একাত্তরের কায়দায় লুটপাট আর ধ্বংসযজ্ঞে জামায়াত

sita

বাংলানিউজ ॥
আনুমানিক ৮০ থেকে এক’শ জন জামায়াত-শিবিরকর্মী কিরিচ, রামদা, লাঠি, বন্দুক, পেট্রলের গ্যালন হাতে ককটেল ফাটিয়ে ‘নারায়ে তকবির’ স্লোগান দিতে দিতে হানা দেন সীতাকুন্ডের বাড়বকুন্ড ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা ছাদাকাত উল্লা’র বাড়িতে।
বাড়িতে ঢুকেই প্রথমে নির্বিচারে লুটপাট, তারপর পেট্রল ঢেলে, গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন লাগিয়ে দেন তারা। মুহুর্তেই আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে যায় সবকিছু। এরপর বিজয়োল্লাসে স্লোগান দিতে দিতে এলাকা ত্যাগ করেন জামায়াত-শিবিরকর্মীরা।
শুধু চেয়ারম্যান ছাদাকাত উল্লাহ’র বাড়ি নয়, জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারেরা একই কায়দায় বেশ কিছুদিন ধরে আগুন দিয়ে চলেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহনেও।
স্থানীয়রা বলেন, একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যেভাবে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকাররা মুক্তিকামী বাঙালীর ঘরে ঘরে লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ নৃশংসতা চালিয়েছে একই কায়দায় জামায়াত-শিবির সীতাকুণ্ডেও চালাচ্ছে ধ্বংসযজ্ঞ।
সীতাকুণ্ড থানার ওসি এস এম বদিউজ্জামান বাংলানিউজকে বলেন, ‘শুনেছি জামায়াত-শিবির নাশকতার নিজস্ব বাহিনী গড়ে তুলেছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে নাশকতার জন্য জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের সীতাকুণ্ডে পাঠানো হচ্ছে। কিছুদিন নাশকতা চালানোর পর তারা আবার অন্য জায়গায় পোস্টিং পাচ্ছে।’
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড বাজার থেকে লিংক রোড ধরে আনুমানিক তিন কিলোমিটার দূরে গ্রামের ভেতর চেয়ারম্যান ছাদাকাত উল্লাহ’র বাড়ি। বৃহস্পতিবার ওই বাড়িসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জামায়াত-শিবিরের ধ্বংসলীলার বিভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে।
নিখোঁজ হবার তিনদিন পর বুধবার দুপুরে সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড ইউনিয়ন জামায়াতের আমির আমিনুল ইসলামের লাশ উদ্ধারের পর এ তাণ্ডব চালায় জামায়াত-শিবির।
মা, পালিয়ে যা, ইজ্জত বাঁচা : চেয়ারম্যান ছাদাকাত উল্লাহ’র বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রবেশপথে থাকা গোয়াল ঘর ও বসার ঘর, ছাদাকাত উল্লা ও তার চার চাচার ঘরসহ পাঁচটি ঘর, পার্শ্ববর্তী দু’জন গরিব দিনমজুরের দু’টি ঘর আগুনে পুড়ে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। ছাদাকাত উল্লাহ’র ঘরে ফ্রিজ, টিভি, ওয়াশিং মেশিনসহ মূল্যবান জিনিসপত্র থেকে শুরু করে পুড়েছে খাট, সোফা, আসবাবপত্রও। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ওই বাড়িতে রাখা একটি প্রাইভেট কারও।
ছাদাকাত উল্লাহ’র বড় ভাই শহীদউল্লাহ’র স্ত্রী তাহমিনা আক্তার বাংলানিউজকে বলেন, আমার মেয়ে মিতু জেএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। আমি তাকে নিয়ে স্কুল থেকে ফিরছিলাম। হঠাৎ দুর্লভ দিঘীর পাড়ে দেখি শ’খানেক ছেলে বড় বড় কিরিচ নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে আমাদের বাড়ির দিকে আসছে। এদের মধ্যে কয়েকজন মিতুকে চিনে আমাদের দিকে আসতে থাকে। আমি চিৎকার দিয়ে উঠি, মা, মা তুই পালিয়ে যা। ইজ্জত বাঁচা মা। মিতু দৌড়ে চলে যায়। আমিও দৌড়ে নাথপাড়ায় আশ্রয় নিই। সেখান থেকে দেখতে পাই, আমাদের ঘরে আগুন জ্বলছে।
তাহমিনা জানান, ঘটনার সময় ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল তার তিন শিশু সন্তান ইশতিয়াক, সায়েম ও তানজীব। আকস্মিক চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙ্গে তারা আশ্রয় নেয় আলমিরার উপরে দেয়ালের সঙ্গে থাকা অ্যাটাচড কাঠের বাক্সে। সেখানেও আগুন ধরিয়ে দেয় জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারেরা। হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে ইশতিয়াকের কান পুড়ে গেছে।
ছাদাকাত উল্লাহ’র বড় ভাই শহীদউল্লাহ কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আমার বাবা মাওলানা ছিলেন। আমাদের ঘরে ১৫টি কোরআন শরীফ ছিল। সব পুড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের ঘরে আলমিরা ভেঙ্গে অলংকার, কাপড়চোপড় যা যা পেয়েছে সব লুট করে নিয়ে গেছে। দামি দামি কাঁচের জিনিস ছিল, সব ভেঙ্গে দিয়েছে।
ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত যেভাবে লুটপাট চালিয়েছে এখন তার চেয়েও ভয়াবহ আক্রমণ চালাচ্ছে। এরা নাকি ইসলামের জন্য রাজনীতি করে। কোরআন শরীফে আগুন দিতে কি তাদের বুক একবারও কাঁপল না ?’
ছাদাকাত উল্লাহ’র ভাতিজা শাহরিয়ার কামাল বাংলানিউজকে বলেন, আমার একটি সাইকেল ছিল। যাবার সময় সেটি কাঁধে করে নিয়ে গেছে। আমার পোষা কুকুর ছয়টি বাচ্চা দিয়েছিল। সেগুলো আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। আমাদের একটি গাভি আর তার ছয় মাস বয়সী বাচ্চার শরীরও আগুনে ঝলসে গেছে। ডাক্তার বলেছেন বাচ্চাটি আর বাঁচবে না।
বেঁচে গেলেন ছাদাকাত উল্লাহ :চেয়ারম্যান বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক হানিফ বাংলানিউজকে জানান, জামায়াত-শিবিরের ছেলেরা যখন দা, কিরিচ, লাঠিসোঁঠা নিয়ে তাদের বাড়িতে আক্রমণ করতে আসে, তখন ছাদাকাত উল্লাহ বাড়িতে ছিলেন। খবর পেয়ে তিনি পুকুর পাড় দিয়ে আরেক পাড়ায় গিয়ে আশ্রয় নেন। এর দু’তিন মিনিটের মধ্যেই আক্রমণ হয় ছাদাকাত উল্লাহ’র বাড়িতে।

