হরতাল-অবরোধ: পরিবহনে দৈনিক ক্ষতি ৩০০ কোটি টাকা

bus
সমাজের কথা ডেস্ক॥ হরতাল ও অবরোধে সহিংতা ও নাশকতায় পরিবহণ খাতে দৈনিক প্রায় তিনশ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি করেছেন মালিকরা।
তারা বলছেন, কর্মসূচিগুলোতে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণে ক্ষতি এবং রাস্তায় গাড়ি নামাতে না পারায় তারা এমনকি ব্যাংকঋণের কিস্তিও শোধ করতে পারছেন না।
পরিস্থিতি এরকম চলতে থাকলে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
গত এক বছরে পরিবহণ খাতের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিবহনের ক্ষতির একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ।
তিনি বলেন, “শুধু মাত্র ভাঙচুরের কারণেই গত একবছরে পরিবহণ মালিকদের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৯৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে একদিন বাস, ট্রাক ও কভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ থাকলে ক্ষতি হয় প্রায় ৩শ কোটি টাকা। সুতরাং আমাদের অবস্থাটা সহজেই অনুমেয়।”
তিনি জানান, গত এক বছরে হরতাল ও অবরোধসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে প্রায় ৮০০টি গাড়ি এবং ভাংচুরের শিকার হয়েছে প্রায় ৩ হাজার গাড়ি।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “এই যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে অনেক মালিকই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে চাচ্ছেন। ব্যবসা করবেন কিভাবে, তারা ব্যাংক ঋণই-তো শোধ করতে পারছেন না।”
এনায়েতের হিসেবে, বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানসহ দেশে মোট সড়ক পরিবহণের সংখ্যা ৩ লাখ। এর মধ্যে ব্যাংকঋণের মাধ্যমে কেনা হয়েছে প্রায় ২ লাখ।
তিনি বলেন, “দিনের পর দিন ব্যবসা বন্ধ। সময়মতো ঋণ শোধ না করতে পারলে সেই ঋণের সুদও চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকে।
“অনেকই নিঃস্ব প্রায় হয়ে পড়েছেন। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে বেসরকারি পরিবহন আর টিকবে না।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসেবে, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত পরিবহনের ইক্যুইপমেন্ট ও স্পেয়ারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ রয়েছে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা, অটোমোবাইলে (সিএনজি কনভারশনসহ) প্রায় ৪০০ কোটি টাকা, পরিবহন ও যোগাযোগে প্রায় ৬০৮০ কোটি টাকা এবং সড়ক পরিবহনে (বাস, ট্রাক, ডিজেল ইঞ্জিন অটোরিক্শা, ট্যাক্সি ক্যাব) প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।
এছাড়াও জলযানে (লঞ্চ, ফেরি ও স্টিমার) বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় একহাজার ৮শ কোটি টাকা এবং বিমান পরিবহণে একহাজার ২শ কোটি টাকা।
রাজনৈতিক সংকটে পরিবহন খাত রক্ষায় দুই দলকে আলোচনায় বসতে অনুরোধ জানান সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব।

এদিকে সড়ক পরিবহণ চলাচল বন্ধ থাকায় অনেক পরিবহন শ্রমিকের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের দপ্তর সম্পাদক বাদল চৌধুরী বলেন, “সারাদেশে পরিবহণ খাতে মোট শ্রমিকের সংখ্যা এ মুহূর্তে প্রায় ৩০ লক্ষ। গাড়ি বন্ধ থাকা মানে তাদের আয়ের পথ বন্ধ। এতগুলো পরিবার কীভাবে বেঁচে থাকবে- তা আমাদের রাজনীতিবিদদের চিন্তা করা উচিত।
“এদের অনেকেই নিরুপায় হয়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। সেখানে দিনমজুরের কাজও করছে বলে আমাদের কাছে খবর আছে।”
বাদলের দেয়া হিসাব অনুসারে, গত এক বছরে (৩০ নভেম্বর ২০১৩) হরতাল ও অবরোধে নিহত হয়েছেন প্রায় ৩৩ জন মোটরশ্রমিক, আহত হয়েছেন প্রায় ৫০০ জন।
এনায়েত জানান, এ খাতের মোট শ্রমিকের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ দৈনন্দিন হিসেবে মজুরি পান। আর বাকী ২০ শতাংশের মজুরি মাসিক ভিত্তিতে দেয়া হয়।
পূবালী ব্যাংকের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, “ঋণ দেয়া এবং তার পরিশোধের ক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি অনুসরণ করি। এ নীতি অনুসারে গ্রাহকরা পারিপার্শ্বিক কারণে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাদের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ দেয়া হয়।
“তবে যারা ইচ্ছকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করেন না তাদের ক্ষেত্রে আমরা জিরো টলারেন্স দেখাই।”
গত ২৮ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক জানান, এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধের মামলায় দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়ের পর বিভিন্ন সময়ে বিরোধী ১৮ দলের ডাকা হরতাল-অবরোধসহ নানা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নাশকতার কারণে রেলের মোট ৩২ কোটি টাকার সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে।
এসব বিষয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন সিদ্দিক বলেন, “পরিবহনে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তাদের পক্ষে পুলিশ বাহিনী সহিংসতা ঠেকাতে কাজ করছে বলেই আমরা জানি।”

শেয়ার