বাঁধভাঙ্গা জনজোয়ার

এবারের বিজয় দিবস উদযাপনকালে সারাদেশে যেভাবে বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে, তেমনটি ইতোপূর্বে আর লক্ষ্য করা যায়নি। মিরপুরের কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিজয় দিবসের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অন্য সব যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায়ও যথাসময়ে কার্যকর হবে। সমগ্র বাঙালী জাতি এখন দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ বিজয়ের আশায় উজ্জীবিত। তাদের এই উজ্জীবনের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে এবারের বিজয় দিবস উদযাপনকালে। কিশোর বৃদ্ধ নারী তরুণ সবার মধ্যে এবার যে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ ও উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে, তা বাস্তবিকই অবিস্মরণীয়। এই বাঁধভাঙ্গা আনন্দ ও উচ্ছ্বাসকে ধরে রাখতে হবে আগামীর চূড়ান্ত লড়াইয়ে বিজয়ের জন্য। সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকরের দাবিতে এবার একাত্তরের মতো জেগে উঠেছিল গোটা বাঙালী জাতি। জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণের পাশাপাশি সারাদেশে বিভিন্ন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়া লক্ষ কোটি আবালবৃদ্ধবনিতার চোখেমুখে যেমন ছিল বিজয়ের আনন্দ; ঠিক তেমনই ছিল একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে ঘৃণা ও ধিক্কারের বহির্প্রকাশ। এবার সবার মনেই যেন ফিরে এসেছিল মুক্তিযুদ্ধকালের সেই অবিস্মরণীয় সেøাগান ‘তুমি কে আমি কে- বাঙালী’ কিংবা ‘তোমার আমার ঠিকানা- পদ্মা মেঘনা যমুনা।’ ১৯৭১ সালে এ দেশে মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় সাত কোটি। স্বাধীনতার ৪২ বছর পর তা বেড়ে হয়েছে ষোলো কোটি। ধর্মবর্ণ গোত্র নির্বিশেষে আমরা সবাই বাঙালী। এই সেক্যুলার বাঙালিত্ব ও বাঙালী সংস্কৃতি আমাদের বিপুল প্রাণশক্তির প্রধান প্রেরণা। প্রতিকূল শক্তির শত বাধা সত্ত্বেও তাই আমরা এগিয়ে চলেছি।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার ও তাদের সহযোগীরা বাঙালী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু সেদিনের সেই রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীরা এখনও আমাদের সমাজের নানা স্তরে আত্মগোপন করে আছে। অনেকেই প্রকাশ্যে জোট বেঁধে সন্ত্রাসী তৎপরতায় লিপ্ত। বস্তুত জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা এখন যেন বাংলাদেশের অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ করেছে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পর এরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দেশব্যাপী তারা হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও তা-ব শুরু করেছে। বাঙালী জাতির দুশমন এই জামায়াতী বর্বরদের অবশ্যই নির্মূল করতে হবে। এবারের বিজয় দিবস উদযাপনকালে নতুন লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার অঙ্গীকার করেছে বাঙালী জাতি। ‘লাল সবুজের বিশ্বজয়’ শিরোনামে রাজধানীর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে এবার সবচেয়ে বড় ‘মানবপতাকার’ বিশ্বরেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিন লাখেরও বেশি বাঙালী এক সময়ে এক সঙ্গে গাইলেন জাতীয় সঙ্গীত। এ ক্ষেত্রেও বিশ্বরেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ।
এখন সময় এসেছে আমাদের আবেগ ও শক্তিকে সুসংহত করার। এ দেশে যাতে কোন স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ভবিষ্যতে মাথা উঁচু না করতে পারে সে বিষয়ে আমাদের সর্বক্ষণিকভাবে সতর্ক থাকতে হবে। সেই সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে কার্যকর করার লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি মানুষকে অতন্ত্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ জনগণের সদা সতর্কতাই স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। ‘গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে’ প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব আমাদের নতুন প্রজন্মের মুক্তিসেনাদের। একই সঙ্গে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে সর্বক্ষণিকভাবে চেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরী।

শেয়ার