মনোনয়ন পাননি ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্টরা

বাংলানিউজ ॥ নয়ন ফরম কিনে জমা দিলেও তাদের কাউকেই মনোনয়ন দেয়নি ক্ষমতাসীন দলটি। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন কিনা, সে বিতর্ক থাকলেও মনোনয়ন প্রত্যাশীরা বলছেন, তাদের নির্বাচন করতে কোনো বাধা ছিল না।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য তদন্ত সংস্থার দু’জন তদন্ত কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রপক্ষের ৬ জন প্রসিকিউটর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তারা দলের মনোনয়ন ফরম কিনে জমাও দেন। তারা সবাই বলেছিলেন, নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন পেলে তারা ট্রাইব্যুনাল থেকে পদত্যাগ করবেন। তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক মো. আবদুল হান্নান খান নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা) আসন ও সহ সমন্বয়ক এম সানাউল হক কিশোরগঞ্জ-৩ (তাড়াইল-করিমগঞ্জ) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনোনয়ন ফরম কিনে জমা দেন।
প্রসিকিউটরদের মধ্যে সুলতান মাহমুদ সীমন শরীয়তপুর-২ (নড়িয়া-সখীপুর) আসন, মোখলেসুর রহমান বাদল কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসন, নূরজাহান বেগম মুক্তা চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) আসন, মোহাম্মদ আলী ঢাকা-২০ (ধামরাই) আসন, আবুল কালাম পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসন এবং সৈয়দ সায়েদুল হক হবিগঞ্জ-৪ (চুনারুঘাট-মাধবপুর) আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন আবদুল হান্নান খান। তিনি ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নেত্রকোনা-৫ আসন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। সেবার তিনি ১৮ হাজার ভোট পেয়ে পরাজিত হন। ২০০০ সালে ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজি পদ থেকে তিনি অবসরে যান। ২০১১ সালে তাকে মানবতাবিরোধী তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন নড়িয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি পরাজিত হন। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মোখলেসুর রহমান বাদল কিশোরগঞ্জের উপজেলা পাকুন্দিয়া আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। নূরজাহান বেগম মুক্তা মহিলা আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। বাংলাদেশ কৃষক লীগের সাবেক সহ সভাপতি মোহাম্মদ আলী বর্তমানে আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সভাপতিম-লীর সদস্য। সৈয়দ সায়েদুল হক ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সম্পাদক ছিলেন।
শুক্রবার ৩০০ আসনে আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হলে দেখা গেছে, মনোনয়ন প্রত্যাশী ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও তদন্ত সংস্থার তদন্ত কর্মকর্তাদের কেউই মনোনয়ন পাননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আইন বিশেষজ্ঞ বাংলানিউজকে বলেন, তারা মনোনয়ন না পাওয়ায় এ নিয়ে যে বিতর্ক উঠেছিল, তা বন্ধ হবে। একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক মহলের মুখ বন্ধ হবে, অন্যদিকে তেমনি দেশীয় নিন্দুকের মুখেও তালা পড়বে।
তিনি আরও বলেন, তাদের মনোনয়ন না দিয়ে আওয়ামী লীগ ঠিকই করেছে, সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। প্রসিকিউশন এবং রাজনীতিকে মেলানো ঠিক নয়। নির্বাচন করার ইচ্ছা নিয়ে এখানে কাজ করা যাবে না, আশা করি, তারাও এখন বুঝতে পারবেন।
মনোনয়ন প্রত্যাশী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান বাংলানিউজকে বলেন, নির্বাচন করার জন্য মনোনয়ন চেয়ে পাইনি। অথচ আমাদের নির্বাচন করতে আমাদের কোনো বাধা ছিল না।
তিনি বলেন, অযথাই আমাদের মনোনয়ন চাওয়া নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। আমাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু আমি বলতে চাই, আমরা অতীতে কখনো নিরপেক্ষ ছিলাম না, এখনো নেই, ভবিষ্যতেও থাকবো না।
আমি এখনো বুঝি না, আমাদের নির্বাচন করতে সমস্যা কোথায়।
আব্দুল হান্নান খান বলেন, আমি এখনো মনে করি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এবং প্রসিকিউশনের যারা মনোনয়ন চেয়েছেন, তারা অনেক যোগ্য এবং অনেক জনপ্রিয়। যেমন, প্রসিকিউশনে সুলতান মাহমুদ সীমন ও মোখলেসুর রহমান বাদল এবং তদন্ত সংস্থায় আমি নিজে ও সানাউল হক অনেক জনপ্রিয় ও যোগ্য ব্যক্তি, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য একজন মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রসিকিউটর বাংলানিউজকে বলেন, অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও বিডিআর হত্যাযজ্ঞ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি ছিলেন এবং তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল পদমর্যাদার আইন কর্মকর্তা। তিনি এবার মনোনয়ন পেয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা) আসনে। তাছাড়া অ্যাডভোকেট ফজিলাতুন্নেছা বাপ্পি ছিলেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর। এ পদে থেকেই তিনি সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়ন চেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনিও মনোনয়ন পেয়েই পদত্যাগ করেছিলেন, আমরাও করতাম। তাহলে আমাদের মনোনয়ন চাইতে ও পেতে সমস্যা কোথায়? অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও প্রসিকিউশনের সমন্বয়ক এম কে রহমান বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও বিডিআর হত্যাযজ্ঞ মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়ে যাওয়ায় অ্যাডভোকেট আনিসুল হক মনোনয়ন চেয়ে পেয়েছেন। তাছাড়া দেখতে হবে, তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন কিনা। যদি না করেন, তবে তিনি মনোনয়ন চাওয়া ও পাওয়ার অধিকার রাখেন।
তবে এম কে রহমান ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও তদন্ত সংস্থার প্রসিকিউটরদের মনোনয়ন চাইতে ও পেতে আইনগত বাধা নেই উল্লেখ করে বলেন, তারা সার্বক্ষণিকভাবে সরকারি কর্মকর্তা নন। তবে বিষয়টির সঙ্গে নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িত। যেহেতু সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার যোগাযোগ রয়েছে বলে বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে, সেহেতু বিষয়টি মিথ্যা প্রমাণে নৈতিকভাবে তাদের মনোনয়ন প্রত্যাশী হওয়া ও মনোনয়ন পাওয়া ঠিক নয়।

শেয়ার