হানিফ বাংলানিউজকে বলেন, ‘ছাদাকাত ভাইকে পেলে তারা মেরে ফেলত। তারা বাড়িতে ঢোকার পথে আমি সামনে দাঁড়ালে একজন আমাকে কিরিচ দিয়ে কোপদিতেঁ উদ্যত হয়। প্রাণভয়ে আমি দৌড়ে জমির মধ্য দিয়ে পালিয়ে যাই।’

আনুমানিক ৮০ থেকে এক’শ জন লোক চারটি সিএনজি অটোরিক্সা, কয়েকটি মোটর সাইকেলযোগে এবং অনেকে পায়ে হেঁটে ছাদাকাত উল্লাহ’র বাড়িতে আসে বলে হানিফ জানান।

‘তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। তারা ককটেল ফাটাতে ফাটাতে এলাকায় এসেছিল। এতে আতংক সৃষ্টি হয়েছিল গ্রামে। সেজন্য গ্রামবাসী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। আর দুপুর বেলা বাড়িতে কোনো পুরুষ ছিল না।’

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার প্রায় দু’ঘণ্টা পর ছাদাকাত উল্লাহকে পুলিশ নিরাপদে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার মোবাইল বন্ধ থাকায় তা সম্ভব হয়নি।

তবে বাড়বকুণ্ড ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আজিজুর রহমান চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, ‘চেয়ারম্যান সাহেবকে নিরাপদে রাখা হয়েছে। তিনি সুস্থ আছেন। আপাতত তিনি বাড়িতে থাকবেন না।’

আল্লাহ’র কাছে বিচার দিয়েছেন শাহআলম
ছাদাকাত উল্লাহ পাশের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন ভেবে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারেরা শাহআলম নামে এক দিনমজুরের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। সাগরে মাছ ধরে আর কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা শাহআলমের ভিটায় এখন কয়েকটি পোড়া খুঁটি ছাড়া আর কিছুই দেখা যায়নি।

আগুন দেয়ার আগে যথারীতি ওই বাড়িতে লুটপাট চালানো হয়। জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারেরা তার স্ত্রীর বিয়ের শাড়ি যেমন পুড়িয়ে দেয়, তেমনি অন্ধ বাবার চোখের চিকিৎসার জন্য রাখা দশ হাজার টাকাও পুড়িয়ে দেয়।

শাহআলম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাংলানিউজকে বলেন, আমি কোনো পার্টি করি না, মদ খাই না, জুয়া খেলি না। এলাকাবাসীর কাছ থেকে ভিক্ষার মত করে চেয়ে আমি বাবার চিকিৎসার জন্য দশ হাজার টাকা জমা করেছিলাম। আমার ঘরে কোরআন শরীফ পর্যন্ত পুড়িয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমি গরীব মানুষ, নিরীহ মানুষ। আমি আল্লাহ’র কাছে বিচার দিয়েছি। আল্লাহরে বলছি, তোমার নাম বলে যারা আমার ঘরে আগুন দিছে, এই জুলুমের বিচার তুমি কর।’

