পাকি ধৃষ্টতা

যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পর পাকিস্তান যেভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়েছে, তাকে ধৃষ্টতা ছাড়া কিছুই বলা যায় না। তারা যে এখনও আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের কারণে এতটুকু অনুতপ্ত নয়; ঘটনাটি তারই প্রমাণ। কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পর পাকিস্তানের পার্লামেন্টে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর জনৈক সদস্য এই শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করেন। বাংলাদেশ সরকার অবশ্য ইতোমধ্যে পাকিস্তানের কাছে এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত সে দেশের হাইকমিশনারকে তলব করে পাকিস্তানী কর্মকা-ের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান এবং একাত্তরের গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে। ইতোপূর্বে পাকিস্তানের কয়েক মানবাধিকারকর্মী মুক্তিযুদ্ধকালে হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের তীব্র নিন্দা করেছিলেন। সে সময় আমাদের ধারণা হয়েছিল, পাকিস্তান সরকারও হয়ত তাদের ভুল বুঝতে পারবে ও অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইবে। কিন্তু আমাদের সব প্রত্যাশাই হতাশায় রূপ নিয়েছে। পাকিস্তান সরকার ও সে দেশের পার্লামেন্ট এমন ধৃষ্টতার সাহস পায় কোথা থেকে। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পর পাকিস্তান পার্লামেন্টে যেভাবে শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, তাতে প্রমাণিত হয়েছে পাকিস্তান এখনও একাত্তরে সংঘটিত তাদের গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকা-কে অপরাধ বলে মনে করে না। সুতরাং বাংলাদেশ সরকারকে শুধু প্রতিবাদ জানালেই হবে না, সেই সঙ্গে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা একাত্তর সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালে ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল। সে সময় তিরিশ লাখ বাঙালী তাদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিল। এছাড়া এই নরপশুদের দ্বারা প্রায় ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম বিনষ্ট হয়েছিল। সুতরাং পাক হানাদার ও তাদের দোসরদের কোন ক্ষমা নেই।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহীদ হওয়ার পর সামরিক শাসকদের শাসনামলে জামায়াত ধীরে ধীরে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হয়েছে। দেশী-বিদেশী কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহায়তায় জামায়াত-শিবির চক্র এখন দেশ ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে নিমগ্ন। তারা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে চিরতরে ধ্বংস করতে চায়। কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পর যেভাবে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেছে, তাতে এটা সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশের জামায়াতের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সংযোগ রয়েছে। বস্তুত এদের সহযোগিতায় জামায়াত-শিবির চক্র তাদের ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি তালেবানি রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয়, দেশের সবচেয়ে বড় বিরোধী দল বিএনপি এখন জামায়াতের কর্মসূচী বাস্তবায়নের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। এসব কারণেই একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তান আজ এ ধৃষ্টতা প্রদর্শন করতে সাহস পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত মহাজোট সরকারকে অবশ্যই সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এগিয়ে যেতে হবে।
সরকারের উচিত, পাকিস্তানী বাহিনীর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ বিষয়ে সারা পৃথিবীতে সঠিক তথ্য তুলে ধরা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র, তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে বাইরের যত চাপই থাকুক না কেন, অন্যসব যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় র্কার্যকর করা জরুরী। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা ফাঁসি কার্যকরের পর পাকিস্তান যেভাবে ধৃষ্টতা দেখিয়েছে, আমরা তার তীব্র নিন্দা করি।

শেয়ার