জামায়াতেই কুপোকাত বিএনপি!

jamait
মাহমুদ মেনন, বাংলানিউজ
রাজনৈতিক কৌশলে, কুটনীতিতে, আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে, আন্দোলনের মাঠে বিএনপির এখন সক্ষমতা কতটুকু এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ধারণা করা হচ্ছে, কেবল জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পর্কের কারণেই সবকদটি ক্ষেত্রে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই দলটি।
এখন জামায়াত-শিবির যদি সঙ্গে না থাকে, সেক্ষেত্রে বিএনপি’র রাজনৈতিক শক্তি কতোটা টিকে আছে সে প্রশ্নটা সামনে চলে আসবে। অনেকের ধারণা, বিএনপি এখন দারুণভাবে জামায়াত-শিবির প্রভাবিত দল। আন্দোলনের মাঠে জামায়াতের কৌশলই এখন বিএনপি’র কৌশল।
একটা সময় ছিলো যখন বিএনপি তার রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োগ দেখাতো জনপ্রিয়তায়, দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের উদ্যমে। এখন জামায়াতের পথ ধরে বিএনপি’র আন্দোলনও জ্বালাও-পোড়াওয়ে সীমাবদ্ধ।
অতীতে রাজপথের মিছিল যে শক্তি দিতো এই রাজনৈতিক দলটিকে তা এখন আর বর্তমান নেই। দলের নেতারা পাঞ্জাবি-পাজামার সঙ্গে কেডস পরে নেমে আসতেন মিছিলে। বিক্ষোভে ফেটে পড়তেন দাবি আদায়ের আন্দোলনে। এখন নেতারা পাঞ্জাবি-পাজামার সঙ্গে কোলাপুরি স্যান্ডেলে পরিপাটি হয়ে কেবলই প্রেস কনফারেন্স করেন। দলের প্রধান নেতারা মিছিলে সামিল হয়ে রাজপথ প্রকম্পিত করছেন স্লোগানে-স্লোগানে — এমন চিত্র গত দুই মাসে দেখা যায়নি।
দেখা গেছে, সকাল-বিকেল পোশাক পাল্টে প্রেস কনফারেন্স করতে। মাঝে কিছু দিন সমাবেশ-মিছিলে নিষেধাজ্ঞা ছিলো। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা যখন উঠে গেলো তখনও কোনো মিছিল নিয়ে কর্মীদের মধ্যে উদ্দীপনা যোগাতে দেখা যায়নি বিএনপি নেতাদের। হরতালের দিনগুলোতে গতানুগতিক ব্রিফিংয়ে সারাদেশে ধর-পাকড়ের হিসাব নিকাশ তুলে ধরেছেন, দিয়েছেন অবাস্তব পরিসংখ্যান। এটুকুই!
