খেজুর গুড়ের মৌসুমকে সামনে রেখে ভাড় তৈরিতে মণিরামপুরের মৃৎ শিল্পীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
মোতাহার হোসেন, মণিরামপুর॥ খেজুর গুড়ের মৌসুমকে সামনে রেখে মণিরামপুরের মৃৎ শিল্পীরা এখন ভাড় (খেজুর রস,গুড় সংরক্ষণের জন্য পাত্র) তৈরীতে ব্যস্ত সময় পার করছে। পাল সম্প্রদায়ভুক্ত অনেকেরই আজ আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই এ শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তারপরেও উপজেলার রাজগঞ্জ, মশ্মিমনগর, হাজরাকাটি, মধুপুর, ভরতপুর, চিনাটোলা গ্রামসহ কয়েকটি গ্রামের মৃৎ শিল্লীরা বংশপরমপরায় বাপ-দাদার এ আদি পেশাটি আঁকড়ে ধরে আছেন। ইতিমধ্যে গাছিরা গুড় উৎপাদনে রস আহরণের জন্য খেজুর গাছ তোলা প্রায় শেষ পর্যায়ে। মাত্র কয়েকদিন পরেই গুড় উৎপাদনে ব্যস্ত হয়ে পড়বে তারা। এজন্য গাছিদের প্রয়োজনীয় উপকরণ ভাড়ের যোগান দিতে মৃৎ শিল্পীদের দিন-রাত এখন একাকার।
সরেজমিন উপজেলার ভরতপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গৃহবধূ বাসন্তী তার অশীতিপর শাশুড়িকে নিয়ে এক মনে হাতের কারুকার্যের নিখুঁত ছোঁয়ায় ভাড় তৈরী করে চলেছেন। ছাঁচে ভাড় তৈরীর নান্দনিক দৃশ্যটি খুবই মনোমুগ্ধকর। ভাড় বানানোর দৃশ্য অবলোকনের জন্য যে কেউ থমকে যাবেন। তাদের মত ওই এলাকার পাল পাড়ায় প্রতিটি বাড়ির নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই ভাড় তৈরীতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কারো সাথে এতটুকু কথা বলার সময় নেই তাদের। তবুও কাজের ফাঁকে ফাঁকে কথা হয় ভাড় তৈরীতে ব্যস্ত গোপাল, মহারানী, বাসন্তী, শিবপদসহ কয়েকজনের সাথে। ভাড় তৈরীর কাজে শুধু পুরুষ সদস্যই না বাড়ীর গৃহিনী থেকে শুরু করে ছেলে-মেয়েরাও পড়ালেখার ফাঁকে তাদের বাবা মায়ের কাজে সাহায্য করছে। মৃৎ শিল্পী শিবপদ এ প্রতিবেদককে জানান, ভাড় তৈরীর প্রধান উপকরণ এঁটেল মটি যা দূরের মাঠ থেকে সংগ্রহ করে বাড়িতে এনে তা পানি দিয়ে ভিজিয়ে কোদাল দিয়ে কয়েকবার ঝুরঝুরে করা হয়। এর পর পা দিয়ে ছেনে মন্ড আকারে প্রস্তুত করা হয়। প্রস্তুতকৃত মন্ড বোলে দিয়ে বালির সংমিশ্রনে মটি চাপড় বানানোর পর ছাঁচে দিয়ে হাতের কারুকার্য দিয়ে ভাড়ের কানা সহ ভাড়ের উপরিভাগ তৈরী করা হয়। এই ছাঁচে ভাড়ের নীচের অংশ তৈরির পর পৃথক দুটি অংশকে জোড়া লাগিয়ে ২’দিন রোদে শুকানো হয়। রোদে শুকানো ভাড়ে রং লাগিয়ে পাজায় (আগুনে) ৫ ঘন্টাব্যাপী পোড়ানোর পর তৈরীকৃত ভাড় ব্যবহার উপযোগী হয়। তৈরিকৃত ভাড়ে কানাস (দড়ি) লাগিয়ে গাছিরা খেজুর গাছে রস আহরণের জন্য ব্যবহার করে থাকে। মৃৎ শিল্পী বাসন্তি বলেন, প্রতিদিন তিনি ও তার শাশুড়ি মিলে ৪০ থেকে ৫০টি ভাড় তৈরি করতে পারেন। অশীতিপর বয়োবৃদ্ধা ভাংগা-ভাংগা কন্ঠে বলেন, মূলত: দু’ধরনের ভাড় তারা তৈরি করে থাকেন। একটি গেছো ও অন্যটি গুড়ে ভাড়। মৃৎ শিল্পী পরিতোষ বলেন, প্রতিটি ভাড় পাইকারি ৫ টাকা ও খুচরা ৬ টাকা করে বিক্রি করা হয়। এভাবে শ’খানেক ভাড় বিক্রি করে ১’শ থেকে ১’শ ৫০ টাকা লাভ করে থাকেন তারা।

শেয়ার