নেলসন ম্যান্ডেলা: ১৯১৮-২০১৩

last

সমাজের কথা ডেস্ক॥ বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত রাষ্ট্রনায়ক। বর্ণবাদবিরোধী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে ম্যান্ডেলাকে দক্ষিণ আফ্রিকার জাতির পিতাতুল্য সম্মান জানানো হয়।
২৭ বছরের কারাজীবনের পর ১৯৯০ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্বগ্রহণ করেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ম্যান্ডেলা। ১৯৯৩ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।
দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে উচ্চপদস্থ রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন ম্যান্ডেলা। প্রচার চালিয়েছিলেন এইচআইভি/এইডস এর বিরুদ্ধে।
২০১০ সালে ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল খেলার আয়োজক দেশ হিসাবেও দক্ষিণ আফ্রিকার অধিকার আদায়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি।
সম্প্রতি কয়েক বছরে মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়েও ম্যান্ডেলা ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, বুরুন্ডি ও আফ্রিকার অন্যান্য দেশে শান্তি আলোচনায় জড়িত ছিলেন।
২০০৪ সালে ৮৫ বছর বয়সে ম্যান্ডেলা পরিবার ও বন্ধুবন্ধবকে বেশি সময় দেয়ার জন্য এক অর্থে নেপথ্যেই চলে যান। তিনি জনজীবন থেকে অবসর নেন।
গত দু’বছরে তিনি কয়েকবার হাসপাতালে ছিলেন। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে জোহান্সবার্গের হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ম্যান্ডেলাকে। সে সময়ও তার স্বাস্থ্য নিয়ে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।
১৯৮০ সালে রোবেন দ্বীপে জেলে থাকার সময় ম্যান্ডেলা যক্ষায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।
২০১২ সালের শুরুর দিকে ম্যান্ডেলার কার্যালয় জানিয়েছিল, তিনি পাকস্থলীর দীর্ঘদিনের পুরোনো রোগে ভুগছেন।
কিন্তু সম্প্রতি কয়েকমাসে ম্যান্ডেলা বারবারই ফুসফুস সংক্রমণে ভুগেছেন। দক্ষিণ অফ্রিকার একটি ছোট্ট গ্রামে তেম্বু গোত্রে ১৯১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন ম্যান্ডেলা।
দেশটিতে ম্যান্ডেলাকে তার গোত্রের নাম অনুসারে ডাকা হয় মাদিবা। আফ্রিকার কালো মানুষের অবিসংবাদিত নেতা ম্যান্ডেলাকে স্থানীয় বাসিন্দারা এ নামেই চেনে। আর স্কুলে পড়ার সময় এক শিক্ষক তার ইংরেজি নামকরণ করেছিলেন নেলসন।
তার বাবা ছিলেন রয়াল তেম্বু পরিবারের কাউন্সিলর। ৯ বছর বয়সেই বাবার মৃত্যু হয়। পরে তেম্বু গোত্র প্রধানের পরিচর্যায় বড় হন তিনি।
১৯৪১ সালে ২৩ বছর ম্যান্ডেলা ঘটা করে আয়োজন করা বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে চলে যান জোহান্সবার্গে। এর দু’বছর পর আফ্রিকানার উইস্টওয়াটারান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে ডিগ্রি নেন। সেখানে তিনি নানা বর্ণের নানা গোত্রের মানুষের সঙ্গে মেশেন।
আর এই মেলামেশা থেকেই বর্ণবাদ, বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে শুরু করেন তিনি। এ ভাবনাই তাকে চালিত করে রাজনীতিতে।
ওই বছরই ম্যান্ডেলা যোগ দেন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস এএনসি তে। পরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এএনসি ইয়ুথ লিগ।
ম্যান্ডেলা বিয়ে করেন ১৯৪৪ সালে এভেলিস মাসে কে। ১৯৫৮ সালে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে তাদের। ১৯৫২ সালে একজন আইনজীবী হিসাবে ম্যান্ডেলা তার সহকর্মী অলিভার তাম্বোর সঙ্গে আইনচর্চা শুরু করেন জোহানেসবার্গে।
