সূচের ফোঁড়ে রঙিন স্বপ্ন

indrojit
ইন্দ্রজিৎ রায়॥
নকশা অনুযায়ী কাপড়ের জমিনে অবিরাম সূচের ফোঁড় দিয়ে চলেছেন নূর জাহান আক্তার খুশি (২৮)। তিনি হাতের স্পর্শে এক একটি ফোঁড়ে স্বপ্ন বুনে চলেছেন। অন্য দশজন নারীর চেয়ে একটু আলাদা খুশির স্বপ্ন। কাপড়ের জমিনে রঙিন সুতোয় সূচের ফোঁড়ের মতই তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে স্বাবলম্বী হতে চান।
তার সাথে কথা হয় শুক্রবার যশোর চারূপীঠ আর্ট রিসোর্স ইন্সটিটিউটে। চারূপীঠ ও ফোঁড় ক্রাফটস আয়োজিত সূচি শিল্প প্রতিযোগিতার ফাইনাল পর্বের ২৮ জনের মধ্যে তিনিও একজন। যশোর শহরতলীর খোলাডাঙ্গা এলাকার মৃত রবিউল ইসলামের বড় মেয়ে নূর জাহান আক্তার খুশি। প্রতিবন্ধকতাকে আলিঙ্গন করেই তার জন্ম। দুই হাত ও দুই পা থেকেও না থাকার মত। তাঁর হাত পায়ের আঙুল স্বাভাবিকের তুলনা অনেক চিকন। তবুও বাবা মা আনন্দিত ছিলেন। জন্মের পর বাবা মা তার নাম রেখেছেন খুশি। তবে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে খুশিকে সামলাতে হচ্ছে নানা প্রতিকূলতা। শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারণেই তার স্কুলে যাওয়া হয়নি। তবে স্ব-শিক্ষিত। নিজে পড়তে ও লিখতেও পারেন।
নূর জাহান আক্তার খুশি বলেন, বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। ১০ বছর আগেই বাবা মারা গেছেন। তার মৃত্যুর পর থেকে ৩ ভাই বোনের অনিশ্চিত ভবিষতের দিকে চলা শুরু হয়। পিতাার পেনশনের টাকায় চলছে সংসার। নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য সেলাই ফোঁড়ের কাজ করছি। ৫ বছর আগে ছোট বোন রাবেয়া আফরিন হাসির কাছ থেকে সেলাইয়ের কাজ শিখেছি। নকশি কাঁথা, শাড়ি, জায়নামাজ, পাঞ্জাবি ইত্যাদী সেলাই করে অল্প টাকা আয় হয়। সেই টাকা সংসারের ব্যয় হচ্ছে। তবে এ কাজ করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখি। খুশি আক্ষেপ করে বলেন, ইচ্ছা আছে দোকান করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। কিন্তু ইচ্ছা করলেই তো আর হয় না।’
নূর জাহান আক্তার খুশির বোন রাবেয়া আফরিন হাসি বলেন, আপু আমার কাছ থেকে সেলাই ফোঁড়ের কাজ শিখেছে। তার হাতের কাজ অনেক ভালে। বেশ কয়েকবার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে পুরস্কার পেয়েছে। সহযোগিতা পেলে দুই বোন একটি দোকান করতে পারব।

কপোতাক্ষ জাপানের সহযোগিতায় চারূপীঠ ও ফোঁড় ক্রাফটস আয়োজিত সূচি শিল্প প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী খুশি কিংবা হাসি নয় সবাই সুই ফোঁড়ের কাজকে এগিয়ে নিয়ে স্বাবলম্বী স্বপ্ন বুনেন। তাদেরই আরেকজন মণিরামপুর উপজেলা হরিদাস পুর গ্রামের গৃহবধূ রুহি ইসলাম বলেন,বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে অর্ডার নিয়েই ফোঁড়ের কাজ করছি। একটু দাঁড়াতে পারলে আরও ভালো আয় করা সম্ভব। স্বল্প পরিসরে কাপড়ের জমিনে রঙিন সুতায় সূচের ফোঁড়ে রানফোঁড়, ডালফোঁড়, ক্রসফোঁড়, বেকিফোঁড়, জালিফোঁড় ফুটিয়ে তুলে আয় করছি। তবে গ্রামে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেও মাধ্যমে এলাকার মানুষকে সেলাই ফোঁড়ের প্রশিক্ষণ দিতে চান তিনি।
ফোঁড় ক্রাফটসের স্বত্ত্বাধিকারী শারমিন আক্তার রিপা বলেন, এ অঞ্চলের সেলাই ফোঁড় কাজকে এগিয়ে নিতে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। নারীদেও উৎসাহ দিতেই আমার কাজ করছি। এ ধারবাহিকতা বজায় রাখতে চাই।
চারূপীঠের অধ্যক্ষ মাহবুব জামাল শামীম বলেন, নকশি কাঁথা, শাড়ি নানা ধরণের পোশাক অলঙ্করণে যশোরের সুনাম দুনিয়া জুড়ে। নকশি কাঁথার ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। শহর থেকে গ্রাম সর্বস্তরের নারীদের উৎসাহিত করতেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এই প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্যে হলো নারীদের চিন্তাধারার মধ্যে দিয়ে নকশির আসল চিত্র তুলে ধরা। নারীরা যাতে নিজেই নকশা করে সেলাইয়ের কাজ করতে পারে সেই ব্যবস্থা করা হবে।
প্রসঙ্গত: ১৯ সেপ্টেম্বর যশোর চারূপীঠ মিলনায়তনে চতুর্থবারের মত সূচিশিল্প প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এতে ২১৫জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেন। দুইটি পর্বের বাছাই শেষে শুক্রবার চূড়ান্ত পর্বে ২৮ জন অংশগ্রহণ করেন। ৩০ নভেম্বর এই পর্বের ফলাফল ঘোষণা ও পুরস্কার বিতরণ করা হবে।#

শেয়ার