বাবু’র পর অন্যরাও মৃত্যু আশঙ্কায়!

babu

বাংলানিউজ॥ শাহবাগে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল বোমায় অগ্নিকা-ের ঘটনায় নিহতের লাশের সারি বাড়ছে দিনে দিনে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিণে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকা পাঁচজনের মধ্যে ওয়াহিদুর রহমান বাবু (২২) চলে গেলেন না ফেরার দেশে। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে করতে পাশের বেডের সহযোদ্ধা চলে যাওয়ায় চিকিৎসাধীন অন্যান্যদের মধ্যেও বাড়ছে মৃত্যু আতঙ্ক।
বুধবার ভোরে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের আইসিইউ-তে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন বাবু। মৃত্যু আশঙ্কায় রয়েছেন নূর নবী, আবু তালহা, রাহাজুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীর হোসেন।
আইসিইউ প্রধান ড. শাহ আলম বাংলানিউজকে জানান, ৭৮ ঘণ্টা (৭দিন) কৃত্রিম শ্বাসনালীতে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল বাবুকে। অন্যদেরও একই অবস্থা। বাকিদের বিশেষ করে শ্বাসনালী ও ফুসফুসের অংশ যাদের পুড়ে গেছে, তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। মেডিকেল বোর্ড কাজ করছে। তারপরও বেঁচে থাকার আশা ীণ। আমাদের শেষ চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি।
পুলিশ কনস্টেবল নূর নবী
২৮ নভেম্বর গুলিস্তান টিএনটি অফিসে ডিউটি শেষে কামরাঙ্গীর চরের বাসায় ফিরছিলেন। শাহবাগে বিহঙ্গ পরিবহনে ছোঁড়া পেট্রোল বোমায় মুখম-ল, শ্বাসনালী, মাথা, বুক ও দুই হাতসহ ৩৫ শতাংশ ঝলসে যায় তাঁর।
৩ মেয়ে ১ ছেলের জনক তিনি। বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার জিরতলী ইউনিয়নে। ছেলে রাকিব দশম শ্রেণির ছাত্র। সততা ও নিষ্ঠার সাথে চাকুরি করেছেন। ইচ্ছে ছিল রাকিবকে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী বানানোর।
রাকিব বাংলানিউজকে বলেন, চিকিৎসকরা একেক বার একেক কথা বলছে। বারবার শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দুই পাশের দুই বেডে, বুধবার বাবু ও মঙ্গলবার সাত্তার মারা গেছেন। ওদের যে অবস্থা ছিল বাবারও একই অবস্থা। বাবা মরে গেলে পরিবারে অন্ধকার নেমে আসবে।
সেনেটারি ব্যবসায়ী আবু তালহা
আবু তালহা (৪২) সেনেটারি ব্যবসায়ী। বাড়ি মেহেরপুর। রাজধানীর সিদ্দিক বাজারে কাজ করেন। ২৮ নভেম্বরে মিরপুরে মায়ের জন্য ঔষধ নিয়ে যাচ্ছিলেন। পেট্রোল বোমায় শ্বাসনালী, ফুসফুস ও খাদ্য নালীসহ ৩০ শতাংশ পুড়ে যায়।
তার ভাগিনা বদরুল বাংলানিউজকে বলেন, চতুর্থ তলা পোস্ট অপারেটিভ থেকে মামাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে। বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসক বলেছে, বাঁচার আশা ফুরিয়ে যাচ্ছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাংলানিউজকে তিনি বলেন, মামা শুধু মা মা (নানী) কে ডাকছে। মায়ের দামি দামি ঔষধ লাগে। মামা নানীর জন্য কয়দিন পরপরই ঔষধ নিয়ে যায়। মামা না থাকলে নানীকে দেখবে কে?
