মামলা থেকে ফাঁসি কার্যকর

kadermolla1
বাংলানিউজ ॥
গ্রেফতার হয়ে ৩ বছর ৫ মাস কারাগারে থাকার পর মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ১ মিনিটে ফাঁসির রায় কার্যকর করা হলো জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার। স্বাধীনতার ৪২ বছর পর এটিই হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার প্রথম রায় কার্যকর, যার মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হলো দেশের এক শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কাদের মোল্লার মামলার তদন্ত শুরু হয় তাকে গ্রেফতারের পর পরই। অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয় ১ বছর ৭ মাস আগে। আর ট্রাইব্যুনালে আপিল করার পর শুনানি চলে দীর্ঘ ৪ মাস ২০ দিন ধরে (৩৯ কার্যদিবসে)। অন্যদিকে শুনানি শেষ হওয়ার ৫৪ দিনের মাথায় চূড়ান্ত রায় ঘোষিত হয়। পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত রায় প্রকাশিত হয় আরো ৮০ দিন পর। আর ফাঁসি কার্যকর হলো এর ৭ দিন পর।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এরপর রাজধানীর শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ তারসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর সবোর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলো। এ আন্দোলনের মুখে সরকার আইন পরিবর্তন করে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আপিল করে। আপিল শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্ট ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। ৫ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন আপিল বিভাগ আর বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ১ মিনিটে কার্যকর করা হলো ফাঁসির রায়।
তবে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে একাত্তরের ‘কসাই কাদের’ নামে কুখ্যাত এই আলবদর কমান্ডারের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা হয় ৬ বছর আগে, দ্বিতীয় মামলা হয় বছর পাঁচেক আগে। সেই দুই মামলায়ই গ্রেফতার হন কাদের মোল্লা এবং মামলা দু’টি ট্রাইব্যুনালের মামলায় রূপান্তরিত হলে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হন তিনি।
ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা ৬টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি অপরাধ প্রমাণিত বললেও অপিল বিভাগের রায়ে প্রত্যেকটি প্রমাণিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন কাদের মোল্লার। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হচ্ছেন বিচারপতি মজিবুর রহমান মিঞা ও বিচারপতি শাহীনুর ইসলাম। অন্যদিকে আপিল মামলার রায়টি ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে ৫ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। বেঞ্চের অপর বিচারপতিরা হচ্ছেন, বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

