বিএনপি জামায়াতের হরতাল অবরোধে স্থবিরতা॥ বেনাপোল বন্দরে আমদানিকৃত পণ্যের পাহাড়

Jessore Benapol
মিলন রহমান, বেনাপোল থেকে ফিরে॥
সময়মত থালাস করতে না পারায় বেনাপোল বন্দরে এখন আমদানিকৃত পণ্যের পাহাড় গড়ে উঠেছে। বিএনপি জামায়াত জোটের টানা হরতাল অবরোধে সৃষ্টি হয়েছে এই পরিস্থিতি। সপ্তাহের একদিন পণ্য সরবরাহের সুযোগ সৃষ্টি হলেও ট্রাক সংকট ও আকাশ ছোঁয়া ভাড়ার কারণে ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। ফলে ইচ্ছা থাকলেও তারা বন্দর থেকে আমদানি পণ্য খালাস নিতে পারছেন না। এ অবস্থায় বন্দর দিয়ে আমদানি রফতানিও অর্ধেকের কমে নেমে এসেছে। হরতাল অবরোধের টানা কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা নিয়ে ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই চিন্তিত।
বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বেনাপোল বন্দরের ৪৩টি পণ্য গুদামে ধারণ ক্ষমতা রয়েছে ৩৮ হাজার থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন। স্বাভাবিক সময়ে এসব গুদামে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত মিলিয়ে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার মেট্রিকটন পণ্য মজুদ থাকে। কিন্তু টানা হরতাল অবরোধের কারণে পণ্য সরবরাহ না থাকায় এ মজুদ এখন প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টনে গিয়ে ঠেকেছে। ফলে পণ্য গুদাম উপচে ইয়ার্ড ছাড়িয়ে তা এখন খোলা আকাশের নিচে এসে পৌছেছে। এরপর স্থান সংকুলান না হওয়ায় আমদানি পণ্যবাহী প্রায় ৭ থেকে ৮শ’ ট্রাক পণ্য খালাস করতে পারছে না। ফলে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৪শ’ থেকে সাড়ে ৪শ’ ট্রাক পণ্য আমদানি হলেও এখন তা অর্ধেকের কমে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রতিদিন ভারত থেকে দেড়শ’ থেকে ২শ’ ট্রাক পণ্য আমদানি হচ্ছে। হরতাল অবরোধের এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে এ অবস্থা আরও নাজুক হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক মহসিন মিলন জানান, হরতাল অবরোধে বেনাপোল থেকে পণ্য সরবরাহ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। ৭ থেকে ৮ শ’ ভারতীয় ট্রাক পণ্য নিয়ে বন্দরে আটকে আছে। স্থানাভাবে তারা পণ্য খালাস করতে পারছে না। আবার দিনের পর দিন বন্দরে আটকে থাকতে বাধ্য হওয়ায় তাদের মাত্রাতিরিক্ত ডেমারেজ দিতে হচ্ছে। আবার হরতাল অবরোধের কারণে আমদানি সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পৌঁছাতে না পারায়ও অনেকে পণ্য খালাস করতে পারছেন না।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে আমদানিকৃত পণ্যবাহী প্রায় ৪শ’ থেকে সাড়ে ৪শ’ ট্রাক বেনাপোল ছেড়ে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে যেতো। কিন্তু টানা হরতাল অবরোধের কারণে এখন পণ্যবাহী কোনো ট্রাকই বেনাপোল থেকে যাচ্ছে না। গত এক সপ্তাহে বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের তত্ত্বাবধানে দু’ দফায় মাত্র শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক বেনাপোল ছেড়ে গেছে।
টানা ৬দিন হরতাল অবরোধের পর শুক্রবার একদিনের জন্য অবরোধ প্রত্যাহার হওয়ায় এ সুযোগে ব্যবসায়ীরা বেনাপোল থেকে পণ্য নিয়ে গন্তব্যে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিরূপ পরিস্থিতির কারণে সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। কারণ শুক্রবার বেনাপোলে কয়েকশ’ ট্রাকের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বেনাপোলে শতাধিক ট্রাকও নেই। আর যে ট্রাক রয়েছে তার ভাড়াও হাকা হচ্ছে ৪ থেকে ৫ গুণ। এক ট্রাক পণ্য ঢাকা পর্যন্ত নিতে যেখানে স্বাভাবিক সময়ে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিতে হয়। সেখানে এখন প্রতি ট্রাকের জন্য ভাড়া হাকা হচ্ছে লাখ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু তারপরও ট্রাক মিলছে না। কারণ অবরোধের জন্য গত ৬দিনে বন্দরে ট্রাকও আসতে পারেনি।
বেনাপোল বন্দরে পচনশীল পণ্য মাছ নিতে আসা ট্রাক চালক শরিফ জানান, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা পণ্য পরিবহণ করছেন। হরতাল অবরোধ ছাড়াও ট্রাক বাসে আগুন দেয়া হচ্ছে। আবার ঢাকায় যাওয়ার পথে বা ঢাকায় গিয়ে এক সপ্তাহ আটকে থাকতে হচ্ছে। এ কারণে তারা অতিরিক্ত ভাড়া নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বেনাপোল বন্দর ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় ২০টার মত ট্রাকে পণ্য বোঝাই করা হচ্ছে। ট্রাকে পণ্য বোঝাইকালে ট্রাক চালক আশরাফুজ্জামান জানান, তিনি এক ট্রাক পিয়াজ নিয়ে চট্টগ্রামে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ৬দিন আগে তিনি বেনাপোল বন্দরে এসে আটকে পড়েছিলেন। একদিনের সুযোগে পণ্য নিয়ে তিনি চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ থেকে পণ্য নিয়ে আসা ট্রাক চালাক যতীন জানান, প্রায় ১৫ দিন ধরে তিনি পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু খালাস করতে না পারায় বেনাপোল বন্দরে আটকে রয়েছেন। এখন ট্রাকেই সংসার পেতে বসেছেন। সেখানেই চলছে রান্না খাওয়া।
বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আজিমুদ্দিন গাজী জানান, পণ্য বহনের জন্য শুক্রবার বেনাপোলে সর্বসাকুল্যে ১শ’র মত ট্রাক রয়েছে। অথচ চাহিদা রয়েছে ৫শতাধিক ট্রাকের। আবার যে ট্রাক রয়েছে তার ভাড়াও অনেক বেশি।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন জানান, টানা অবরোধের কবলে পড়ায় ব্যবসায়ীরা বন্দর থেকে পণ্য খালাস নিতে পারছেন না। ৬দিন পর একদিন অবরোধ উঠলেও ট্রাক সঙ্কটের কারণে বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে তারা গন্তব্যের দিকে যেতে পারছেন না। তবে ব্যবসায়ীদের সব ধরনের সহযোগিতা করতে স্থলবন্দর এখন সপ্তাহে ৭ দিন খোলা রাখা হয়ে হয়েছে বলেও তিনি জানান।

শেয়ার