খুলনায় গৃহপরিচারিকা শিশু’র ওপর পুলিশকর্তার স্ত্রী’র মধ্যযুগীয় নির্যাতন

sisu
খুলনা ব্যুরো॥ মাত্র ৬ বছরের শিশু শান্তা। কথিত পুলিশ মামার বাসার কাজের ঝি এই শিশুটি। ভালো-মন্দ বোঝার বয়স বা ক্ষমতা এখনো কিছুই তার হয়নি কিন্তু দারিদ্রতার কারণে এই বয়সে তাকে কাজের ঝি হয়ে মধ্যযুগীয় নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। দিনের পর দিন এই নির্যাতন চললেও তা ছিল ঘরের চার দেয়ালের ভেতর বন্দি। শেষ পর্যন্ত যখন একটি চোখ হারানোর যন্ত্রনা তাকে কাতর করে ফেলে তখন পালিয়ে বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে শান্তা। গতকাল গণমাধ্যম ও মানবাধিকারের কর্মীরারা তাকে একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। মধ্যযুগীয় এই নির্যাতনের ঘটনাটি ঘটেছে খুলনা নগরীর মুন্সিপাড়া এলাকায় পুলিশের এক দারোগার ভাঁড়া বাড়িতে। এনিয়ে সর্বমহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, খুলনা কাব সংলগ্ন নগরীর মুন্সিপাড়া এলাকার ডা. হাসানের বাড়ির দ্বিতীয়তলায় পুলিশের দারোগা হাফিজুর রহমান তার স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া থাকেন। এই বাড়িতে মধযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা হচ্ছিল কাঝের ঝি ৬ বছরের শিশু শান্তার ওপর। ২/৩ বছর আগে এই শিশুটিকে ঝিনাইদহের শৈলকূপা থেকে আনা হয়। শান্তা ওই গ্রামের ফরমান আলীর মেয়ে। হতদরিদ্র মা মর্জিনা বেগম শুধুমাত্র দারিদ্রতার হাত থেকে নিস্পাপ শিশুটিকে অন্যের হাতে তুলে দেন। কিন্তু সেখানে শিশুটির উপর চলেছে পৈশাশ্চিক নির্যাতন। দারোগার প্রতিবেশিরা জানান, বাসায় আনার পর থেকে প্রায়ই কারণে-অকারণে দারোগার স্ত্রী শিশুটির ওপর নির্যাতন করতো। এরআগে শিশুটির একটি হাত ভেঙ্গে দেয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তারা। বুধবার সকালে শিশু শান্তার চোঁখের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে আশ্রয় নেয় পাশের একটি বাড়িতে। তার একটি চোঁখ ফুলে ভেতরের অংশ কালো হয়ে গেছে। সম্প্রতি তার চোখে আঘাত করলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। অথচ তাকে কোন ধরণের চিকিৎসা না দিয়ে বাসায় আটক রাখা হয়। এদিকে শিশুটির এ অবস্থায় দেখে বুধবার প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভ করে। খবর পেয়ে মানবাধিকার এবং গণমাধ্যম কর্মীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। তারা জানতে পারেন সেখান থেকে শিশুটিকে জোর করে তুলে আনার চেষ্টা করেন দারোগা। তবে এলাকাবাসির বিক্ষোভ, ওয়ার্ড কাউন্সিলর’র সচিব, আনসার বিডিপি সদস্য, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মীদের চাপেরমুখে পিছু হটেন দারোগা। তারা শিশুটিকে উদ্ধার করে খুলনার ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি করেছে। ভীতসন্তন্ত্র শিশু শান্তা জানায়, ‘তার মামা (এসআই হাফিজুর) কিছু না বললেও মামী (হাফিজের স্ত্রী) তাকে প্রতিনিয়ত মারধর করতো। সে মেরে তার একটা চোখ নষ্ট করে দিয়েছে। প্রতিবেশী রফিকুল ইসলাম শাহীন জানান, ‘সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে এসআই হাফিজ তাঁর বাসা থেকে বেড়িয়ে দৌড়া-দৌড়ি করছেন। কি হয়েছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, তাঁর কাজের মেয়ে চুরি করে পালিয়েছে। তাকে খুঁজছি। এরকিছু সময় পর ৫/৬ বছরের এক শিশুকে স্থানীয় কাউন্সিলরের সচিব আব্দুল করিম ও আনসার ভিডিপি সদস্য মোশারফ পাশের একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার করে। ওর চোখ একটা প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। শরীরের বিভিন্নস্থানে আঘাতের চিহ্ন আছে। হাফিজের স্ত্রী শিশুটিকে সব সময় নির্যাতন করতো বলেও অভিযোগ তার।
বাংলাদেশ মাবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা, খুলনার সমন্বয়কারী এ্যাড. মোমিনুল ইসলাম জানান প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে শান্তার চোঁখে প্রচন্ড আঘাত করার কারণে চোখটি নষ্ট হতে বসেছে। শিশুটি ভয়ে মুখ খুলছে না। দৌড়ে বাসা থেকে বের হয়ে পাশ্ববর্তী বাড়িতে আশ্রয় নেয়ার ঘটনায় নির্যাতনের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। তিনি জানান, শিশুটির পরিবারে খবর দেয়া হয়েছে। অবরোধের কারণে তারা আজ আসতে পারছেন না, শুক্রবারে আসবেন। তারা আসার পর আইনগত পদপে দিলে সহযোগিতা করবে মানবাধিকার সংস্থা। তবে শিশুটির অভিযোগ অস্বীকার করে এস.আই হাফিজুর রহমান জানান, শিশুটি তার চাচাতো বোনের মেয়ে। লালন-পালন করার জন্য ৩ বছর আগে তাকে আনা হয়। তার ওপর কোন নির্যাতন করা হয়নি। সিঁড়ি থেকে পড়ে চোঁখে আঘাত পেয়েছে। তিনি প্রধান অভিযুক্ত স্ত্রী’র নাম জানাতে চাননি। ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার জোর তৎপরতা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন তার প্রতিবেশিরা। তিনি খুলনা সদর থানায় কর্মরত রয়েছেন। ইতোপূর্বে এক যুবককে আটক করে তার ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা উঠিয়ে নিয়ে পুলিশের এই দারোগা আলোচনার শীর্ষে উঠে আসেন।

শেয়ার