ট্রাইব্যুনালে মামলার কার্যক্রম
মুক্তিযুদ্ধকালে গোলাম মোস্তফা নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার অভিযোগে ২০০৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে কেরাণীগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়। ওই মামলাটি করেছিলেন কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে এই মামলার প্রথম সাক্ষী মোস্তফার কমান্ডার মোজাফফর আহমেদ খান। ২০০৮ সালে পল্লবী থানায় আরো একটি মামলা হয় কাদের মোল্লাসহ আরো অনেকের বিরুদ্ধে। ওই মামলার অভিযোগে ২০১০ সালের ১৩ জুলাই তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে ট্রাইব্যুনাল-১ এ যুদ্ধাপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয় ২০১০ সালের ২১ জুলাই।
২০১১ সালের ১ নভেম্বর জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) তার বিরুদ্ধে হত্যা, খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়। ২৮ ডিসেম্বর এসব অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-১।
গত বছরের ১৬ এপ্রিল রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে আব্দুল কাদের মোল্লার মামলাসহ তিনটি মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করা হয়।
গত বছরের ২৮ মে একাত্তরে হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, ষড়যন্ত্র ও উস্কানিসহ ৬টি অভিযোগ এনে কাদের মোল্লার বিরদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩(২)(এ), ৩(২)(জি), ৩(২)(এইচ), ৩(১), ৩(২)(এ)(এইচ) অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত বছরের ২০ জুন তার বিরুদ্ধে ওপেনিং স্টেটমেন্ট (সূচনা বক্তব্য) উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী ও সুলতান মাহমুদ। তারা ৯৬ পৃষ্ঠার এ সূচনা বক্তব্যে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা ৬টি অভিযোগ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
এর পর ৩ জুলাই থেকে শুরু করে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) আব্দুর রাজ্জাক খান ও মনোয়ারা বেগমসহ রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১২ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদেরকে জেরা করেন।
কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া রাষ্ট্রপক্ষের অন্য সাক্ষীরা হলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আহম্মেদ খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মামা বাহিনীর প্রধান ও কমান্ডার শহিদুল হক খান মামা, কাদের মোল্লার হাতে ক্ষতিগ্রস্ত এক নারী সাক্ষী (ক্যামেরা ট্রায়াল), কবি কাজী রোজি, শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক ও আইনজীবী খন্দকার আবু তালেবের পুত্র সরকারি কর্মকর্তা খন্দকার আবুল আহসান, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী সাফিউদ্দিন মোল্লা, আব্দুল মজিদ পালোয়ান, কেরাণীগঞ্জের ঘাটারচর গ্রামের শহীদ নবী হোসেন বুলুর স্ত্রী নূরজাহান বেগম, বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন মোল্লা এবং সৈয়দ আব্দুল কাইয়ুম।
অন্যদিকে গত বছরের ১৫ নভেম্বর থেকে শুরু করে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত কাদের মোল্লা নিজেসহ ৬ জন সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন তার পক্ষে। এর আগে ৪ নভেম্বর সাফাই সাক্ষীর জন্য আসামীপক্ষের দাখিল করা ৯৬৫ জনের তালিকা থেকে ৬ জন সাক্ষীকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য অনুমোদন করেন ট্রাইব্যুনাল। অন্য ৫ সাফাই সাক্ষী হচ্ছেন, সুশীল চন্দ্র মণ্ডল, মোসলেম উদ্দিন মাস্টার, সাহেরা খাতুন, আলতাফ উদ্দিন মোল্লা ও এ আই এম লোকমান। রাষ্ট্রপক্ষ তাদের জেরা সম্পন্ন করেন।
গত ৭ থেকে ১৭ জানুয়ারি মোট ৮ কার্যদিবসে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আসামিপক্ষ। এর মধ্যে কাদের মোল্লার প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ৪ দিন এবং অপর আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুস সোবহান তরফদার ৪ দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী গত বছরের ১৭ থেকে ২৭ ডিসেম্বর ও গত ১৬ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপক্ষও যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে সময় নেন ৮ কার্যদিবস।
গত ১৭ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া। ওই দিন যে কোনো দিন মামলার রায় দেওয়া হবে বলে অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল।
পুনর্বিচারেরও আবেদন করা হয়!
মামলার একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়ে যাওয়ার পর গত ৩ জানুয়ারি মামলাটির পুনর্বিচারের আবেদন জানান কাদের মোল্লার আইনজীবী ব্যারিস্টার তানভীর আহমেদ আল আমীন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ বেলজিয়ামের ব্রাসেলস প্রবাসী বাংলাদেশি আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে ট্রাইব্যুনাল-১ এর পদত্যাগী চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপি কথোপকথনের সূত্র ধরে এ আবেদন করেন আসামিপক্ষ।
গত ৭ জানুয়ারি শুনানি শেষে কাদের মোল্লার মামলা পুনর্বিচারে আসামিপক্ষের আবেদন খারিজ করে দেন ট্রাইব্যুনাল। সে আদেশে পুনর্বিচারের আবেদন করার আগে মামলাটি যে পর্যায়ে ছিল, সেখান থেকেই শুরু করার আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরুর মধ্য দিয়ে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে পৌঁছে।
উল্লেখ্য, ওই স্কাইপি কথোপকথনের সূত্র ধরে বিচারাধীন জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম, বর্তমান আমির মতিউর রহমান নিজামী ও নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং ট্রাইব্যুনাল-২ এ জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা ৪টিরও পুনরায় শুরু করার আবেদন গত ৩ জানুয়ারি খারিজ করে দেন দু’টি ট্রাইব্যুনাল। আর এসব আদেশের পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে আসামিপক্ষের আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয় গত ২১ জানুয়ারি।
অন্যদিকে একই ঘটনার সূত্র ধরে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগ করায় ট্রাইব্যুনাল-১ এর পাশাপাশি পুনর্গঠিত হয় দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালও। ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর প্রথম ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন আর তার স্থলাভিষিক্ত হন এ ট্রাইব্যুনালেরই অন্য বিচারক বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।