বিএনপির এই যে নতুন ধরন, সেটিও জামায়াতেরই ধরন। এই জামায়াতের নেতারা জিন্না কিংবা রুমি টুপি পরে আচকান-পাঞ্জাবিতে সেজে কেবলই নির্দেশ দিতেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তারা গায়ে সামান্য ধুলোর ছোঁয়া না লাগিয়ে দেশজুড়ে রাজাকার-আলবদর বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে খুন-ধর্ষণ আর পৈশাচিক নৃশংসতা চালিয়েছেন। আর সেই সুবাদেই মানবতাবিরোধী অপরাধে এই দলের শীর্ষ নেতাদের নাম আসছে, তাদের অনেকেই এখন বন্দি, বিচার চলছে তাদের। কেউ কেউ এরই মধ্যে দণ্ডিতও।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ডাকসুর নেতৃত্বে থাকা ছাত্রদল বড় ভ’মিকা রেখেছিল। সেই ছাত্রদলের নেতৃত্ব এখন অছাত্র দদচাচামিয়াদেরদদদের হাতে চলে গেছে। ছাত্রদল আজ তাই অনেকটাই বিকলাঙ্গ। অবশ্য এখনো ছাত্রশিবিরের প্রভাবমুক্তই আছে ছাত্রদল। শিবিরের নেতৃত্বে যারা রয়েছে তারা সবাই ছাত্র। এবং তারাই জামায়াতের মূল প্রাণশক্তি।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৮দলের সমাবেশগুলোতে গেলে এই শিবিরের প্রধান্যই চোখে পড়ে। ‘শিবির… শিবির’ উচ্চারণে যে স্লোগান তারা তোলে তা খালেদা জিয়ার বক্তৃতাকেও ছাপিয়ে যায়। মাঠে এমন স্লোগান ছাত্রদলের শক্তিকে ম্লান থেকে ম্লানতর করে দেয়। উল্টো ছাত্র শিবিরের ধাওয়া খায় ছাত্রদল। খালেদা জিয়ার সামনেই মাঠ দখলে ছাত্রশিবির এগিয়ে থাকছে ছাত্রদলের চেয়ে।
সূত্রগুলো বলছে… বিএনপি তথা ছাত্রদলকে শিক্ষা দিতে শিবির মাঝে মঝে ‘রশিতে ঢিলা দেয়’। আর যেখানেই শিবির ঢিলা দেয়, সেখানেই ফ্লপ বিএনপি তথা ১৮ দলের কর্মসূচি।
একটা সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আন্দোলনের পাশাপাশি নৈতিকতাবোধ ও আদর্শিক দিকটা বেশ গুরুত্ব পেতো। জ্বালাও-পোড়াও না করে গণমানুষের অংশগ্রহণের শক্তিকেই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বিএনপিও সেভাবেই চলার চেষ্টা করতো।
অন্যদিকে শিবিরের আন্দোলন গোড়া থেকেই ‘জ্বালাও-পোড়াও-রগকাটো-জবাই করো’ ধরনের। গাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে সাধারণ মানুষ হত্যা করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা, পেট্রোল বোমায় পুড়িয়ে মারা— এসবকিছুই এখন হচ্ছে শিবিরের কুপ্রভাবে।
সাংবাদিক ডেকে, ক্যামেরা ফিট করে আগুন জ্বালানো কিংবা ককটেল ফাটানোর অপকর্মও শিবিরই আগে শুরু করেছে। তাদের দেখাদেখি এখন যুবদল, ছাত্রদলও ‘কল’ (ফোনকল) দিয়ে গাড়ি পোড়ায়।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিএনপির অবস্থা কি সেটা বিশ্লেষণ সাপেক্ষ। সাম্প্রতিক সময়ে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের জয় তাদের মধ্যে এক ধরনের কনফিডেন্স দিয়েছে এটা ঠিক। তবে দলের যারা সত্যিকারের রাজনীতিটি বোঝেন তারা কিন্তু ভালো করেই জানেন, এই ভোট এসেছে বিএনপিকে ভালোবেসে নয়, ক্ষমতাসীনদের নেগেটিভ ভোট। নির্বাচনে জয়-পরাজয়ই আসল বলে যতই সান্ত্বনা দলের নেতারা খুঁজুন না কেন, নেগেটিভ ভোটে জয়ী হওয়ার মধ্যে যে গর্বের কিছু নেই তা-ও তারা ভালোই বোঝেন।
সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়ে বিএনপি আন্দোলন সংগ্রাম যা-ই করুক না কেন, সাধারণ মানুষের ভালোবাসার ভোট পেতে দলটিকে দীর্ঘ পথই পাড়ি দিতে হবে।
