একাত্তরে হিন্দুদের মারধর ও লুটের নির্দেশ দেন ইউসুফ

usuf
বংলানিউজ॥ মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমির এ কে এম ইউসুফের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা শুধাংশু ম-ল। তিনি ইউসুফের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ১৩তম সাক্ষী।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ সাক্ষ্য দেন শুধাংশু ম-ল। তার সাক্ষ্যগ্রহণে ট্রাইব্যুনালকে সহযোগিতা করেন প্রসিকউটর জাহিদ ইমাম। সাক্ষ্য শেষে এই সাক্ষীকে জেরা শুরু করেছেন ইউসুফের কনিষ্ঠ আইনজীবী গাজী তামীম। জেরা অসমাপ্ত অবস্থায় সোমবার পর্যন্ত মুলতবি করেছেন চেয়ারম্যান ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল।
শুধাংশু ম-ল তার সাক্ষ্যে আদালতকে বলেন, শান্তি কমিটির এক সভায় এ কে এম ইউসুফ বলেছিলেন, ‘এদেশ হিন্দুদের নয়, এদেশ মুসলমানের। মহিলাসহ হিন্দুদের মালামাল গণিমতের মাল। এ সবাই ভোগ করতে পারে, এতে কোনো অপরাধ নাই’। সবশেষে বলেছিলেন, ‘লোটো পোটো খাও, মালাউন খতম করো’। এ কথা বলার পর পরই নারায়ে তাকবির বলে ইউসুফের সঙ্গের লোকজন রামপাল সদরের যাদব মিস্ত্রির বাড়িতে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি তছনছ করে মালামাল নিয়ে লঞ্চে করে বাগেরহাট চলে যান।
বর্তমানে ৫৯ বছর বয়সী সাক্ষী শুধাংশু ম-ল বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার টেংরামারী গ্রামের একজন কৃষক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি।
সাক্ষ্যে সাক্ষী উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল রামপাল অডিটরিয়ামে শান্তি কমিটির এক সভা চলছিল। বেলা তিনটা/সাড়ে তিনটার দিকে বাগেরহাট থেকে একটি লঞ্চ ৩০-৩৫ জন লোক নিয়ে রামপাল কলেজ ঘাটে এসে ভেড়ে। লঞ্চ থেকে নেমে ওই ৩০-৩৫ জন ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ, এ কে এম ইউসুফ আলী জিন্দাবাদ’ সেøাগান দিতে দিতে অডিটরিয়ামে ঢোকেন।
শান্তি কমিটির ওই সভায় স্থানীয় রজ্জব আলী, মোজাম ডাক্তার, মোসলেম ডাক্তার বক্তব্য দেন। সবশেষ বক্তব্য দেন এ মামলার আসামি এ কে এম ইউসুফ আলী।
সাক্ষী জানান, বক্তব্যে ইউসুফ আলী বলেছিলেন, মালাউন খতম করো, এদেশ হিন্দুদের নয়, এদেশ মুসলমানের। মহিলাসহ হিন্দুদের মালামাল গণিমতের মাল। এ সবাই ভোগ করতে পারে, এতে কোনো অপরাধ নাই। সবশেষে বলেছিলেন, লোটো পোটো খাও, মালাউন খতম করো।
সাক্ষী শুধাংশু ম-ল জানান, এ কথা বলার পর পরই নারায়ে তাকবির বলে ইউসুফের সঙ্গের লোকজন রামপাল সদরের যাদব মিস্ত্রির বাড়িতে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি তছনছ করে মালামাল নিয়ে লঞ্চে করে বাগেরহাট চলে যান।
সাক্ষী বলেন, ১৯৭১ সালের ২১ মে রামপাল থানার ডাকরা কালীবাড়িতে হাজার হাজার হিন্দু এসে আশ্রয় নেন, সেখান থেকে ভারতে চলে যাওয়ার জন্য। এ কে এম ইউসুফ স্থানীয় রাজাকার রজ্জব আলী ও সিরাজ মাস্টারকে নির্দেশ দেন কালীবাড়িতে আশ্রয় নেওয়া হিন্দু লোকজনদের মেরে ফেলার জন্য।
তার এই নির্দেশেই সেদিন ডাকরা কালীবাড়িতে আশ্রয় নেওয়া ৫০০ থেকে ৬০০ হিন্দু ব্যক্তিকে হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সাক্ষী। এই হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া নারায়ন চৌকিদার নামে একজনের নামও উল্লেখ করা হয় সাক্ষ্যে।
সাক্ষী জানান, তাদের এলাকার শান্তি কমিটির নেতা মৃত সিদ্দিক মাস্টার, শাহাদাত কাজী ওরফে বাসার কাজীর কাছে শুনেছেন, ইউসুফের নির্দেশে তারা এ হত্যাকা- ঘটিয়েছেন।
এরপর ১৯৭১ সালে ২২ মে টেংরামারী গ্রামের লোকজনের সঙ্গে সাক্ষী শুধাংশু ম-লও ভারতের বাশরহাটে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানে মা-বাবাকে রেখে চলে যান চাকুলিয়াতে। সেখানে ২৭ দিন মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর আবজাল কমান্ডারের সঙ্গে ৯নং সেক্টর দিয়ে তারা বাংলাদেশে আসেন।
১৯৭১ সালের ১৩ অক্টোবর বাগেরহাট থানার ঘনশ্যাম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি করেন। সেদিনই রজ্জব আলী ফকিরের নেতৃত্বে রাজাকাররা তাদের ঘিরে ফেলে। এ সময় রাজাকারদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল যুদ্ধ হয়। জায়গাটি ঠিক চেনা ছিল না বলে যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা টিকতে না পেরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
সাক্ষী শুধাংশু আরও বলেন, সেখানে একটি সুপারি বাগান ছিল। আমরা ৪/৫ জন মুক্তিযোদ্ধা সেখানে আশ্রয় নেই। পরদিন ভোরে একটি লোক এসে আমাদের বলেন, আপনারা যেখানে আছেন সেখান থেকে নড়বেন না। রাজাকাররা আপনাদের বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় লোককে ধরে চুলকাঠি বাজারে নিয়ে গেছে। সেখানে তাদের হত্যা করা হবে বলে শুনেছি। আপনাদের আমি খবরা-খবর পৌঁছাবো।
সাক্ষী বলেন, ওই লোকটির কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, চুলকাঠি বাজারের কাছে একটি কাঠের ব্রিজের ওপর উঠিয়ে সাত জনকে হত্যা করে রাজাকাররা। শহীদদের মধ্যে বিজয় দাশ এবং সুনীলের নাম ওই ব্যক্তি তাকে বলেছিলেন।
সাক্ষী বলেন, যে লোকটি আমাদের কাছে খবর সরবরাহ করেছিলেন, ১৪ অক্টোবর রাতে একটি নৌকায় করে তিনিই আমাদের বটিয়াঘাটা পৌঁছে দেন।
সাক্ষী তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানান। এ সময় আসামির কাঠগড়ায় থাকা এ কে এম ইউসুফকে সনাক্ত করেন সাক্ষী।

শেয়ার