আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস

buddhejibi
নিজস্ব প্রতিবেদক॥ ‘আজ এই ঘোর রক্ত গোধূলীতে দাঁড়িয়ে/ আমি অভিশাপ দিচ্ছি তাদের/ যারা আমার কলিজায় সেঁটে দিয়েছে/ একখানা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ/’…কিংবা ‘একঝাঁক ঝাঁ ঝাঁ বুলেট তাদের বক্ষ বিদীর্ণ করুক/ এমন সহজ শাস্তি আমি কামনা করি না তাদের জন্য…।’
দেশের প্রধান কবি প্রয়াত শামসুর রাহমান তাঁর কবিতায় এভাবেই জাতির সূর্য সন্তানদের হন্তারক দেশদ্রোহী রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের শাস্তি কামনা করেছেন। শুধু প্রয়াত এ শ্রেষ্ঠ কবিই নন, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া দেশের সকল প্রান্তে একাত্তরের রণধ্বনীর মতোই একই আওয়াজ- ‘আর দেরি নয়, বুদ্ধিজীবী হন্তারক যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড চাই।’ আর এ প্রাণের দাবি পূরণ হয়েছে ‘কসাই’ কাদের মোল্লার ফাঁসির মাধ্যমে।
আজ চৌদ্দই ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের নিধনের মর্মন্তুদ স্মৃতিঘেরা এক দিন। বাঙালীর মেধা-মনন-মনীষা শক্তি হারানোর দিন আজ। ইতিহাসের পাতায় কালো আখরে উৎকীর্ণ বেদনা বিধূর কালবেলা। স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরে হলেও গোটা জাতি আজ অধীর আশায় বুক বেঁধেছে, ঘৃণ্য নরপশু বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের শীঘ্রই শাস্তি হবে, বিচারের রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে জাতি আরেকটি কলঙ্কের হাত থেকে মুক্তি পাবে।
এবার এক ভিন্ন রকম পরিস্থিতিতে জাতি পালন করছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। রাজাকার শিরোমনি শীর্ষ ক’জন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষণা হয়েছে। আর বুদ্ধিজীবী ঘাতক কুখ্যাত কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়েছে দু’দিন আগে। আর এরই মধ্যে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির সারাদেশেই তাণ্ডব সহিংসতা শুরু করেছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী এই জঙ্গী গোষ্ঠীর দেশব্যাপী তাণ্ডব ও সহিংস রূপ প্রত্যক্ষ করে একাত্তরের মতোই যেন জেগে উঠেছে স্বাধীনতাকামী মানুষ। প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ জনগণও জামায়াত-শিবিরকে প্রতিহত করতে মাঠে নেমেছে।
রাজাকার শিরোমনি ঘৃণিত গোলাম আযমসহ একাত্তরের ঘৃণ্য-নরঘাতক মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের শীর্ষ নেতারা এখন কারাগারে বন্দী। বিজয়ের দীর্ঘ চার দশক পরে হলেও যুদ্ধাপরাধীরা এখন আনুষ্ঠানিক বিচারের মুখোমুখি। শত ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ও বাধার মুখেও বর্তমান সরকারের মেয়াদেই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন ও রায় কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে। এবং তা বাস্তবায়নও শুরু করেছে। গোটা জাতির আশার প্রতিফলন হিসেবেই বিজয়ের মাস ডিসেম্বর থেকেই ঘৃণ্য নরপশু বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের রায় বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
যদিও এর আগেই পুরো জাতিকে হতবাক করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি প্রকাশ্য যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় মাঠে নেমেছে। খালেদা জিয়ার নির্দেশে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে চিহ্নিত এসব কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীকে মুক্তি এবং বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনাল বাতিলের দাবি জানিয়েছে। এ ঘটনায় পুরো জাতি হয়েছে বিস্মিত, বিক্ষুব্ধ।
১৯৭১ সালের নয় মাস রক্তগঙ্গা পেরিয়ে গোটা জাতি যখন উদয়ের পথে দাঁড়িয়ে, পূর্ব দিগন্তে টগবগিয়ে বিজয়ের লাল সূর্য উদিত হচ্ছে, দেশ যখন স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে- ঠিক তখনই বাঙালীর কৃতী সন্তানদের নৃশংসভাবে হত্যা করে পরাজয়ের গ্লানিমাখা পাক হানাদার আর তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সদস্যরা। বধ্যভূমিতে বড় অসহায় দশায় নিঃশেষে প্রাণ দেন আমাদের সেরা শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা।
রণক্ষেত্রে বীর বাঙালীর হাতে নাস্তানাবুদ হয়ে শেষে এ জাতিকে মেধাশূন্য করতে সুদূরপ্রসারী ঘৃণ্য নীলনকশা আঁকা হয়েছিল। ঘাতকরা চেয়েছিল জাতির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিতে। শ্বাপদীয় জন্তুর মতো আঁধারে নেমেছিল দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ। এ রাতেই তালিকা ধরে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে যাওয়া অজ্ঞাত স্থানে। হত্যা করে ফেলে রাখা হয় নিস্তব্ধ ভুতুড়ে অন্ধকারে। জাতি হারায় তার অসংখ্য মেধাবী সন্তানকে। পরদিন ঘুম থেকে জেগে প্রায় ছুঁই ছুঁই স্বাধীনতার আনন্দে উদ্বেল মানুষ জানতে পারেন এ নৃশংস হত্যাযজ্ঞের কথা। মুহূর্তে স্থবির হয়ে যায় সব আনন্দ-কোলাহল। অন্যদিকে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করে উল্লাসে ফেটে পড়ে এ দেশীয় নরঘাতকরা।
স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের মতো গোটা বাঙালী জাতি একই দাবি নিয়ে আজ গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছে দেশের শহীদ কৃতীসন্তানদের। শোকাহত মানুষের ঢল নামবে সেদিনের সেই হত্যাযজ্ঞের স্মৃতিবিজড়িত রায়েরবাজারে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিস্তম্ভে। সেখানে অর্পণ করা হবে পুষ্পার্ঘ্য। শোকে আপ্লুত বাঙালী গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে প্রয়াত বুদ্ধিজীবীদের।
একাত্তরের ডিসেম্বরে হত্যাযজ্ঞের শিকার শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা এখনও নিরূপণ করা হয়নি। প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলা পিডিয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যে সংখ্যা দাঁড় করান হয়েছে সে অনুযায়ী একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন ৯৯১ শিক্ষাবিদ, ১৩ জন সাংবাদিক, ৪৯ চিকিৎসক, ৪২ আইনজীবী এবং ১৬ জন শিল্পী, সাহিত্যিক ও প্রকৌশলী।
এঁদের মধ্যে রয়েছেন- ড. জি সি দেব, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক জ্যেতির্ময় গুহঠাকুরতা, সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য. ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক মুনীরুজ্জামান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী, ড. গোলাম মোর্তজা, ড. মোহাম্মদ শফি, শহীদুল্লাহ কায়সার, সিরাজউদ্দিন হোসেন, নিজামুদ্দিন আহমেদ লাডু ভাই, খন্দকার আবু তালেব, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, নাজমুল হক, আলতাফ মাহমুদ, নূতনচন্দ্র সিংহ, আর পি সাহা, আবুল খায়ের, রশীদুল হাসান, সিরাজুল হক খান, আবুল বাশার, ড. মুক্তাদির, ফজলুল মাহি, ড. সাদেক, ড. আমিনুদ্দিন, সায়ীদুল হাসান, হাবিুবর রহমান, মেহেরুন্নেসা, সেলিনা পারভীনসহ আরও অনেকে।

শেয়ার