শিশু-কিশোরদের পরীক্ষার দিনে হরতাল দিয়ে, দেশজুড়ে জ্বালাও-পোড়াও তাণ্ডব চালিয়ে, পেট্রোল ঢেলে মানুষ পুড়িয়ে বিএনপি জনপ্রিয়তায় আরো এক ধাপ পিছিয়েছে বইকি।
আর এ কাজটিও বিএনপি করেছে জামায়াত-শিবিরেরই প্ররোচনায়। না হলে পাবলিক পরীক্ষায় হরতাল? অথচ এটাই দেখলো দেশ। বিএনপি-জামায়াতের হরতালে পরীক্ষার ফল খারাপ হলো এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের। ও-লেভেলের শিক্ষার্থীদের জীবন থেকেই ঝড়ে গেলো একটি শিক্ষা-বছর। আর এখন জেএসসি-জেডিসি’র ১৯ লাখ পরীক্ষার্থী হরতালের জ্বালা ও ভয় বুকে নিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। দুই দফা পিছিয়েছে তাদের পরীক্ষা। ২৯ লাখ পরীক্ষার্থীর প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। এরই মধ্যে শোনা যাচ্ছে সপ্তাহব্যাপী হঠকারী হরতাল কর্মসূচি নিয়েও নাকি ভাবছে ১৮-দল।
৫০ লাখ পরীক্ষার্থীর পরিবারের মোট আড়াই কোটি মানুষ বিএনপিকে ভোট দেবে কি না, সেটি এখন বিএনপিকেই ভাবতে হবে।
যদি তা না দেয় তাহলে সরকারের বিরুদ্ধে যারা ভোট দিতে চেয়েছিলো তারাইতো এখন বিএনপিকেও ভোট দেবে না।
এতে নির্বাচন তত্ত্বাবধায়কের অধীনেই হোক কিংবা সর্বদলীয় অন্তবর্তী সরকারের অধীনেই হোক, ভোটে জয়ী হওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে বিএনপিকে নতুন করেই হিসাব নিকাশ করতে হবে।
আন্তর্জাতিকভাবে বিএনপি কি কারো আস্থা অর্জন করতে পেরেছে? ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে’ —বিএনপি’র এই কথায় আন্তর্জাতিক মহলও একমত। কিন্তু সে মহল আবার এতেও কনভিন্সড যে এই বিচার দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষেরই প্রত্যাশা।
আর বিএনপি যে জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বাধার কারণেই কেবল এই বিচারের বিরোধিতা করছে না, সে ব্যাপারে তারা আন্তর্জাতিক মহলে আস্থা অর্জন করতে পেরেছে এমনটি কোনো তরফ থেকেই কেউ কখনো বলেনি, বা দাবি করাও সম্ভব হয়নি।
আর দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক সঙ্কট টিকে থাকার পেছনে সরকারের পাশাপাশি বিএনপিকেও যে সমান হিস্যা নিতে হবে তাও হয়তো আন্তর্জাতিক মহলে এতোদিনে স্পষ্ট হয়ে গেছে।
সে কারণেই তিন দিনের সফর শেষে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই আবারও দুই পক্ষের থেকে সমঝোতারই পরমর্শ দিয়েছেন। আর তারা যে দেশে চলমান জ্বালাও-পোড়াও পছন্দ করছেন না তা বোঝাতে বলেই দিয়েছেন, ‘গণতন্ত্রে সহিংসতার কোনো স্থান নেই।
বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে টানা পাঁচ বছর ধরে বিএনপি আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে দফায় দফায় আল্টিমেটামও দিয়েছে। কিন্তু সরকার তার পূর্ণাঙ্গ মেয়াদ শেষ করেই এখন নির্বাচন আয়োজনে ব্যস্ত। পাঁচ বছরেও যখন আন্দোলন সফল হয় না, তখন তা যে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির শক্তিহীনতাই বোঝায় তা বলাই বাহুল্য।
সংশ্লিষ্ট অনেকেরই ধারণা, জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে অতি-মাখামাখির কারণেই বিএনপি এখন এতোটা কোনঠাসা। একজন ঘোর বিএনপি-সমর্থক নাম প্রকাশ না করে বাংলানিউজের কাছে সেই আক্ষেপটাই করলেন।

শেয়ার