আইসিইউ প্রধান ড. শাহ আলম আবু তালহা সম্পর্কে বাংলানিউজকে বলেন, রোগীর অবস্থা মুহূর্তে পরিবর্তন হচ্ছে। কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র (লাইফ সার্পোট) মাঝে মাঝে কাজ করছে না। মেডিকেল বোর্ড নিবিড় পর্যবেণে রাখছে তাকে।
হিসাবরক জাহাঙ্গীর আলম
জাহাঙ্গীর আলম (৪৫) শরীয়পুর জেলার গোসাইয়া উপজেলার হিসাবরক। পরিবার নিয়ে থাকেন মিরপুরে। শাহবাগে আগুনে শ্বাসনালী, ফুসফুসসহ ১০ শতাংশ পুড়ে গেছে।
পোড়ার পরিমাণ কম হলেও শ্বাসনালী সম্পূর্ণ তিগ্রস্ত হওয়ায় কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র (লাইফ সার্পোট) দিয়ে রাখা হয়েছে। এছাড়া শরীরের অন্যান্য রোগ থাকায় বাঁচার আশা কম।
আইসিইউ প্রধান ড. শাহ আলম বাংলানিউজকে জাহাঙ্গীরের চিকিৎসা সম্পর্কে জানান, শরীরে অন্যান্য রোগ থাকায় ঔষধ টানছে না। কৃত্রিম শ্বাসনালীও মাঝে মাঝে বন্ধ হয়ে যায়। তবে নিবিড় পর্যবেণে রাখা হয়েছে।
বেসরকারি চাকুরিজীবী রাহাজুল ইসলাম
রাহাজুল ইসলাম (২৬) রাজধানীতে একটি ইলেকট্রিক ফ্যান কোম্পানিতে চাকুরি করতেন। তিনি পাবনার রাজাপাড়া উপজেলার রফিকুল ইসলামের পুত্র।
তেজগাঁও রাজাবাজারে থাকতেন। ২৮ নভেম্বর শাহবাগে বাসে ছোড়া পেট্রোল বোমায় মুখ, শ্বাসনালী, হাত, ফুসফুসসহ ২৫ শতাংশ পুড়ে যায়। বর্তমানে বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র (লাইফ সার্পোট) দিয়ে রাখা হয়েছে।
আইসিইউ’র সামনে দাঁড়ানো রাহাজুলের এক আত্মীয় বাংলানিউজকে বলেন, রাহাজুল পরিবারের একমাত্র উপার্জনম। বাবা এত দরিদ্র যে এ ক’দিনে ঔষধ কেনার টাকা ধার করেছেন। ছেলেটা চলে গেলে না খেয়ে থাকতে হবে। চিকিৎসরা বারবার বলছে, অবস্থার অবনতি হচ্ছে।
আইসিইউ প্রধান ড. শাহ আলম বাংলানিউজকে জানান, কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র দিয়ে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। শ্বাসনালী তিগ্রস্ত হওয়ায় বেশ সমস্যা হচ্ছে। মেডিকেল বোর্ড নিবিড় পর্যবেণে রাখছে তাকে।
বার্ন ইউনিটের পরিচালক সামন্ত লাল সেন বাংলানিউজকে বলেন, ২৬ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের পর থেকে পেট্রোল বোমা ও গানপাউডারে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে এ পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ৫৩ জন।
এরমধ্যে ১১ জন মারা গেছেন। যে চারজন আইসিইউতে আছে তাদের অবস্থাও আশংকাজনক। অন্য যারা আছে তারাও যে আশংকামুক্ত তা নয়।
তিনি বলেন, পোড়া অল্প হোক আর বেশি হোক সব সময় আশঙ্কাজনক। মেডিকেল বোর্ড গঠন করে নিবিড় পর্যবেণে রেখে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।
তিনি আরো বলেন, পোড়া রোগীরা একটি ‘মানসিক’ আতঙ্কে থাকে। এদের মধ্যে যারা বাঁচবে তাদেরকে দীর্ঘদিন ধরে সাইকোজিক্যাল চিকিৎসা দেওয়ার দরকার হবে।
শুধু চারজন নয় পোস্ট অপারেটিভ ইউনিটে যারা ভর্তি আছে তাদের মধ্যেও বেশ ক’জন আশংকাজনক। যেকোন মুহূর্তে তাদের আইসিইউতে ভর্তি করা হতে পারে।
এভাবে অগ্নিদগ্ধদের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। আর ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিট স্বজন হারানোদের আহাজারি ও আর্তনাদের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।

শেয়ার