্রহীতাকে শাস্তি দেয়ার বিধান রয়েছে। তার পরও অনেক পিতা-মাতা মেয়ের সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য মেয়ের স্বামীকে আর্থিক সহযোগিতা করেন যেন ছেলেটি ব্যবসা-বাণিজ্য করে পরিবারে স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখতে পারে। কোন কোন ক্ষেত্রে মেয়েরা স্বামীর পরিবারে গিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করে আবার কোথাও দেখা যায় লোভী কোন পুরুষ তার স্ত্রীকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন কিংবা হত্যা করে। তাই যৌতুক প্রথার মাধ্যমে বিয়ে করাটাকে অভিশাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রাচীন যুগ থেকে যৌতুক প্রথা চলে আসছে। কেননা এক সময় মেয়েসন্তানকে বলা হতো সমাজের বোঝা। আধুনিক যুগে এসে এই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যৌতুক প্রথার বিলুপ্তি ঘটলেও মাঝে মাঝে খবরের কাগজে পাওয়া যায় যৌতুকের জন্য গৃহবধূকে হত্যার খবর। কদিন আগে রাজধানীর মিরপুর থানার পূর্বমনিপুর পাড়ার শারমিন (২৯) ও দারুস সালাম থানার হরিপুর এলাকায় সুরভী আক্তারকে (১৯) যৌতুকের জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে। ঢাকার মতো শহরের যেখানে অধিকাংশ মানুষ আধুনিক ও উদার মানসিকতা লালন করে সেখানে যৌতুকের জন্য হত্যার ঘটনাটি সমাজে প্রতিহিংসাপরায়ণতার প্রকাশ ঘটায়। এভাবে প্রতিনিয়ত দেশের কোথাও না কোথাও ঘটে চলেছে যৌতুকের জন্য নারীর প্রতি সহিংসতা। বাংলাদেশের পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী ২০০৫ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত যৌতুকের জন্য নারী সহিংসতার একটি চিত্রে চোখ বুলালে এর মাত্রা অনুধাবন করা যায়। এই তথ্যে দেখা গেছে, যৌতুকের জন্য ২০০৫ সালে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ১৩০ টি, ২০০৬ সালে ৩ হাজার ৪১৭ টি, ২০০৭ সালে ৪ হাজার ১৪৬ টি, ২০০৮ সালে ৪ হাজার ৪৯৭ টি, ২০০৯ সালে ৪ হাজার ৬২টি, ২০১০ সালে ৫ হাজার ৩৩২ টি, ২০১১ সালে ৭ হাজার ৭৯ টি এবং ২০১২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৪৮ টিতে। তবে পুলিশের কাছে যে সব সহিংসতার খবর নথিভুক্ত হয়েছে এখানে শুধু তার খবর প্রকাশিত হয়েছে। অনেক সহিংসতার খবর ঢাকা পড়ে অন্তরালে। যে সব কারণে নারীর ওপর সহিংসতা হয় তার মধ্যে যৌতুক প্রথাই সবেচেয়ে এগিয়ে আছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, যে সব পুরুষ নারীদের তাদের সেবাদানকারী ও রান্নাবান্নার কাজের জন্যই বিয়ে করে থাকে তারাই যৌতুকের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে বেকার পুরুষ স্ত্রীর কাছ থেকে অর্থ নিয়ে নিজে কিছু একটা করার চেষ্টা করার প্রবণতা থেকে যৌতুকের প্রতি আগ্রহী হয়। মাত্র ২০ হাজার টাকা যৌতুকের লোভে স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা করে স্বামী এই ধরনের অনেক খবর আমরা জেনেছি। এভাবে যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। আর এই ব্যাধি দূর করতে সামাজিক সংগঠনগুলো জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। যৌতুকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে একটি দেশ থেকে যৌতুক প্রথা নির্মূল করা যেতে পারে। যৌতুক প্রতিরোধে পুরুষরা যদি নিজেরা নিজেদের জায়গা থেকে সচেতন হয় তা হলেই যৌতুক প্রথা ও নারী নির্যাতন কমে যাবে। একটু মুক্ত মনে চিন্তা করলেই দেখা যায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজে রয়েছে এমন সব অনিয়মের সমষ্টি যা নারীকে অবদমিত করে। নারী-পুরুষ মেলবন্ধনের ক্ষেত্রে এসব অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব। নারী শুধু সমাজের অংশ তা-ই নয়, তারা পরিবারকে পরিচালনা করে নিজের মায়া, মমতা, শ্রম, সাধনা আর একাগ্রতা দিয়ে। তাই আর যৌতুকের জন্য যেন কোন মৃত্যু না ঘটে সেদিকে সবার সদয় দৃষ্টি দিতে হবে। সমাজের একটি অংশ অকেজো হলে সমাজে বিপর্যয় দেখা দেবে। তাই নারীর মর্যাদা বৃদ্ধিতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

শেয়ার