আত্মচিৎকারে ভারি হয়ে উঠছে বার্ন ইউনিট

বাংলানিউজ॥ বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ডাকা পর পর ৩ বারের হরতালে যানবাহনে দেওয়া আগুনে দগ্ধ রোগীদের আর্তচিৎকারের ভারি হয়ে উঠেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিট।
ঢামেকের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের বার্ন ইউনিটে এ পর্যন্ত ৬০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এর মধ্যে ৬ জন মারা গেছেন ও ১৫ জন এখনো চিকিৎসাধীন।
বার্ন ইউনিটের এইচডিইউ, আইসিইউ ও পোস্ট অপারেশন ইউনিটে অগ্নিদগ্ধ যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের কারও হাত, কারও পা, কারও আবার পুরো শরীর ঝলসে গেছে। তাদের আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে উঠেছে পুরো ইউনিটের পরিবেশ। যন্ত্রণা যেন কিছুতেই প্রশমন হতে চায় না।
৩ নভেম্বর দাদি রহিমার (৫০) সঙ্গে নেত্রকোনা থেকে উত্তরায় ফুফুর বাসায় বেড়াতে আসে ৮ বছরের সুমি। তাদের বহনকারী বাস গাজীপুরের চৌরাস্তায় পৌঁছাতেই হঠাৎ ১০ থেকে ১৫ জন পিকেটার প্রথমে লাঠিসোটা দিয়ে বাসের কাঁচ ভাঙতে থাকে। এরপর পেট্রোল দিয়ে আগুন দেয় বাসটিতে। যাত্রীরা দ্রুত বের হতে থাকে বাস থেকে। বাসের মাঝামাঝি সিটে দাদির পাশে বসে থাকা সুমি যাত্রীদের হুড়োহুড়িতে সিটের নিচে পড়ে যায়। সুমিকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন তার দাদি।
কিন্তু এর মধ্যে পুরো বাসে আগুন ছড়িয়ে যেতে থাকে। আগুনের লেলিহান শিখায় সুমির ডান হাত ও ডান পাসহ শরীরের প্রায় ১২ ভাগ পুড়ে যায়। বাদ পড়েন না দাদিও। তার ঘাড় ও শরীরের ১৫ ভাগ ঝলসে যায়। তাই সুমির ঠিকানা এখন ফুফুর বাসা না হয়ে ঢামেকের বার্ন ইউনিটে হয়েছে।
অগ্নিদগ্ধ সুমির পাশে বসে থাকা মা হালিমা বেগম বাংলানিউজকে জানান, সুমি হাত-পা নাড়াতে পারে না। অসহ্য যন্ত্রণায় রাতে ঘুমাতেও পারে না। ঘা এখন একটু শুকানোর কারণে যন্ত্রণা কিছুটা কমেছে। তবুও মাঝে মাঝেই যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকে সে।
সুমির মার অভিযোগ, সুমি দেশের রাজনীতি বা হরতাল কোনোটাই বোঝে না, তবে কেন হরতালের কারণে সুমিকে আগুনে পোড়ানো হলো? তার জীবন নষ্ট করা হলো কেন?
অভাবের কারণে বাবার সঙ্গে সংসারের হাল ধরতে টেম্পো (লেগুনা) হেলপারের কাজ করতো ১৩ বছরের মিলন। ১০ নভেম্বর ধানমন্ডি-১৫ নম্বরে লেগুনাতে আগুন দেয় হরতাল সমর্থকরা। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো লেগুনায়। সামনে ড্রাইভারের পাশে বসার কারণে বের হতে পারেনি মিলন। এরপর লোকজন মিলনকে টেনে গাড়ি থেকে বের করে বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসে। আগুনে মিলনের শরীরের ১৭ ভাগ পুড়ে যায়। পিঠের অংশে বেশি পুড়ে যাওয়ায় সব সময় তাকে উপুর হয়েই থাকতে হয়।
এভাবে সুমি, রহিমা আর মিলনের মতো হরতালের আগুনে পোড়া অনেকেরই ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চিত।
এদিকে, অগ্নিদগ্ধদের সাহায্য করতে সরকারের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে। রোগী প্রতি ২০ হাজার টাকা অর্থ সহয়তা দিয়েছে সরকার। তবে চিকিৎসা ব্যয় বহনে এ টাকা খুবই কম বলে জানিয়েছেন রোগীদের স্বজন।
স্বজনরা বাংলানিউজকে জানান, চিকিৎসার জন্য সব ওষুধ বার্ন ইউনিট থেকে দেওয়া হয় না। দামি ওষুধ আর ইনজেকশন হাসপাতালের বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনতে হয়। এতে কয়েকদিনেই সরকারের দেওয়া টাকা শেষ হয়ে গেছে। এরই মধ্যে অনেকের চিকিৎসায় ৬০ থেকে ৯০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
তাই মানবিক আবেদন নিয়ে দেশের বিত্তশালীদের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছেন তারা।
এ বিষয়ে ঢামেক বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল বাংলানিউজকে বলেন, অগ্নিদগ্ধ রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা, ওষুধ ও খাবার হাসপাতাল থেকেই দেওয়া হয়। কিন্তু বেশকিছু ওষুধ রোগীর স্বজনদের কিনতে হয়। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপরে কিছু করার থাকে না।

শেয়ার