ট্রাইব্যুনালের রায়
গত ৫ ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ৬টি অভিযোগের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল তাকে ৫টি অপরাধে দায়ী করে দু’টিতে যাবজ্জীবন ও তিনটিতে ১৫ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেন। একটি অভিযোগ প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেননি উল্লেখ করে ওই অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়।
সুপ্রিম কোর্টে আপিল
প্রমাণিত অভিযোগগুলোতে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দণ্ডাদেশ না দেওয়ায় এবং একটি অপরাধের অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়ায় সাজা বাড়ানোর লক্ষ্যে এ রায়ের বিরুদ্ধে গত ৩ মার্চ আপিল করেন প্রসিকিউশন। আপিলে ওই ৫টি অভিযোগে দেওয়া সাজা অপর্যাপ্ত দাবি করে এবং খালাসের আদেশ বাতিল চেয়ে সর্বোচ্চ দণ্ড ফাঁসির আরজি জানানো হয়। আর ৪ মার্চ প্রমাণিত সকল অভিযোগ থেকে খালাসের আবেদন জানিয়ে আপিল করেন আব্দুল কাদের মোল্লা।
আপিল শুনানির কার্যক্রম
আপিল শুনানি ও অ্যামিকাস কিউরিদের মতামত প্রদানের জন্য ৩৯ কার্যদিবস সময় লেগেছে আপিল বিভাগে। এর মধ্যে ১৫ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষ ও ১৮ কার্যদিবসে আসামিপক্ষ শুনানি করেছেন। আদালত মনোনীত ৭ জন অ্যামিকাস কিউরি তাদের মতামত দিয়েছেন ৬ কার্যদিবসে।
গত ১ এপ্রিল থেকে শুরু হয় আপিল শুনানি। প্রথমে রাষ্ট্রপক্ষ ও পরে আসামিপক্ষের করা আপিলের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
এর মধ্যে ১ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত, ৬ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত এবং ২৩ জুলাই মোট ১৫ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের সমন্বয়ক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান। অন্যদিকে ২৯ এপ্রিল থেকে ৬ জুন পর্যন্ত এবং ২২ জুলাই ১৮ কার্যদিবসে আসামিপক্ষে শুনানি করেন ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।
রাষ্ট্রপক্ষ তাদের শুনানিতে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দেওয়া সাক্ষীদের সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেওয়ার বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তার সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা, ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায় পাঠ, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’১৯৭৩ সংশোধনী বিষয়ে বক্তব্য এবং আসামিপক্ষের যুক্তির জবাব দেন।
অন্যদিকে আসামিপক্ষ কাদের মোল্লাকে খালাস দেওয়ার পক্ষে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন এবং রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তির জবাব দেন।
এর আগে গত ১০ মার্চ প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ৬ সদস্যের বেঞ্চ শুনানির জন্য ৩১ মার্চ রোববার দিন ধার্য করেন। তবে ওই দিন আপিল বিভাগের নতুন বিচারপতিদের শপথ গ্রহণ ও সংবর্ধনার জন্য এ মামলার শুনানি শুরু হয়েছে গত ১ এপ্রিল। একজন বিচারপতি ইতিমধ্যে অবসরে চলে যাওয়ায় শুনানি সম্পন্ন হয় ৫ বিচারপতির বেঞ্চে।
ট্রাইব্যুনাল-২ এর রায় নিয়ে করা আপিল শুনানি শেষ হলে গত ২৩ জুলাই যে কোনো দিন এ আপিল মামলার রায় ঘোষণা করা হবে জানিয়ে মামলাটি অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
অ্যামিকাস কিউরিদের মতামত
আপিল শুনানি চলাকালে দু’টি আইনগত প্রশ্ন দেখা দেয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল’ (প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন) এর আওতায় কাদের মোল্লার মামলার এই মামলা পড়বে কিনা এবং দ্বিতীয়টি হল আপিলের সমান সুযোগ রেখে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’১৯৭৩ এ যে সংশোধনী আনা হয়েছে এবং ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে তার যে ভুতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেখানো হয়েছে- সেটি এ মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কিনা।
এ দু’টি বিষয়ে আদালতকে সহায়তা করতে গত ২০ জুন সাতজন বিশিষ্ট আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি নিযুক্ত করেন আপিল বিভাগ। তাদের কাছে দু’টি বিষয়ের ওপর আইনগত ব্যাখ্যা জানতে চান আপিল বিভাগ।
৭ অ্যামিকাস কিউরি ৬ কার্যদিবসে মতামত দিয়েছেন। তাদের মধ্যে এ সংশোধনী আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে বলে মতামত দিয়েছেন ৫ জন। তারা হচ্ছেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি ও ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ। অন্য দুই অ্যামিকাস কিউরি টিএইচ খান ও এএফ হাসান আরিফ মনে করছেন, এটি প্রযোজ্য হবে না।
অন্যদিকে কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল’ (প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন) এর আওতায় এ মামলা পড়বে বলে তিনজন, পড়বে না বলে দুইজন এবং অন্য দুই জন ভিন্ন ধরনের মতামত দিয়েছেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ও ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদের মতে, প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য নয়। অন্যদিকে ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম ও এএফ হাসান আরিফের মতে, প্রযোজ্য হবে। আর ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসির মতে, প্রযোজ্য হবে, যদি তা দেশীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। দেশীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে এটি প্রযোজ্য হবে না। টিএইচ খানের মতেও প্রযোজ্য হবে। তবে তিনি মনে করেন, যে ক্ষেত্রে দেশীয় আইনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনকে সাংঘর্ষিক বলে মনে হবে, সে ক্ষেত্রে দেশীয় আইন প্রাধাণ্য পাবে।
প্রসঙ্গত, কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কাদণ্ডাদেশের রায়ের পর মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে আন্দোলন করে গণজাগরণ মঞ্চ। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধন) বিল, ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়। সংশোধিত আইনে রায়ের বিরুদ্ধে উভয় পক্ষের আপিল করার বিধান রাখা হয়। আগে শুধু আসামিপক্ষ আপিল করতে পারতেন।

