খালেদ খান স্মরণে সংস্কৃতি অঙ্গনের তারকারা

khaledkhan
সমাজের কথা ডেস্ক॥
স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের অন্যতম কর্মী ছিলেন খালেদ খান। ‘অচলায়তন’ ভেঙে বদলে ফেলেছিলেন নাটক নির্দেশনার প্রচলিত ধারা। অভিনয়ের পাশাপাশি এমন শুদ্ধ ও পরিশীলিত উচ্চারণ খুব কম অভিনেতার মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়েছে। শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সকাল সাড়ে ১০টায় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে প্রয়াত অভিনেতা খালেদ খানকে এভাবেই স্মরণ করেন তার সহকর্মী ও সহযোদ্ধারা।

যুবরাজের কফিনে ফুল দিয়ে লেখক সৈয়দ শামসুল হক গ্লিটজকে বলেন, “আমার লেখা ‘ঈর্ষা’ নাটকে খালেদ খানের অনবদ্য অভিনয় এখনও মনে পড়ে। তার মতো এমন অসাধারণ অভিনেতা আর আসবেন না। বাংলা নাটককে এক অন্য মাত্রা দিয়ে গেছেন তিনি।”

চলতি বছর শিল্পকলা পদক(নাট্যকলা)পেয়েছেন অভিনেতা খালেদ খান। জীবদ্দশায় তার হাতে এই পদক তুলে দিতে পারেননি বলে আক্ষেপ করলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকি।

লাকি গ্লিটজকে জানান, খালেদ খানের অভিনীত ও নির্দেশিত নাটকগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে খুব শীঘ্রই তার নামে একটি নাট্যোৎসবের আয়োজন করবে শিল্পকলা একাডেমি।

বিটিভির মহাপরিচালক ম. হামিদ বলেন, “অভিনয়ের প্রতি এত মনোযোগ খুব কম অভিনেতার মধ্যেই দেখেছি।”

নিভৃতচারী অভিনেতা খালেদ খানের অভিনয়ে গুণমুগ্ধ দর্শক অভিনেতা রামেন্দু মজুমদার। ‘রক্তকরবী’ নাটকের এক মঞ্চায়নের ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, “মঞ্চে ওঠার আগে তার পা কেটে গিয়েছিল। কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতে দেননি তিনি। সেদিন এত সাবলীল অভিনয় করেছিলেন, এখনও তা ভুলতে পারিনি। অভিনয় ও নির্দেশনাতে তার দক্ষতা অবিস্মরণীয়।”

তরুণ খালেদ খানের অভিনয়ে বিস্মিত হয়েছিলেন অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। খালেদ খানের স্মৃতিচারণে ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, “তার অভিনয়জীবন অল্পদিনের। কিন্তু এই অল্পদিনেই তার অভিনয় দর্শকের মন জয় করে নিয়েছিল। মঞ্চ ও টিভি নাটকে তার অভিনয় সৃষ্টি করেছে অনন্য ইতিহাস।”

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, “নাট্যাঙ্গনে অভিনয় ও নির্দেশনাতে এক নতুনধারা প্রবর্তন করেছিলেন তিনি। তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন এক ঈর্ষণীয় উচ্চতায়।”

লেখক ও সাংবাদিক কামাল লোহানী বলেন, “অভিনেতা খালেদ খানের মতো শুদ্ধ ও পরিশীলিত উচ্চারণ ও প্রায়োগিক ভঙ্গি খুব কম অভিনেতার মধ্যে দেখেছি। ভালো অভিনেতা হয়তো আরও আসবেন, কিন্তু খালেদ খানের মতো কেউ আর আসবেন না।”

নব্বইয়ের দশকে বেতার ও টিভি শিল্পীদের নিয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন খালেদ খান। তার প্রতিবাদী রূপটি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব গোলাম কুদ্দুস।

গোলাম কুদ্দুস বলেন, “সেদিনের আন্দোলনে খালেদ খান সামরিক জান্তাকে ভয় না পেয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সংস্কৃতিকর্মীদের তিনি ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের সামাজিক আন্দোলনের নানা চিত্র ফুটে উঠেছে তার অভিনয় ও নির্দেশনাতেও।”

আলী যাকেরের নির্দেশনায় ‘অচলায়তন’ নাটকের মুখ্য চরিত্র ‘পঞ্চক’-এর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন খালেদ খান। এ নাটক নির্মাণের ঘটনা শেয়ার করেন আলী যাকের।

আলী যাকের বলেন, “রবীন্দ্রনাথের নাটক অবলম্বনে ‘অচলায়তন’ নির্দেশনার আগে পঞ্চক চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল মাহমুদ হোসেন দুলুর। কিন্তু শুরুর আগে দুলু জানাল, সে অভিনয় করবে না। হতবিহ্বল আমার পাশে এসে দাঁড়ায় খালেদ। তাকে নিয়েই শুরু করলাম মহড়া। ‘পঞ্চক’ চরিত্রে তার অভিনয় দেখে মনে হয়েছিল এ চরিত্র্র শুধু তার জন্যই।”

শুধু অভিনেতা হিসেবে নয়, গায়ক হিসেবেও তিনি ছিলেন অনন্য। তার কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত শুনে মুগ্ধ হতেন নাট্যাঙ্গনের শিল্পীরা। মুগ্ধ শ্রোতাদের দলে ছিলেন অভিনেতা হাসান ইমাম।

হাসান ইমাম বলেন, “তার সংগীত প্রতিভার কথা খুব কম লোকে জানে। সংগীতে তার দারুণ দখল ছিল। আর তার অভিনয়ের ধারা বিশ্লেষণ করা খুব সহজ নয়।”

টিভির ‘রূপনগর’ ধারাবাহিকে তার সহ-অভিনেতা রফিকুল্লাহ সেলিম জানান, নাটকের সংলাপ ও উচ্চারণে তিনি খুব সচেতন ছিলেন। খুব সহজেই চরিত্রের সঙ্গে মিশে যেতেন। সহকর্মী হিসেবে তিনি ছিলেন অনন্য।

শুক্রবার রাতে বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অভিনেতা ও নির্দেশক খালেদ খান। এর আগে সোমবার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।

শেয়ার