দেবহাটায় আ’লীগ নেতা আবু রায়হান হত্যার ঘটনায় শিবির ক্যাডার মনিরুলসহ গ্রেফতার ১৭॥ ওসি প্রত্যাহার

satkhira
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ॥ সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু রায়হান (৩৮) কে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় হত্যা মিশনে নেতৃত্বদানকারী শিবির ক্যাডার মনিরুল ইসলামসহ ১৭জনকে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতভর পুলিশ বিজিবি’র যৌথ কম্বিং অপারেশনে আশপাশের কয়েকটি গ্রাম থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। আবু রায়হান হত্যার সাথে জড়িত দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার মনিরুল ইসলাম মনি ছাড়াও এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজন হিসেবে আটককৃতরা হচ্ছেন আমজাদ হোসেন, ফিরোজ আলম, সোহরাব হোসেন, শহিদুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, আবদুর রহিম, আবদুল হামিদ, নাজমুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ আল মামুন, রবিউল ইসলাম, আফসার আলি, নবাব আলি, আলম ও মনিরুজ্জামান। তাদের সবার বাড়ি দেবহাটার নারকেল বাড়িয়া, চন্ডিপুর ও সখিপুর গ্রামে। ধৃতরা জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সাথে প্রত্যভাবে জড়িত বলে পুলিশ জানিয়েছে। এদিকে আ’লীগ নেতা আবু রায়হানকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে দেবহাটা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কেরামত আলীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মনিরুজ্জামান শুক্রবার দুপুরে তাকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। সাতীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী ঘটনা নিশ্চিত করে জানান, ওসি কেরামত আলীকে প্রত্যাহার করে তদস্থলে মোফাজ্জল হোসেনকে ঐ থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
প্রত্যদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে আবু রায়হান কয়েকজন লোকজন নিয়ে দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া বাজারের গোলচত্বরে মোমেনা বস্ত্রালয়ের সামনে বসে কথা বলছিল। এ সময় ১০-১২ জন মুখোশধারী সন্ত্রাসী রাম দা নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে এসে তাকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। দুর্বৃত্তদের প্রত্যেকের হাতে রাম দা ছিল। আশপাশের শতাধিক লোক এসব দৃশ্য দেখলেও প্রাণভয়ে কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে সাহস পায়নি। এক পর্যায়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে দুর্বৃত্তরা তার মৃত্যু নিশ্চিত করে স্লোগান দিতে দিতে বীর দর্পে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
এই হত্যাকান্ডের মাত্র ১৫ মিনিট আগে দেবহাটা-কালিগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) লস্কর তাজুল ইসলাম ও দেবহাটা থানার ওসি কিরামত আলী আওয়ামী লীগ নেতা আবু রায়হানের সাথে পারুলিয়া বাজারের গোলচত্বরে বসে কথা বলেছিলেন। আবু রায়হানের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার কয়েক মিনিট পরেই তার ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওই বাজারে সন্ধ্যা ৭টা থেকে দেবহাটা থানার এসআই শফিকের নেতৃত্বে পুলিশের ১০ সদস্যের একটি দলের ডিউটিতে থাকার কথা ছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারনে সেখানে পুলিশের কোন সদস্য ঘটনার সময় ডিউটিতে ছিলেন না। এ কারনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
নিহতের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, জামায়াত-শিবির সমর্থকরা কয়েক মাস আগে থেকেই তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। কিছুদিন আগে জামায়াত-শিবির সমর্থকরা সখিপুর বাজারে আবু রায়হানের ব্যক্তিগত অফিসে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা জেলার কয়েক জন রাজনীতিক, সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধিকে হত্যার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে সম্প্রতি এ ধরনের খবর ছড়িয়ে পড়ে। ওই তালিকায় আবু রায়হানের নাম ছিল বলেও বেশ কিছুদিন প্রচার পায়। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য বলা হয় রাজনীতিক ও সাংবাদিকদের প থেকে। কিন্তু দৃশ্যমান কোন পদপে নেয়নি আইন-শৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েক জন নেতা জানান, সাতীরায় পুলিশ সম্প্রতি জামায়াত ইস্যুতে বেশ নমনীয়। গত ২৮ ফেব্র“য়ারি জামায়াত-শিবির সাতীরা শহরের কদমতলা এলাকায় হামলা চালিয়ে নৃশংসভাবে খুন করে ছাত্রলীগ নেতা প্রভাষক মামুনকে। এরপর তারা জেলাব্যাপী একের পর এক নারকীয় তান্ডব চালালেও পুলিশ জামায়াত-শিবিরের উল্লেখযোগ্য কোন নেতাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। গত ১ মাস আগে থেকেই সাতীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী নূরুল হুদাসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জামায়াত-শিবির নেতারা প্রকাশ্যে মিছিল-মিটিং, সমাবেশ ও নাশকতার ঘটনা অব্যাহত ভাবে ঘটাচ্ছে।