আমান উল্লাহ’র ভিটায় চরছে কুকুর
ছাদাকাত উল্লাহ’র বাড়ির পাশে গরীব আওয়ামীলীগ কর্মী আমান উল্লাহ’র বাড়ি। ছাদাকাত উল্লাহ’র সঙ্গে আমান মাঝে মাঝে চলাফেরা করেন, তাদের বাজার করে দেন এটাই তার অপরাধ। এ অপরাধে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারেরা মাত্র দেড় মাস আগে বানানো তার তিন ভাইয়ের নতুন ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে।

ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, বাড়িতে মজুদ রাখা নতুন ধান, চাল, খাট, বিছানা, আসবাবপত্রের সঙ্গে পুড়িয়ে দিয়েছে বইপত্র, এমনকি কোরআন শরীফও। আর পোড়া ভিটায় পোড়া চাল খেয়ে ক্ষুধা মেটাচ্ছে একটি কুকুর।

আমান উল্লাহ জানান, ছাদাকাত উল্লাহ’র বাড়িতে আগুন দেয়ার পর দজামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা যখন তাদের বাড়িতে আগুন দিতে আসছিলদ, তখন তিনি দৌঁড়ে পালিয়ে যান। পেট্রল ঢেলে ম্যাচ জ্বালানোর পর মুহুর্তের মধ্যে পুরো বাড়ি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

ছাদাকাত উল্লাহ’র বাড়িতে আগুন দেয়ার সঙ্গে জামায়াত জড়িত নয় বলে দাবি করেছেন উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আবু তাহের। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘নিখোঁজের তিনদিন পর জামায়াতের জনপ্রিয় নেতা আমিনুল ইসলামের লাশ পাওয়া গেছে। সেজন্য এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে চেয়ারম্যানের বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। যে এলাকায় ঘটনা ঘটেছে সেখানে জামায়াতের অবস্থান নেই।’

মহাসড়কেও একই কায়দা
বাড়বকুণ্ড বাজারে দু’টি পোড়া ট্রাক পাহারা দিচ্ছে সাগর গাজী ও আব্দুল কুদ্দুস নামে দু’জন চালক। গত ১৭ নভেম্বর সিলেট থেকে চুনাপাথর নিয়ে তারা যাচ্ছিল চট্টগ্রাম। বাজারে আকস্মিকভাবে তাদের ট্রাক দু’টি ভাংচুর করার পাশাপাশি আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়।

সাগর গাজী বাংলানিউজকে বলেন, হরতাল নাই, কিছু নাই, হঠাৎ আমাদের ট্রাক দু’টি থামানো হল। এরপর তিন-চারজন লাঠি দিয়ে ভাঙচুর শুরু শুরু করে দিল, দু’জন দু’টা ককটেল ফাটাল আর দু’জন এসে আমার কাছে থাকা এক হাজার সাত’শ টাকা আর মোবাইল কেড়ে নিল।

তিনি বলেন, আমাকে ট্রাকের ভেতরে রেখে দরজা আটকে দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছিল। আমি অনেক কষ্টে বাইরে বের হয়ে আসি। বের হওয়ার পর লাঠি দিয়ে আমার হাতে আঘাত করে।

কুদ্দুস জানান, ভাংচুর শুরুর পর তিনি দৌড়ে পালাতে সক্ষম হন।

তিনি বলেন, আমরা এখন গাড়ি নিয়ে সীতাকুণ্ডে ঢুকতে আল্লাহ’র নাম নিয়ে ঢুকি।

সীতাকুণ্ড থানার ওসি এস এম বদিউজ্জামান বাংলানিউজকে বলেন, ‘জামায়াত-শিবিরের এক গ্রুপ ভাংচুর করে, আগুন দেয়। আরেক গ্রুপ লুটপাট চালায়। এটা যে কত ভয়াবহ তাণ্ডব সেটা না দেখলে কল্পনাও করা যাবে না।’

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সীতাকুন্ড উপজেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের বাংলানিউজকে বলেন, ‘জামায়াত আদর্শিক সংগঠন। জামায়াত সন্ত্রাসে বিশ্বাস করেনা, সন্ত্রাস লালন করেনা। জামায়াত হরতাল ডাকলে বা কোন কর্মসূচী দিলে স্বার্থান্বের্ষী কিছু লোক যাদের মধ্যে হিন্দু এবং ছাত্রলীগ কর্মীরাও আছে, তারা ককটেল ফাটিয়ে, গাড়িতে আগুন দিয়ে লুটপাট চালিয়ে আমাদের উপর দোষ চাপায়।’

এর আগে গত রোববার ঢাকা থেকে সীতাকুন্ড ফেরার পথে কুমিল্লা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোক পরিচয়ে কয়েকজন জামায়াত নেতা আমিনুল ইসলামকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তিনদিন তিনি নিখোঁজ ছিলেন। বুধবার সীতাকুন্ডে তার লাশ পাওয়া যায়।

এ ঘটনার জের ধরে বুধবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ি ভাংচুর করে ও আগুন দেয় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। এসময় তারা বাড়বকুন্ড ইউপি চেয়ারম্যান ছাদাকাত উল্লাহ’র বাড়িসহ সাতটি বাড়িতে আগুন দিয়ে ব্যাপক লুটপাট চালায়।

শেয়ার