এমন নৃশংসতা কখনো দেখিনি

Noor
বাংলানিউজ ॥
যেভাবে মানুষ মেরেছে তা ভীষণ ভয়াবহ, বীভৎস। তারা মানুষ জবাই করেছে। হাত-পায়ের রগ কেটেছে। চায়নিজ কুড়াল দিয়ে সারা শরীরে কুপিয়েছে। এমন নৃশংসতা আমাদের এলাকায় কখনো দেখি নি।

বিস্ময়মাখা এ বক্তব্য নীলফামারী-২ (সদর) আসনের এমপি আসাদুজ্জামান নূরের। রোববার বাংলানিউজের কাছে তার গাড়িবহরে জামায়াত-শিবিরের হামলার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে জনপ্রিয় এই অভিনেতা ও রাজনীতিক এ কথা বলেন।

‘আমাদের এলাকা সব সময়ই শান্ত। এখানকার মানুষ শান্তিপ্রিয়’ জানিয়ে একটু যেন থমকে যান আপাদমস্তক শান্তশিষ্ঠ মানুষটি।

তারপর বলেন, এমন ঘটনা নীলফামারীতে কখনোই ঘটে নি। যেভাবে সহিংসতা চালিয়েছে তাতে বোঝা যায় তারা এ কাজে খুব দক্ষ। হয় তারা বাইরে থেকে দক্ষ লোক ভাড়া করে এনে তাণ্ডব চালিয়েছে, অথবা বাইরে থেকে প্রশিক্ষক এনে এখানকার লোকজনকে দক্ষ করে তুলেছে।

শনিবার রাতের ওই হামলায় মৃত্যু হয় পাঁচজনের। আরো অনেকেই আহত হয়ে হাসপাতালে। এরই মধ্যে নিহতদের জানাযার আয়োজন, আহত নেতাকর্মীদের খোঁজ-খবর-সহায়তা, নেতাকর্মীদের সংগঠিত করা ইত্যাদি নিয়ে রোববার সকালেও ফুরসতহীন নূর।

তারই ফাঁকে বাংলানিউজের কাছে জামায়াতি হামলার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খুলে বসেন দেশবরেণ্য এই সংস্কৃতিকর্মী।

তিনি বলেন, তাদের হামলায় ৫ জন মানুষ মরেছে। এদের মধ্যে চার জন আমাদের দলীয় নেতাকর্মী। এদের বাইরে আবু বকর সিদ্দিক নামে যে বয়স্ক লোকটির মৃত্যু হয়েছে তাকে জামায়াত তাদের কর্মী বলে দাবি করছে। কিন্তু তিনি একজন ভ্যানচালক। বাঁশ নিয়ে নীলফামারী সদরে যাচ্ছিলেন। জামায়াতি তাণ্ডবে মাথায় আঘাত পেয়ে তার মৃত্যু হয়।

বিজয় দিবসের মাত্র ঘণ্টা তিরিশেক আগে সংঘটিত এমন হামলায় হতাহতদের স্মরণ করে বেদনার্ত কণ্ঠে নূর বলেন, সারাদেশের মতো এখানে প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ৠালি করি আমরা। আনন্দ করি। এবার মনে হয় আর আনন্দ ৠালি করা হবে না। সবাইকে সংগঠিত হতে বলেছি। তাছাড়া এমন নৃশংসতা কেউ আশা করে নি। তাই স্থানীয়রাও সংগঠিত হয়েছে।

‘মূল ঘটনার সূত্রপাত ১২ ডিসেম্বর’— জানিয়ে নূর বলেন, ওই রাতে আমার নির্বাচনী এলাকা নীলফামারী সদরের উত্তরের দুই ইউনিয়নে হামলা হয়। ইউনিয়ন দু’টি হলো লক্ষ্মীচাপ ও পলাশবাড়ী। এই দুই ইউনিয়নে সংখ্যালঘুরা তুলনামূলক বেশি। পাশের টুপামারী ইউনিয়নে জামায়াত সমর্থক বেশি।

কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার পর ওই জামায়াতের শক্ত ঘাটিঁ বলে পরিচিত ইউনিয়নের সশস্ত্র লোকজন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকার লোকজনের ওপর হামলা চালায়।

তিনি বলেন, আমাদের এখানে জাতীয় নির্বাচনে মূলত জামায়াতের সঙ্গেই লড়তে হয়। ২০০১ আর ২০০৮ সালেও আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো জামায়াত। বিএনপি এখানে প্রার্থী দেয় না।

ধারণা করছি, ১২ ডিসেম্বর রাতে বিভিন্ন ইউনিয়নের জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা সংগঠিত হয়ে দুই ইউনিয়নের সংখ্যালঘুদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালায়। ওই রাতে তারা ওই এলাকার বেইলি ব্রিজগুলো ভেঙে ফেলে। রাস্তা কেটে দেয়। রাস্তার পাশের গাছ কেটে ফেলে রাখে রাস্তার ওপর।

এমন বিরূপ পরিস্থিতিতে ওই রাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌছুতেই পারে নি। পরদিন তারা ওই এলাকায় গেলেও দুর্বৃত্তদের কাউকেই আর পায়নি।

এমন পরিস্থিতিতে বসে থাকতে পারি নি। তাই শনিবার বহর নিয়ে মুভ করি। জামায়াত অধ্যুষিত ইউনিয়নটির ওপর দিয়েই আমাদের হামলার স্থলে যেতে হয়। যাওয়ার সময় আমরা কোনো প্রতিবন্ধকতা পাই নি। কিন্তু ফেরার সময়ে তারা হঠাৎ করেই পরিকল্পিত হামলা চালায় ওরা।

তিনি বলেন, আমরা সে সময় প্রস্তুত ছিলাম না। আমাদের বহরের একটি অংশ পেছন থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ওই পেছনের অংশের ওপরই হামলাটা চালানো হয়।

ধিক্কারের ব্যাপার হলো, জামায়াত আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে, ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশু কিশোরদের সামনে রেখে। শনিবার রাতেই ওই এলাকায় অভিযান চালায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু বাসায় কেবল নারীরা রয়েছেন। পুরুষরা দিয়েছেন গা-ঢাকা। এমনকি হামলায় ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত শিশু-কিশোরদেরও বাড়িঘরে আর দেখা যায়নি।

তিনি বলেন, ওই ইউনিয়নে জামায়াত শক্তিশালী জানার পরও আমি সেখানে অনেকবার গেছি। রাস্তা করেছি। সেতু করেছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুদানের ব্যবস্থা করেছি। সরকারি সহায়তা আর সবার মতো তারাও পেয়েছে। তাদের সঙ্গে কোন বৈষম্য করি নি। তার প্রতিদান তারা এভাবে দেবে বুঝি নি।

তিনি বলেন, আমি নিশ্চিত, এ হামলা এখানেই শেষ নয়। তারা আরো হামলার চেষ্টা করবে। তবে আমরা মনে হয়, প্রতিরোধ গড়তে পারবো। সাধারণ মানুষ সংঘবদ্ধ হয়েছে।

শেয়ার