বিজয়ের ৪২ বছর ॥ বিজয় নিশান উড়ছে ওই

sriti showdho
নিজস্ব প্রতিবেদক॥ “সে এক বিষম জানকবুল জনযুদ্ধ/ওরা প্রাণপণ যুদ্ধ করেছিল/ওরা কিন্তু বিজয় দেখে যেতে পারেনি!/…আমরা তাই তাদের স্মরণ করি/এই বিজয় দিবসে/এই স্মরণ দিবসে/যারা বিজয় দেখে যায়নি/ যাদের জীবনে বিজয় বলে কিছু আসেনি/ যারা এ বাংলার জন্য যুদ্ধ করেছিল/ জয়বাংলা বলে/তাদেরকে এসো আমরা স্মরণ করি/এই বিজয় দিবসে/এই স্মরণ দিবসে।”
সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে লেখা ‘এই স্মরণ-দিবসে’ কবিতায় এভাবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কৃতজ্ঞ বাঙালী জাতিকে এভাবেই আবাহন করেছেন।
পূর্বাচলে আজ উদিত যে-সূর্য, প্রতিদিনের হয়েও সে প্রতিদিনের নয়; তার রক্তিমতায় তিরিশ লাখ শহীদের রক্ত আমাদের মনে পড়বে, আকাশ যে-কোমলতায় আজ উদ্ভাসিত, একাত্তরের সম্ভ্রমহারা দশ লাখ মা-বোন-জায়ার ক্রন্দনধোয়া সে-উদ্ভাস। ভোরের যে-রাঙা আলোটি আজ স্পর্শ করেছে ভূমি, স্বদেশের সেই পবিত্র ভূমি ভিজে আছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর রক্তে, আর সেই রক্তস্রোতে মিশে আছে জাতীয় চার নেতার উষ্ণ শোণিত। দেনদরবার নয়, কারও দয়ার দানে নয়, সাগর-সমান রক্তের দামে বাংলাদেশ অর্জন করেছে স্বাধীনতা, রক্ত-সাগর পেরিয়ে বাঙালী জাতি পৌঁছেছে তার বিজয়ের সোনালি তোরণে। বিজয়ের বিয়াল্লিশ বছরপূর্তিতে তোমাকে অভিবাদন, বাংলাদেশ।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর কুয়াশায় জড়ানো হাল্কা শীতের বিকেলে রমনার রেসকোর্স ময়দানে দাম্ভিক পাকিস্তানী সেনারা যে অস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে বাঙালীর বুকে, হাতের সেই অস্ত্র পায়ের কাছে নামিয়ে রেখে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর নেতাদের সামনে। আজ বাঙালীর বিজয় দিবস। রক্তনদী পেরিয়ে আসা আনন্দ-বেদনায় মিশ্র মহান বিজয় দিবস আজ। বিজয়ের গৌরবের- বাঁধভাঙ্গা আনন্দের দিন। একই সঙ্গে লাখো স্বজন হারানোর শোকে ব্যথাতুর-বিহ্বল হওয়ারও দিন।
তীব্র শোষণের কুহেলী জাল ভেদ করে একাত্তরের এই দিনটিতে প্রভাতী সূর্যের আলোয় ঝিকমিকিয়ে উঠেছিল বাংলার শিশির ভেজা মাটি, অবসান হয়েছিল পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর সাড়ে তেইশ বছরের নির্বিচার শোষণ, বঞ্চনা আর নির্যাতনের কালো অধ্যায়। নয় মাসের জঠর-যন্ত্রণা শেষে এ দিন জন্ম নেয় একটি নতুন দেশÑ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ঝড়ের ভেতরে বিকশিত অটল বৃক্ষের জীবন্ত প্রতীক স্বাধীনতা নামের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আজও প্রচন্ড ঝাঁকি দেয় রক্তে, শাণিত করে চেতনা।
তবে এবার অন্যরকম গণজাগরণ ও আবহে বিজয় দিবস পালন করছে গোটা জাতি। বিজয়ের আনন্দের এই দিনে শহীদ পরিবারের সদস্যদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম যুদ্ধের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে দাবি তুলেছিল, আজ তা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। শীর্ষ নরঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বেশ কয়েকজনের ফাঁসির রায় হয়েছে। আল বদরের হোতা কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এখন জাতির প্রত্যাশা একাত্তরের বাকী হন্তারকদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেশকে অভিশাপমুক্ত করা হবে। কলুষমুক্ত হবে বাঙালী জাতি।
বাঙালী আঘাত খেয়েছে বার বার, আহত পাখির মতো আর্তনাদ করেনি, ভেঙ্গে পড়েনি ব্যর্থতার ক্রন্দনে। সমস্ত আঘাত সে বুক পেতে নিয়েছে, সর্বাঙ্গ রুধির মেখে অবিচারের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। সেই ১৮৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, সেটির উদয় ঘটে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরে। বহু শতাব্দীর স্বপ্ন-স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মাধ্যমে। অবর্ণনীয় দুর্যোগে লন্ডভন্ড হওয়া বাংলাদেশের বঞ্চিত ও শোষিত মানুষ রুখে দাঁড়ায় সর্বশক্তি দিয়ে। আত্মবিস্মৃত বাঙালী আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে উৎসর্গ করে নিজ ও স্বজনকে। ছিনিয়ে আনে বিজয়, লাল-সবুজ পতাকা সংবলিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

শেয়ার