আপিল মামলার রায়
গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনর নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ৫ বিচারপতির বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে (৪:১) আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসির দণ্ড দেন।

ট্রাইব্যুনালের রায় অনুসারে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, ছাত্র ও আইনজীবীসহ আরো অনেককে হত্যার মোট ৬টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে ৫টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছিল। অপিল বিভাগের রায়ে ৬টি অভিযোগের প্রত্যেকটি প্রমাণিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ৬ নম্বর অভিযোগে সপরিবারে হযরত আলী লস্করকে হত্যার দায়ে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। এছাড়া ৪ নম্বর অভিযোগে ঘাটারচর গণহত্যার দায়ে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ হয়েছে, যে অভিযোগ থেকে ট্রাইব্যুনাল তাকে খালাস দিয়েছিলেন। অন্য অভিযোগগুলোতে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এর মধ্যে মিরপুরের আলোকদী (আলুব্দী) গ্রামে গণহত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ পেয়েছেন কাদের মোল্লা।

এছাড়া প্রথম অভিযোগ, মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেওয়া, দ্বিতীয় অভিযোগ কবি মেহেরুননিসা, তার মা এবং দুই ভাইকে হত্যা এবং তৃতীয় অভিযোগে সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবকে হত্যার দায়ে প্রত্যেকটিতে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ১৫ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।

আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর ও আসামিপক্ষের আপিল খারিজ করে দেন।

মৃত্যুদণ্ডই তার প্রাপ্য
গত ৫ ডিসেম্বর সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ কাদের মোল্লার মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। ৭৯০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, কাদের মোল্লার অপরাধসমূহ এতোটাই পৈশাচিক যে, মৃত্যুদণ্ড ছাড়া কোনো সাজাই তার জন্য পর্যাপ্ত নয়। একমাত্র মৃত্যুদণ্ডই তার প্রাপ্য।

এর আগে গত ২৪ নভেম্বর রায় প্রদানকারী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারকরা পূর্ণাঙ্গ রায় লেখা শেষ করেন। এরপর প্রধান বিচারপতির কাছে গেলে তিনি পুরো রায়টি একীভূত করেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর রায় দেওয়ার ৮০ দিনের মাথায় তা প্রকাশিত হয়।

বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী তার রায়ের অভিমতে বলেন, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার অপরাধসমূহ এতোটাই পৈশাচিক যে, মৃত্যুদণ্ড ছাড়া পৃথিবীর ফৌজদারি আইনের পুস্তকে নির্ধারিত কোনো সাজাই তার জন্য পর্যাপ্ত নয়। একমাত্র মৃত্যুদণ্ডই তার প্রাপ্য। তার কৃতকর্মের কারণে যে দুর্বিষহ ব্যথা-বেদনা ভুক্তভোগী এবং তার আত্মীয়-পরিজনরা এমনকি গোটা সমাজ যা আজও বহন করছে, তার কোনোই প্রতিকার নেই। তার অপরাধসমূহ একমাত্র একটি অসুস্থ মস্তিষ্ক চিন্তায় আনতে পারে। তার অপরাধের ফলাফল সমস্ত জাতিকে অনন্তকাল বয়ে বেড়াতে হবে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বাংলাদেশের বাইরেও তার অপরাধসমূহ নির্লজ্জ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তার অপরাধসমূহ ১৯৭১ সালকে বিশ্ববাসীর জন্যে একটি গণধিকৃত সাল হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।

কবি মেহেরুন্নেসা, তার মা এবং ভাইকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে জনপ্রিয় কবি কাজী রোজী যে বর্ণনা দিয়েছেন তাও লোমহর্ষক। কাজী রোজীর বর্ণনায়, মস্তিষ্ক দেহ থেকে খণ্ডন করার পর তার দেহ জবাই করা মুরগির মতো যেমন ছটফট করছিল তখন তার অর্ধকর্তিত মস্তিষ্কসহ তার দেহ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এ শুধু হত্যাযজ্ঞই নয়, এ ছিল জিঘাংসা চরিতার্থ করার এক চরম উদাহরণ। কিন্তু যেহেতু এক ব্যক্তিকে দু’বার ফাঁসি দেওয়া যায় না, সেহেতু শুধু ছয় নম্বর অভিযোগনামার জন্য তার ফাঁসির আদেশ দেওয়া হলো।

পূর্ণাঙ্গ রায়ের অভিমতে আদালত বলেন, কাদের মোল্লার এ বর্বর অপরাধ মানবজাতির বিবেককে দারুণভাবে আহত ও স্তম্ভিত করে। এই কারণে ৬ নম্বর অভিযোগে (সপরিবারে হযরত আলী লস্করকে হত্যা) কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দিয়ে ট্রাইব্যুনালের রায় বিবেচনাপ্রসূত হয়নি এবং সাজা প্রদানের নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের ৩ নম্বর সাক্ষী (শহীদ হযরত আলী লস্করের মেয়ে মোমেনা খাতুন) এই মামলার স্বাভাবিক সাক্ষী এবং এই ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষ সাক্ষী, যাকে পক্ষপাতদুষ্ট সাক্ষী বলা যায় না। এ কারণে এ অপরাধে একমাত্র মৃত্যুদণ্ডই কাদের মোল্লার যথার্থ দণ্ড।

বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তার রায়ে বলেন, সরকারের দায়ের করা আপিল রক্ষণযোগ্য। ৪ নম্বর অভিযোগ (ঘাটারচর গণহত্যা) থেকে কাদের মোল্লাকে অব্যাহতির ট্রাইব্যুনালের আদেশ বাতিল করে এই অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হলো।

৬ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ বাতিল করে তার বদলে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হলো। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দেওয়া হলো।

অপরদিকে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে কাদের মোল্লার করা আপিল খারিজ করা হলো।

কাদের মোল্লার যতো অপরাধ
কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে প্রমাণিত প্রথম অভিযোগ হচ্ছে, একাত্তরের ৫ এপ্রিল মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেন কাদের মোল্লা।

দ্বিতীয় অভিযোগ হচ্ছে, একাত্তরের ২৭ মার্চ কাদের মোল্লা সহযোগীদের নিয়ে কবি মেহেরুননিসা, তার মা এবং দুই ভাইকে মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের বাসায় গিয়ে হত্যা করেন।

প্রমাণিত তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৯ মার্চ বিকেলে সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবকে আরামবাগ থেকে কাদের মোল্লা ও তার সহযোগীরা জল্লাদখানা পাম্প হাউসে নিয়ে জবাই করে হত্যা করেন।

এ তিন অপরাধের প্রত্যেকটিতে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ১৫ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। আপিল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের এ সাজা বহাল রাখেন।

ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে বলেছিলেন, ঘটনা ঘটলেও কেরাণীগঞ্জের ঘাটারচর গণহত্যার সঙ্গে কাদের মোল্লার সংশ্লিষ্টতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেননি রাষ্ট্রপক্ষ। এটা ছিল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে চতুর্থ অভিযোগে। আপিল বিভাগ এ অপরাধের দায়ও প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করে কাদের মোল্লাকে খালাসের আদেশ বাতিল করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন।

এ অভিযোগ অনুসারে, ২৫ নভেম্বর কাদের মোল্লা ও ৬০-৭০ জন রাজাকার কেরাণীগঞ্জ থানার ভাওয়াল খানবাড়ি এবং ঘাটারচরে (শহীদনগর) শতাধিক নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে হত্যা করেন।

পঞ্চম অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনা ও অবাঙালি রাজাকারদের সঙ্গে কাদের মোল্লা মিরপুরের আলোকদী (আলুব্দী) গ্রামে হামলা চালান। ওই ঘটনায় ৩৪৪ জনের বেশি শহীদ হন।

ষষ্ঠ অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৬ মার্চ কাদের মোল্লা, তার সহযোগী এবং পাকিস্তানি সেনারা মিরপুরের ১২ নম্বর সেকশনে হযরত আলী লস্করের বাসায় যান। কাদের মোল্লার নির্দেশে হযরত, তার স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং দুই বছরের এক ছেলেকে হত্যা করা হয়। ধর্ষণের শিকার হন শহীদ হযরত আলী লস্করের এক মেয়ে।

এ দুই অপরাধের প্রত্যেকটিতে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। আর আপিল বিভাগ শেষ অপরাধে সাজা বাড়িয়ে ফাঁসির আদেশ দেন এবং পঞ্চম অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন।

মৃত্যু পরোয়ানা

৫ ডিসেম্বর বেলা ১২টায় ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার এ কে এম নাছির উদ্দিনের কাছে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি হস্তান্তর করা হয়। এ রায়ের অনুলিপি ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, কারা মহাপরিদর্শক (আইজি-প্রিজন) ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। কনডেম প্রিজনারের (আসামি) পক্ষে রায়ের অনুলিপি গ্রহণ করেন আসামিপক্ষের অ্যাডভোকেট অন রেকর্ডস জয়নাল আবেদিন।

আপিল বিভাগের চূড়ান্ত পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়ার পর পরই ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার ট্রাইব্যুনাল-২ এর তিন বিচারপতির কাছে পাঠিয়ে দেন। তারা এটি যাচাই-বাছাই শেষে আইন অনুসারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরোয়ানা জারি করে তাতে স্বাক্ষর করেন। চূড়ান্ত রায়ের ভিত্তিতে ওইদিন দুপুরে এ মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারপতি চেয়ারম্যান ওবায়দুল হাসান, বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম।

এরপর সেটি রেজিস্ট্রারের দফতরে এসে পৌঁছালে রেজিস্ট্রার এ কে এম নাসির উদ্দিন মাহমুদ স্বাক্ষর করার পর কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর অনুলিপি যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে।

বিকেল সাড়ে চারটায় লাল কাপড়ে মোড়ানো কাদের মোল্লার মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছে দেন ট্রাইব্যুনালের ডেপুটি রেজিস্ট্রার অরুণাভ চক্রবর্তী।

আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানার সঙ্গে অন্যান্য কাগজপত্রও পাঠানো হয়। কাদের মোল্লার মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যু কার্যকর করার আদেশ দেওয়া হয় মৃত্যু পরোয়ানায়।

লাল কাপড়ে মোড়ানো কাদের মোল্লার মৃত্যু পরোয়ানার কপি পাওয়ার পর ওই দিনই সন্ধ্যায় তাকে পড়ে শোনান কারাগারের জেলার মাহবুবুর রহমান।

রায়ের কপি হাতে পেয়ে কাদের মোল্লাকে কনডেম সেলে কয়েদির পোশাক ও মাথায় লাল টুপি পরানো হয় বলে জানিয়েছেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী।

এরপর ফাঁসি কার্যকরের আগ পর্যন্ত জেল কোড অনুযায়ী অন্যান্য ফাঁসির আসামিদের জন্য আলাদা কনডেম সেল বা ফাঁসির সেলে রাখা হয় কাদের মোল্লাকে।

শেয়ার