পূর্ণদৈর্ঘ্য ‘গোঁজামিল’ প্রেমকাহিনি

gojamil
সমাজের কথা ডেস্ক॥
শাকিব-জয়ার প্রথম যুগলবন্দি, সঙ্গে আরেফিন শুভ। সব মিলিয়ে ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেমকাহিনি’র আকর্ষণ কম ছিল না। সুতরাং পূর্ণদৈর্ঘ্য এই চলচ্চিত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করার একটা দায় থেকে যায়।

সিনেমার কাহিনির প্রারম্ভে গল্পবলার ঢংটি বেশ ভালো ছিল, বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে বিষয়টিকে খানিকটা নতুনও বলা যেতে পারে। সোহেল রানা ও ববিতা গল্পচ্ছলে ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেমকাহিনি’ সিনেমার গল্প বলতে আরম্ভ করেন। এমনকি সোহেল রানা বলেও বসেন, বয়স থাকলে এই গল্পের নায়ক তিনিই হতেন (সিনেমাতেও তিনি বয়স-হয়ে-যাওয়া তারকা)। তবে এই অংশের অভিনয়ে ববিতা আরেকটু গম্ভীর হতে পারতেন। টাইটেল অ্যানিমেশনটি আরেকটু প্রেমকাহিনিসুলভ হতে পারত।

সিনেমায় নায়ক-নায়িকার আবির্ভাব বোধহয় নাটকীয় হতে হয়। এই সিনেমাতে শাকিব খানের আবির্ভাব নাটকীয়; পর্দাজুড়ে থাকা ডাব, কাটলে দেখা যায়, পেছনে শাকিব খান। অতঃপর তিনি তৃপ্তি করে ডাব খেতে থাকেন। নায়কের এই আবির্ভাবনামা যদি সিনেমাতে রাখতেই হয়, (যা বলিউডে তো থাকেই, মাঝে মাঝে হলিউডেও থাকে) তবে এই আবির্ভাবনামা নিয়ে আরও একটু কাজ করা উচিত। অন্তত ডাব কেটে নায়কের আবির্ভাবের চেয়ে উত্তম আবির্ভাবনামা খুবই সম্ভব।

তুলনামূলকভাবে নায়িকার তথা জয়ার আবির্ভাবনামা মন্দ নয়। তবে আজকাল মধ্যবিত্ত শখের ফটোগ্রাফারদের হাতেও নিদেনপক্ষে সেমি-ডিএসএলআর থাকে। সে পরিপ্রেক্ষিতে ধনাঢ্য বাবা-মায়ের সন্তান জয়ার হাতে ডিজিটাল ক্যামেরা না দিয়ে একটা ডিএসএলআর দেওয়া যেত; ডিএসএলআরের ছড়াছড়িতে ওই ধরনের ক্যামেরা ছাড়া আজকাল কাউকে ফটোগ্রাফার বলা একটু মুশকিলই হয়ে পড়েছে।

গল্পের শুরুতেই দাদা-নাতনি, দাদি-নাতির ঠাট্টাগুলো উপভোগ্য হলেও, তাদের ঠাট্টামূলক গান ‘প্রেমের তাজমহল’-এর দৃশ্যায়ন মোটেও স্বস্তিদায়ক বা উপভোগ্য ছিল না। তবে গানের শেষের ট্রানজিশন সিকোয়েন্সটা ছিল ভালোই।

নায়কের বিয়ের প্রস্তাব এবং প্রেম– দুটোই হয়েছে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মধ্যে। একই দাদার ছেলের দিকের নাতি আর মেয়ের দিকের নাতনির সঙ্গে (যদিও নাতনি এখানে দুইজন)।

সিনেমার একটি সিকোয়েন্সের কথা বিশেষ করে বলতে হবে; এ কারণে নয় যে, বাংলা সিনেমায় এমন সিকোয়েন্স অদৃষ্টপূর্ব, তবে এ ধরনের সিকোয়েন্স দিয়ে এমন সফলভাবে কাহিনির মোড় ঘোরানো বাংলা সিনেমায় বিরল বটে। সিকোয়েন্সটিতে জয়া স্বপ্নে দেখে শাকিবের সড়ক-দুর্ঘটনার শিকার হওয়া; পরে বাস্তবেও ঘটে তাই। বাস্তবে যখন সবই মিলে যাচ্ছিল, তখন জয়া চেষ্টা করে শাকিবকে বাঁচাতে। এই চেষ্টা এবং দুর্ঘটনার পরে শাকিবের সেবা করার মধ্য দিয়ে মস্তিষ্কে-টিউমারের-অধিকারী প্রেমবিমুখ জয়া শাকিবের প্রেমে পড়তে শুরু করে।

