আজ সেই ভয়াল সিডরের ছয় বছর ॥ ঘর-বাড়িহারা দুই সহস্রাধিক পরিবার এখনও ঠাঁই পায়নি

Morel
কামরুজ্জামান বাগেরহাট থেকে॥ “ঘরের বেড়া নেই। কোন রকমে কয়েকটা বাশের ঢ্যাশা দিয়ে চালা বানাইয়ে ঘরডা খাড়া করছি। পলিথিন দিয়ে ঘরের চালাডা ঢাকছি। বিষ্টিতে ঘরের মধ্যে পানি ঢোকে। শীতে শোয়া-বসা যায় না। এ অবস্থায় বাচার থেইক্যা মরনও ভ্যালা ছিল। সিডর থেকে বাচলেও এহন ছেলে-মেয়ে নিয়ে আর বাচতে পারছিনে। আমার দুই বিঘে জমি ছিল। তার প্রায় সবই বলেশ্বর নদী গিলেছে। যেটুকুন ছিল তাও সিডরের সময় ঘরবাড়ীসহ নদীতে গেছে। এহন চরের ভিটেই দু’চালা খাড়া করে ছেলে, মেয়ে ও পরিবার নিয়ে কোন রকমে বেচে আছি। কেমনে থাকবো তা একমাত্র আল্লাই জানে।” এ কথাগুলো বললেন শরণখোলা উপজেলার বলেশ্বর নদীর পাড়ের মধ্যপাড়া চরের বাসিন্দা আব্দুল সালাম। এ সময় তিনি অঝোরে কেঁদে ওঠেন। সিডরের ছয় বছর পার হলেও সে তার মাথা গোজার ঠাইটুকু পায়নি। বার বার ইউএনও, উপজেলা চেয়ারম্যান, এনজিও অফিসসহ বিভিন্ন দপ্তরে দৌড়াদৌড়ি করেছেন কিন্তু কেউই মাথা গোঁজার ঠাইটুকু পুনঃনির্মানে সহায়তা করেনি। এখন ঝুপড়ি ঘরের মধ্যে পাঁচ জনের পরিবার নিয়ে বাস করছেন। পেশায় সে একজন দিনমজুর। এ কথা শুধু সাামের নয়। বলেশ্বর নদীর পাড়ের পাচ শতাধিক পরিবার এই অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া ভোলা নদীর চরের পাচ শতাধিক, চাল-রায়েন্দা, রাজেশ্বর, গাবতলা-বগী এলাকার বাঁধের বাইরে বসবাসরত দুই সহস্রাধিক পরিবারের সকলেরই মাথা গোঁজার ঠাই হয়নি। আদৌ ঘর নির্মানে সহায়তা তাদের ভাগ্যে জুটবে কিনা তাও জানেন না। সরেজমিন ঘুরে সিডর বিধ্বস্ত শরনখোলার বলেশ্বর নদীর চরের ছিন্নমুল গৃহহীন মানুষের সাথে কথা বলে এই দূর্দশার চিত্র পাওয়া গেছে।
বলেশ্বর নদীর চরের ছিন্নমুল গৃহহীন কোহিনুর বেগম, মুক্তা হাওলাদার, সাউথখালীর গাবতলা এলাকার জয়তুন বিবি, আব্দুর রহমান গাজী, রহমত আলীসহ অনেকে জানান, গত ছয় বছরেও তারা ঘরবাড়ি পুননির্মানের কোন সহায়তা পাননি। তাদের অভিযোগ সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছে নিজস্ব জমি না থাকায় এ সকল পরিবারকে তারা গৃহনির্মান ও পূর্নবাসনের আওতায় আনতে পারছেন না। ক্ষতিগ্রস্থদের গৃহনির্মানসহ পূনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলেও বাঁধের বাইরে অবস্থানরত পরিবারের কোন ব্যবস্থা আজও নেওয়া হয়নি। তাদের অবস্থা সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে খোলা আকাশের নীচে এখনও বাঁচার সংগ্রামে ঝুপড়ি ঘর তুলে চরম ঝুঁকির মধ্যে দিনাতিপাত করছে। সিডরের ছোবলের ছয় বছর পার হলেও বলেশ্বর পাড়ের রায়েন্দা বাজার ভেড়িবাঁধ, চাল-রায়েন্দা, রাজেশ্বর, গাবতলা-বগী বাঁধের বাইরে এবং ভোলা নদীর চরের অবস্থানরত দুই সহস্রাধিক পরিবার চরম ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। এই এলাকায় জেলে, কামার, কুমার, কাঠমিস্ত্রিসহ ছিন্নমূল এসব মানুষের বসবাস। এছিন্নমূল মানুষের ঘরবাড়ী পূর্ননির্মানের কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি সরকারিভাবে তাদেরকে গৃহনির্মানসহ পূর্নবাসনের ব্যবস্থা করা হোক।
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরের ভয়াল তান্ডবের কথা স্মরন করে এখনও আঁতকে ওঠে বাগেরহাটসহ উপকুলীয় এলাকার মানুষ। শতাব্দীর ভয়াবহতম সেই তান্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে যায় বাগেরহাটসহ উপকুলীয় জনপদ। নিশ্চিহ্ণ হয়ে যায় মানুষের ঘরবাড়ীসহ সকল সহায়-সম্পদ। প্রান হারায় কয়েক হাজার মানুষ। বাগেরহাটের শরনখোলায়ই এক হাজারসহ জেলায় দেড় হাজারের মত মানুষ নিহত হয়। আজ পূর্ন হচ্ছে ভয়াল সিডরের ছয় বছর। কিন্তু বাগেরহাটে সিডরে চরম ক্ষতির শিকার ঘরবাড়ীহারা দুই সহস্রাধিক পরিবার এখনও তাদের মাথা গোঁজার ঠাই পায়নি। সরকারি হিসাবে সিডরে বাগেরহাটের বিভিন্ন উপজেলায় ১’লাখ ৬৯’হাজার ৬’শটি ঘরবাড়ী বিধ্বস্থ হয়। যার মধ্যে এখনও জেলায় ৩৫’ভাগ ঘরবাড়ী হারা মানুষ তাদের ঘরবাড়ী পূর্ননির্মান করতে পারেনি। সিডরের পর চরম ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের ঘরবাড়ী পূর্ননির্মানসহ পূর্নবাসনের আশ্বাস দেওয়া হলেও আজও পর্যন্ত তারা গৃহহীন অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হ”চ্ছন। বিশেষ করে ভুমিহীন ও নদীর চরাঞ্চলে বসবাসরত মানুষের একটি পরিবারও তাদের ভেসে যাওয়া ঘরবাড়ী নির্মানে কোন সহায়তা পায়নি।