তারা একসঙ্গেই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রচার চালান। ১৯৫৬ সালে ম্যান্ডেলাসহ ১৫৫ জনের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। তবে ৪ বছর বিচারকাজ চলার পর ম্যান্ডেলার বিরুদ্ধে অভিযোগ খারিজ হয়ে যায়। কিন্তু নতুন নতুন আইন পাশের ফলে বর্ণবাদবিরোধী প্রচার কঠোরভাবে প্রতিহত হতে থাকে।
১৯৫৮ সালে ম্যান্ডেলা দ্বিতীয় বিয়ে করেন উইনিকে। ম্যান্ডেলাকে জেল থেকে ছাড়াতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তার এই স্ত্রী।
১৯৬০ সালে এএনসি আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হয়। ম্যান্ডেলা চলে যান আন্ডারগ্রাউন্ডে।
বর্ণবাদী সরকারের সঙ্গে সংঘাত উত্তেজনা বেড়ে যায় ১৯৬০ সালে। সে সময় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে সামিল অনেক মানুষ পুলিশের গুলিতে মারা যায়। আর এ থেকেই অবসান ঘটে শান্তিপূর্ণভাবে চালানো আন্দোলনের। এএনসি’র ন্যাশনাল ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে ম্যান্ডেলা তখন অর্থনৈতিক অন্তর্ঘাতী প্রচারণা ও আন্দোলন শুরু করেন।
তার ওপর নেমে আসতে থাকে কর্তৃপক্ষের খড়গ। ১৯৬৪ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় তার। রোবেন দ্বীপে ১৮ বছরের কারাবাসের পর ১৯৮২ সালে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পোলসমুর কারাগারে।
১৯৯২ সালে দ্বিতীয় বিবাহ বিচ্ছেদের পর ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বরে নোবেল শান্তি পুরষ্কার পান ম্যান্ডেলা। এর ৫ মাস পর দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে নির্বিশেষে সববর্ণের মানুষের গণতান্ত্রিক ভোটে দেশটিতে প্রথমবারের মতো কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি।
১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে তিনি এএনসির নেতৃত্ব সংগঠনটির ভাইস প্রেসিডেন্ট থাবো এমবেকির কাছে হস্তান্তর করেন।
১৯৯৮ সালের ১৮ জুলাই তিনি মোজাম্বিকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সামোরা মিচেলের বিধবা স্ত্রী গ্রাকা মিচেলকে বিয়ে করেন।
১৯৯৯ সালের ১৬ জুন তিনি সরকার থেকে অবসরে যান এবং শাসনভার এমবেকির কাছে হস্তান্তর করেন।
২০০৫ সালের ৬ জানুয়ারি ম্যান্ডেলার একমাত্র ছেলে মাগাতো ম্যান্ডেলা ৫৪ বছর বয়সে মারা যান। জনশ্রুতি রয়েছে তিনি এইডসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।
২০০৮ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা জাতীয় তথ্যভাণ্ডার থেকে ম্যান্ডেলাকে একজন সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দেয়ার বিষয়টি মুছে ফেলার পক্ষে মত দেন।
২০০৯ সালের ৯ মে তিনি জ্যাকব জুমার প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
২০১০ সালের ১১ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলে নেদারল্যান্ডস ও স্পেনের মধ্যকার ফাইনাল খেলা দেখার জন্য স্টেডিয়ামে উপস্থিত হন।
২০১৩ সালের ৮ জুন তিনি ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হন।
পরবর্তী ছয় সপ্তা তিনি হাসপাতালেই কাটান।
২০১৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর ম্যান্ডেলাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়।
২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর নিজের বাড়িতে শান্তিপূর্ণভাবেই চিরনিদ্রায় চলে যান এই কিংবদন্তী নেতা।

শেয়ার