নিহত রায়হানের স্ত্রী স্কুল শিকিা শিউলি বেগম বলেন, জামায়াত-শিবির আমার স্বামীকে হত্যার জন্য আগে থেকেই চেষ্টা করছে। রায়হান বার বার পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছে। জামাত-শিবির রায়হানকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করেছে। পুলিশ পদপে নিলে আমার স্বামীকে এভাবে জীবন দিতে হতো না। তিনি আরো জানান, আমি আমার স্বামী হত্যার ঘটনায় কোন মামলা করতে চাইনা। আমার দুই শিশু সন্তানসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যের নিয়ে আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছি। তিনি ােভ প্রকাশ করে লাশের ময়না তদন্তে বাধা দিলেও পরে করা হয়েছে। পুলিশ আগে থেকেই এই হত্যার পরিকল্পনার কথা জানতো বলে তার অভিযোগ।
রায়হান ২ বোনের একমাত্র ভাই। তার পিতা আগেই মারা গেছেন। বৃদ্ধা মা সম্প্রতি হজ্ব করে দেশে ফিরেছেন। তার ২ ছেলের মধ্যে বড় ছেলের জেএসসি পরীা চলছে। শুক্রবারও তার পরীা ছিল। ছোট ছেলের বয়স মাত্র ৪ বছর। দুই বোনের স্বামী মারা গেছে। তারা দুজনই বর্তমানে বিধবা। পুরো পরিবারকে একমাত্র রায়হান দেখভাল করতেন। স্ত্রী ও সন্তানেরা লাশ দেখার পর বার বার মুর্ছা যাচ্ছে। তাদেরকে শান্তনা দেয়ার মত আপন বলতে কেউ পাশে নেই। আওয়ামী লীগের রাজনীতির জন্য রায়হান ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। সদ্য বিদায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রী ডা: আ ফ ম রুহুল হকের খুব কাছের মানুষ হিসেবে রায়হান অতিপরিচিত ছিলেন। ডা: হকের নিজ নির্বাচনী এলাকায় রায়হানের বাড়ি। বৃহস্পতিবার রাতে রায়হানের গ্রামের বাড়ি পারুলিয়ায় গিয়ে দেখা গেছে আশপাশের ১৫ থেকে ২০ জন মানুষ এবং কয়েক জন পুলিশ ছাড়া ওই বাড়িতে আওয়ামী লীগের কোন নেতারা শোকাহত পরিবারের পাশে নেই। সাতীরা জেলা আওয়ামী লীগ বা দেবহাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের প থেকে এই নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে শুক্রবার পর্যন্ত কোন কর্মসূচী ঘোষনা করা হয়নি। এতে আওয়ামী লীগের কর্মীদের মাঝে ব্যাপক ােভ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবারের আপত্তির কারনে শুক্রবার বিকাল (৩টার পরে) লাশের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর সন্ধ্যায় জানাযা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এরিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পবিরারের প থেকে কোন মামলাও করেনি।
সাতীরা পুলিশ সুপার মোল্যা জাহাঙ্গির হোসেন জানান, আটককৃত ১৭ জনের মধ্যে মনিরুল ইসলাম নামের এক শিবির ক্যাডার এই হত্যা মিশনে সরাসরি অংশ নিয়েছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। সে দেবহাটার সখিপুর গ্রামের নূরুল ইসলামের ছেলে। এলাকায় পুলিশ অস্থায়ী ক্যাম্প বসিয়েছে। জামায়াত-শিবিরের হত্যার মিশন এবং পুলিশের গাফিলতির বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে, খুলনা রেঞ্জের ডিআইডি মনিরুজ্জামান রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদেরকে জানান, জামায়াত-শিবির চক্র পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করার জন্য জামায়ত-শিবির চক্র এ ধরনের নাশকতার পথ বেঁছে নিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরো বলেন, এই হত্যাকান্ডের ঘটনানায় পুলিশের কোন ধরনের গাফিলতি আছে কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮ টার দিকে দেবহাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু রায়হানকে পারুলিয়া বাজারে জামায়াত-শিবিরের মুখোশধারী ক্যাডাররা রাম দাঁ দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এ ঘটনায় এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সর্বশেষ আবু রায়হান কে কুপিয়ে হত্যার পর এই নিয়ে রক্তাত্ব জনপদ দেবহাটায় ৩ জন আওয়ামী লীগ নেতাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হল। গত ৩ মাসে নিহত অপর দুই জন সখিপুরের আব্দুল আজিজ ও পারুলিয়ার আলমগীর হোসেন।

শেয়ার