বাগেরহাট জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালের ১৫’নভেম্বরে শতাব্দীর ভয়বহতম ঘুর্নিঝড় সিডরের আঘাতে দেশের ৩০টি জেলার ১৯৫০টি ইউনিয়নের ৮৯’লাখ ২৫’হাজার মানুষ কমবেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সরকারিভাবে উপকুলীয় এলাকার মধ্যে বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালীকে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ এবং আরও ৮টি জেলাকে কম ক্ষতিগ্রস্থ হিসাবে গন্য করা হয়। বাগেরহাট জেলার ৯টি উপজেলার ৭৫টি ইউনিয়ন ও ৩টি পৌর এলাকার পুরোটাই চরম ক্ষতির শিকার হয়। জেলায় ২’লাখ ৮৩’হাজার ৪’শ ৮২টি পরিবারের ১২’লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতির শিকার হয়। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের তান্ডবে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৬৩’হাাজর ৬’শ ঘরবাড়ী সম্পূর্ণ বিধ্বস্থসহ ১’লাখ ৬৯’হাজার ৬’শটি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এছাড়া হাঁস-মুরগী ও গবাদি পশূর ক্ষতি হয় ৩’শ কোটি টাকার, ৭০’হাজার চিংড়ি ঘেরসহ মৎস্য খামার, ২’শ কোটি টাকার বিভিন্ন ফসল, ৮’শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রায় ৩’হজার মসজিদ-মন্দির, দেড় সহস্রাধিক কিমি. কাচা-পাকা সড়ক, দু’শ কিেিলামিটার ভেড়িবাঁধ, ৩’সহস্রাধিক গভীর-অগভীর নলকুপ, ৫’সহস্রাধিক নৌকা, ট্রলার ও জাল এবং ৫’সহস্রাধিক কিলোমিটার সামাজিক বনায়নসহ ব্যাপক ক্ষতি হয়। সিডরে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের প্রায় ৩০’ভাগ এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে যায়। এতে ৩টি বাঘ. ৬টি হরিনসহ অসংখ্য পশুপাখি মারা যায়। একইসাথে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের আওতাধীন সরকারি, আধাসরকারি দপ্তরসহ ৩৩টি বিভাগের আরও ৫’শ কোটি টাকার বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যায়। জেলাব্যাপী ১৬’লক্ষাধিক মানুষের মধ্যে নেমে আসে এক চরম নৈরাজ্যকর অবস্থা। সিডরের পর সরকারি, বেসরকারি ও বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগীতায় ক্রমান্বয়ে প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠা গেলেও ক্ষতিগ্রস্থ ঘরবাড়ি পূনর্নিমান ও ক্ষতিগ্রস্থদের পূর্নবাসন সম্ভব হয়নি।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মুঃ শুকুর আলী জানান, সিডরে বাগেরহাট জেলায় মোট ৬৩’হাজার ৬’শ ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। এ সকল গৃহহারাদের স্থায়ী ঘরবাড়ি নির্মানে বিদেশী সরকার, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী, দাতা সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং ব্যক্তি পর্যায়ে যে পরিমান সহায়তা এবং প্রতিশ্র“তি পাওয়া যায় তা প্রাথমিক পর্যায়ে যথেষ্ট হলেও পরবর্তী সময়ে ব্যাপক সংকটের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ভারত সরকারের দেওয়া শরনখোলা ও মোরেলগঞ্জে ১’হাজার ৬’শ ঘর, সৌদি সরকারের দেওয়া বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী ও ঝালকাঠিতে ২১’হাজার ২’শ ঘর, আইডিবি মিশনের প্রতিশ্রুত ১৩০ মিলিয়ন ডলার ত্রানের আওতায় গৃহ ও শেল্টার নির্মান, জাপান সরকারের ১৫মিলিয়ন ডলারের ঘর নির্মান প্রস্তাব, এবং বেসরকারি সংস্থা কেয়ার বাংলাদেশ, রূপান্তর, মুসলিম এইড, কনসার্ন, কারিতাস, নবলোক, ইসলামিক রিলিফসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকে আরও ২০’হাজার ঘরবাড়ি নির্মাণের প্রতিশ্রুতি পায় সরকার। কিন্তু গত ছয় বছরেও ঘরবাড়ি পূনঃর্নিমানের কোন ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সরকারিভাবে এ সকল গৃহহীন মানুষের পূর্নবাসনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান।

শেয়ার