এই পুরো সিকোয়েন্সকে রীতিমতো দুর্দান্ত বলা যেত একটু ফাঁক থেকে না গেলে। ঘটনাটি স্বপ্নে এবং বাস্তবে– দুবারই সম্পূর্ণ দেখানোয়, পরেরবার একটু যেন বিরক্তি লাগছিল। দ্বিতীয়বার দেখানোর সময় দু-একটা শট বাদ দিয়ে দেখালে বিরক্তভাবটা সম্ভবত এড়ানো যেত। তবে আফসোসের বিষয়, সিনেমার এমন শক্তিশালী সিকোয়েন্সেই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা মুখব্যাদান করেছে।

সিনেমার শুটিংয়ের সময় নানা ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে। যার ফলে এমন সমস্যা হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়, বিদেশের শুটিং শেষ করে এসে দেখা গেল, বিদেশের আরও কিছু শুটিং বাকি আছে। এমন সমস্যা সম্ভবত ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেমকাহিনি’তেও হয়েছিল। এর সমাধান করার জন্য কিছু কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়; কিন্তু কৌশলটি এমন হওয়া একদমই উচিত নয় যে, দর্শকরা ফাঁকটি ধরে ফেলবে। যে কারণে মালয়েশিয়ার শট হাতিরঝিলে নেওয়া উচিত নয়; বদলে সিকোয়েন্সটি ইনডোরে নিয়ে যাওয়া যেত; এমন রেস্টুরেন্ট বাংলাদেশে বিরল নয়, যেগুলোকে মালয়েশিয়ার বলে চালানো সম্ভব।

এই ভুলটি পীড়াদায়ক হয়েছে এ জন্য যে, নব-নির্মিত হাতির ঝিল প্রকল্পে যায়নি অথচ বছরখানেকের মধ্যে ঢাকায় এসেছে, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। যারা এখনও হাতির ঝিল প্রকল্পে যায়নি, তারাও প্রকল্পটির অবকাঠামোগুলো চেনে ভালো করেই। কাজেই গোঁজামিল দেওয়ার যে মূল শর্ত, কেউ যাতে বুঝতে না পারে, তার লঙ্ঘন হয়েছে সুষ্পষ্টভাবে; গোঁজামিলটি ধরে ফেলেছে প্রায় সব দর্শক।

তবে এই সিনেমার সবচেয়ে বড় গলদ হল, প্রথমে ও শেষে বেশ দ্রুতগতিতে কাহিনি এগোলেও মাঝপথে গুরুতররূপে শ্লথগতির হয়ে যাওয়া। এই গলদ এড়ানো গেলে সিনেমাটিকে ‘দারুণ’ বলা যেত।

আর সিনেমার যে অংশগুলোর শুটিং মালয়েশিয়াতে হয়েছে, সেই অংশগুলোর প্রিন্ট বাংলাদেশি অংশের চেয়ে অনেক বেশি ঝকঝকে। এই টেকনিকাল সীমাবদ্ধতা পেরুলে ভালো হত; তবে না পেরুনোতে মন্দ যেটা হয়েছে, সেটাও ওই হাতির ঝিল! ঝকঝকে প্রিন্ট হঠাৎ-ই এমনভাবে মলিন হয়ে গেল, খেয়াল না করলেও লোকেশন পরিবর্তনের হাওয়া দর্শকদের গায়ে লেগে যাবেই।

জয়ার অভিনয় যথারীতি ভালো হয়েছে। তবে গানের দৃশ্যগুলোতে জয়া শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ; বাণিজ্যিক ধারার ছবির নায়িকাদের একটু নাচতে হয়; গানের মধ্যে কেবল মুখজোড়া মুক্তোর মতো হাসি দিয়েই পার পাওয়ার চেষ্টা দৃষ্টিকটু ঠেকে। বিশেষ করে সিনেমার প্রথম গান– ‘আকাশ হতে আমি চাই’ যে গানের একমাত্র কুশীলব জয়া, সেখানে নাচের, বা অন্য কিছুর বদলে মুহূর্তে মুহূর্তে একই হাসিমুখ ঘুরেফিরে প্রদর্শনের ফলে জয়ার সুন্দর মুখশ্রীতেও দর্শকের বিরক্তি জন্মে যায়।

বিপরীতে শাকিব খান নেচেছেন ভালো। তবে ‘হ্যামিলনের পাগলা বাঁশি’ গানের সুরে যেমন টালিউডি প্রভাব প্রবল, তেমনি গানটিতে শাকিবের নাচেও টালিউডি মুদ্রার প্রভাব।

