যশোরে বৃত্তি বাণিজ্য! ফরম বিক্রি ৩ লাখ: ব্যয় ২ লাখ

jessore zila school
ইন্দ্রজিৎ রায় ॥
যশোর স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে বৃত্তির ফরম বাণিজ্যের ও কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। এবছর সংগঠনটি সাড়ে ৭’শ টাকা থেকে সাড়ে ৯’শ টাকার এককালীন বৃত্তির জন্য ১ হাজর ৮’শ ৩৬ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাথাপিছু ফরম বাবদ দেশড়’শ থেকে ২’শ টাকা ফি আদায় করেছে। এতে তাদের ফি বাবদ আয় হয়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। গত বছর এ সংগঠনটি ৪টি ক্যাটাগরিতে ২’শ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান করেছিল। এবারও সমপরিমাণ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেয়া হবে। সেই হিসেবে ২’শ শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে বৃত্তি বাবদ ৯৭০ টাকা হারে প্রদান করা হলে ব্যয় হবে ১ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। এতে ১ লাখ টাকার বেশি সংগঠনটি বৃত্তি বাণিজ্য হবে। এছাড়াও কারসাজি করে পছন্দের কোচিং সেন্টারের মনোনীত শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা হয়। বিষয়টি নজরে এসেছে যশোরের সচেতন অভিভাবক মহলের। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংগঠনের সহকারী সদস্য সচিব মারুফ হাসান।
শুক্রবার সকালে যশোরের ৩টি স্কুলে যশোর স্টুডেন্টস ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশনের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে ৮ম শ্রেণীর মোট ৭টি শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। ৩টি কেন্দ্রের মধ্যে মিউনিসিপ্যাল প্রিপারেটরি উচ্চ বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর ৮৫৯ জন, মুসলিম একাডেমিতে ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণীর ৬৩০ জন এবং বাদশা ফয়সাল ইসলামী ইন্সটিটিউট কেন্দ্রে ৬ষ্ঠ,৭ম ও ৮ম শ্রেণীর ৩৪৭ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। দেড়’শ নম্বরের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তদের ৪টি ক্যাটাগরিতে বৃত্তি প্রদান করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের দাবি গত বছর ২০১ জন শিক্ষার্থীকে এককালীন হারে বৃত্তিপ্রদান করা হয়েছিল এবারও সমপরিমাণ প্রদান করা হবে। তবে খাতা মূল্যায়নের পর নির্ধারণ করা হবে সঠিক সংখ্যা। নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা ট্যালেন্টপুলে ৯৭০ টাকা, সাধারণ গ্রেডে ৯২০ টাকা, প্রতিষ্ঠান কোটায় ৭৬০ টাকা ও মেধাবী কোটায় ৭৬০ টাকা এককালীন বৃত্তিপ্রদান করা হবে। এ পরীক্ষার ফলাফল এপ্রিল মাসে প্রকাশ করা হবে।
খোঁজনিয়ে জানাগেছে বৃত্তিপরীক্ষা বাবদ শ্রেণীভিত্তিক ফি আদায় করেছে সংগঠনটি। পরীক্ষার ফি বাবদ দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাথাপিছু ১৫০ টাকা করে নেয়া হয়েছে। সেই হিসেবে এই স্তরের ১ হাজার ১৪৯ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার ৩৫০ টাকা। ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ৫২৩ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাথাপিছু ১৮০ টাকা হারে ৯৪ হাজার ১৪০ টাকা এবং ৭ম ও ৮ম শ্রেণীর ১৬৪ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ফি বাবদ ২০০ টাকা হারে ৩২ হাজার ৮০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। সর্বসাকূল্যে ভর্তি ফি বাবদ প্রায় ২ লাখ ৯৯ হাজার ২৯০ টাকা আদায় করা হয়েছে। আর শিক্ষার্থীদের বৃত্তিবাবদ ২’শ শিক্ষার্থীকে সর্বোচ্চ ট্যালেন্টপুল বৃত্তি ৯৭০ টাকা করে প্রদান করলে ব্যয় হবে ১ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। কৃর্তপক্ষের ভাষ্যমতে ৪টি ক্যাটাগরিতে বৃত্তি দেয়া হয়। সেক্ষেত্রে ব্যয়ের পরিমাণ কমবে। সর্বসাকূল্যে ১ লাখ ৫ হাজার টাকার অধিক বাণিজ্য হবে তাদের। ২০০৪ সালের পর থেকে ওই প্রতিষ্ঠানটি এভাবেই বৃত্তি বাণিজ্য চালিয়ে আসছে। তাদের প্রতারণার বিষয়টি এবার নজরে এসেছে সচেতন শিক্ষক ও অভিভাবকদের।
কয়েকজন অভিভাবক ও শিক্ষক নামপ্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন কোচিং সেন্টারগুলোকে লাভজনক করতে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শহরের কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে প্রতিবছর মাঠে নামে ওই প্রতিষ্ঠানটি। সরকারি বৃত্তির ব্যবস্থা থাকতে আবার কেন বৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তারা প্রশ্ন তোলেন সরকারিভাবে যেখানে ৫ম ও ৮ম শ্রেণীতে বৃত্তি দেয়া হয়। সেখানে এ প্রতিষ্ঠানটি ২য় শ্রেণী থেকে শুরু করেছে বৃত্তির নামে বাণিজ্য করছে। কোচিং সেন্টার মনোনীত শিক্ষার্থীদের লোক দেখানো বৃত্তি প্রদান করা হয়।
মিউনিসিপ্যাল প্রিপারেটরি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আমিরুল ইসলাম জানান, তার স্কুলের শিক্ষক ও বাইরের শিক্ষকরা পরীক্ষা গ্রহণ করছেন মাত্র। স্কুলের সভাপতির অনুমতি নিয়ে আসায় ওই সংগঠনটির পরীক্ষা গ্রহনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। পরীক্ষর ডিউটির জন্য শিক্ষকদের একটি করে খাম ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। এর বেশি তাদের জানা নেই বলে তিনি দাবি করেন।
এই কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক কামরুল হুদা জানান, কারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাধ্যমে তার মেয়ে সুরাইয়া হুদা বৃত্তির আবেদন ফরম সংগ্রহ করেছে। তিনি বলেন, মেয়ের পরীক্ষার ভয় কাটিয়ে ওঠার জন্য এই পরীক্ষা দিতে নিয়ে এসেছি।
এ বিষয়ে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে যশোর স্টুডেন্টস ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশনের সহকারী সদস্য সচিব মারুফ হাসান অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, স্বচ্ছতার সাথে বৃত্তি প্রদান করা হয়। এতে কোন কারসাজির সুযোগ নেই। আমরা এবারই প্রথম বৃত্তি প্রদান করছি না। কয়েক বছর ধরে বৃত্তি প্রদান করে আসছি। এরআগে এমন কোন অভিযোগ আসেনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সুব্রত কুমার বণিক বলেন,সরকারিভাবে ৫ম ও ৮ম শ্রেণীতে বৃত্তি দেয়া হয়। এর বাইরে বৃত্তি পরীক্ষার আয়োজনের যৌক্তিকতা নেই। কোচিং ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত ও ফরম বাণিজ্য করার জন্যই এটা করা হয়ে বলে মনে করেন তিনি।।

শেয়ার