শাকিব-জয়ার আরও দুটি গান আছে– ‘ও প্রিয় আমি তোমার হতে চাই’ এবং ‘একমুঠো রোদ্দুর’। দুটি গানই শ্রুতিমধুর; কোরিওগ্রাফিও ভালো। গান দুটিতে জয়া খানিক করে নেচেছেনও, তা ভালোও লেগেছে। তবে সাগরে যে দৃশ্যায়নগুলো হয়েছে, তাতে শাকিব প্যান্ট না গুটালেও পারতেন, যেখানে জয়ার শাড়ির আঁচল পানিতে বিমলানন্দে ভিজছিল।

তবে সিনেমায় শাকিবের একটি ডায়লগ বেশ জমেছে; অনেকটা বলিউডি ঢংয়ের প্রত্যয়ী ডায়লগ। সিনেমায় অ্যান্টি-হিরো চরিত্রের নাম থাকে ‘সাকিব’, যে চরিত্রে রূপদান করেছেন আরেফিন শুভ। জয়ার প্রেমিক হিসেবে সেই সাকিবের নাম শোনার পর, শাকিব খান ওরফে জয় শিকদার বেশ লম্বা একটি ডায়লগ দেন, অনেকটা এ রকম– ছোটবেলায় ইচ্ছে ছিল ক্রিকেটার হব। তখন পাড়ায় একটা ছেলে ছিল, নাম সাকিব। ওই পরে হয়ে গেল সাকিব আল হাসান। তারপর ভাবলাম, সিনেমা করব। সেখানেও দেখি কোন শাকিব খান জায়গা দখল করে বসে আছে। এবার প্রেম করতে এলাম, এখানেও সাকিব?

সিনেমাতে তুলনামূলক ভালো অভিনয় করেছেন আরেফিন শুভ। অ্যান্টি-হিরো চরিত্রটিকে তিনি বেশ ভালোভাবেই রূপায়িত করেছেন। বিশেষত তার ‘কানে লাগা’র (‘কানে লাগে’) ডায়লগটি দর্শকদের মুখে মুখে ফিরতে পারত, যদি তার চরিত্রকে আরেকটু স্পেস দেওয়া যেত।

চরিত্রকে আরেকটু স্পেস দিলে সম্ভবত আরেকটি সমস্যা থেকেও মুক্ত হওয়া যেত। সিনেমার শুরুটা বেশ গতিশীল; শেষটাও তাই। কিন্তু কাহিনির মাঝখানে শাকিব-জয়ার প্রেমকাহিনিরই একাধিপত্য কাহিনির গতিকে বেশ শ্লথ করে দেয়। ওই সময়ে শুভর অ্যান্টি-হিরো চরিত্রকে দিয়ে বারকয়েক বাগড়া দেওয়ালে কাহিনিতে গতির সঞ্চার করা যেত অনায়াসে।

স্পেস বেশি না দিলেও সিনেমার সবচেয়ে শ্রুতিমধুর গানটিতে, ‘আমি নিঃস্ব হয়ে যাব জানো না’ গানে জয়ার বিপরীতে ছিলেন আরেফিন শুভ। গানটির কোরিওগ্রাফিও অসাধারণ। বিশেষ করে আরেফিন শুভ গানটিতে ভালো নেচেছেন। আবার গানের শেষ দিকে সম্ভবত সালমান শাহকে ট্রিবিউট করার একটা ব্যাপারও ছিল; শুভর একটি পোশাক সালমান শাহকে মনে করিয়ে দেয়, যদিও তেমন কোনো দাবি করা হয়নি; দাবি করলে, ব্যাপারটি অসাধারণ হত। গানটির পূর্বের এবং পরের ট্রানজিশনগুলোও অসাধারণ হয়েছে।

সিনেমায় আরেক জনের অভিনয় দৃষ্টি কেড়েছে অনেকেরই– সাজু খাদেমের। শাকিবের বন্ধু ওরফে কমেডি চরিত্রে সাজু খাদেম বেশ ভালো অভিনয় করেছেন।

সিনেমাতে আরও অভিনয় করেছেন শাকিবের দাদার চরিত্রে রাজ্জাক, দাদির চরিত্রে আনোয়ারা, শাকিবের বোন ওরফে প্রস্তাবিত কনের চরিত্রে লামিয়া মিমো, জয়ার বাবার চরিত্রে সুব্রত, মায়ের চরিত্রে দিতি প্রমুখ।

সিনেমার সংলাপ মন্দ হয়নি। সিনেমাটোগ্রাফিও চলনসই। সাউন্ড ডিজাইনিংয়েও তেমন কোনো সমস্যা নেই। আর কস্টিউম ডিজাইন বেশ ভালোই হয়েছে। সিনেমাতে একেবারে অল্প কিছু অ্যাকশন দৃশ্য ছিল, সেগুলো বাংলা সিনেমার মতোই হয়েছে; তবে শাকিব-শুভর আউটডোর অ্যাকশন দৃশ্যটি আরেকটু জমজমাট হতে পারত।

শেয়ার