বিদায় টেন্ডুলকার

Tndul
সমাজের কথা ডেস্ক॥ কালের পরিক্রমায় ২৪ বছর নেহাত কম নয়। গত দুই যুগে পৃথিবীটা পাল্টে গেছে অনেকখানি। কিন্তু একজন আজো অবিচল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের ২৪ বছর কেটে গেলেও এখনো তাকে নিয়ে ক্রিকেটভক্তদের মাতামাতি কমেনি এতটুকু। ভবিষ্যতেও হয়তো তা থাকবে। কিন্তু ক্রিকেট ব্যাট হাতে আর দেখা যাবে না শচীন টেন্ডুলকারকে। বৃহস্পতিবার থেকে ঘরের মাঠ মুম্বাইয়ে শুরু হতে যাওয়া ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় টেস্ট খেলে বিদায় নিচ্ছেন ক্রিকেটের ‘মহানায়ক’।
ভারতে তো বটেই, পুরো ক্রিকেট-বিশ্বেই যেন কিছু দিন ধরে বয়ে চলেছে দুঃখের চোরাস্রোত। টেন্ডুলকারকে আর কখনো ক্রিকেট মাঠে দেখতে না পাওয়ার কষ্ট তার ভক্তদের পক্ষে মেনে নেয়া খুব কঠিন। সেই সব ভক্তের কেউ-কেউ হয়তো ক্রিকেট দেখাই ছেড়ে দেবেন। একটা টেস্ট সিরিজের অন্য সব কিছুকে বাদ দিয়ে শুধু একজনের বিদায়ের জন্য এমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা আধুনিক ক্রিকেটে বিরল। টেন্ডুলকারের অজস্র রেকর্ডের মতো এটাও একটা ‘রেকর্ড’।
দীর্ঘ দুই যুগে কত রেকর্ড গড়েছেন তার হিসাব টেন্ডুলকারের পক্ষেও দেয়া মুশকিল। তবে শুধু মাঠের ভেতরে নয়, বাইরেও তিনি এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব। প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ২০০তম টেস্ট খেলতে যাচ্ছেন, ওয়ানডে খেলেছেন ৪৬৩টি। অথচ তাকে ঘিরে বিতর্ক নেই-ই বলা যায়।
কলকাতায় ১৯৯তম টেস্ট খেলতে নেমে আম্পায়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে এলবিডব্লিউ হওয়ার পরও তার শরীরি-ভাষায় ফুটে ওঠেনি বিন্দুমাত্র ‘প্রতিবাদ’। পুরো ইডেন গার্ডেন্স ক্ষোভে ফুঁসলেও তিনি ফিরে এসেছেন নির্বিকার চিত্তে। শুধু বিদায়-লগ্নে নয়, পুরো ক্রিকেট-জীবনেই টেন্ডুলকারের আম্পায়ারের যে কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার মানসিকতা দেখা গেছে বার বার।
সতীর্থদের কাছে তিনি যেমন শ্রদ্ধাভাজন, তেমনি প্রিয় বন্ধুও। অভিষেকের সময় সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার কপিল দেব ছিলেন তার সতীর্থ। সেই কপিল থেকে শুরু করে ভারতীয় দলের নবীনতম সদস্য পর্যন্ত টেন্ডুলকারের গুণমুগ্ধ ভক্ত। সেটা শুধু ক্রিকেটজনিত দক্ষতার কারণে নয়। এই শ্রদ্ধার পেছনে তার মানবিক গুণাবলীর ‘অবদান’ও কম নয়।
খ্যাতির ‘এভারেস্ট’-এ পৌঁছেও তার পা থেকেছে মাটিতেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রথম দিনের মতো আজো তিনি আগের মতোই নম্র, মৃদুভাষী, বিনয়ী, নিরহঙ্কার। শুধু ব্যাট হাতে নয়, এই সব গুণ দিয়েও টেন্ডুলকার সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করেছেন, করে চলেছেন।
তার ব্যাটিং-কীর্তিগুলো সত্যিই অবিশ্বাস্য। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০০টি শতক, টেস্ট-ওয়ানডে দুই ধরনের ক্রিকেটেই সবচেয়ে বেশি রান ও শতকসহ ব্যাটিংয়ের বহু রেকর্ড টেন্ডুলকারের অধিকারে। সে সব রেকর্ড কবে ভাঙ্গবে, বা আদৌ ভাঙ্গবে কিনা, তার ভবিষ্যদ্বাণী করা প্রায় অসম্ভব।
ভারতীয়দের কাছে তিনি ক্রিকেটের ‘ঈশ্বর’, তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। তবে দেশের বাইরেও টেন্ডুলকারের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা। যেখানেই খেলতে গেছেন, পেয়েছেন স্থানীয় মানুষের প্রাণঢালা ভালবাসা। এমনকি ভারতের ‘চিরবৈরি’ পাকিস্তানেও তাকে নিয়ে মাতামাতি। সেখানেও তিনি ভীষণ জনপ্রিয়।
অস্ট্রেলিয়াতে বসবাস করা ভারতীয়রা যতই নিগৃহীত হোক, দেশটি কিন্তু টেন্ডুলকারকে ‘অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া’ দিতে দ্বিধা করেনি। অস্ট্রেলিয়ার গর্ব, সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের তো ভীষণ প্রিয় ছিলেন তিনি। একবার টিভিতে টেন্ডুলকারের খেলা দেখতে-দেখতে স্ত্রী জেসিকে ডেকে ব্র্যাডম্যান বলেছিলেন, “এই ছেলেটার ব্যাটিংয়ের ধরন ঠিক আমার মতো।”
ব্র্যাডম্যানের জন্মদিনে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে টেন্ডুলকার ছুটে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। ৯০তম জন্মদিনে অ্যাডিলেইডে নিজের বাড়িতে স্যার ডন একটি ক্রিকেট ব্যাটে সই করছেন, দু পাশে হাস্যোজ্জ্বল টেন্ডুলকার ও শেন ওয়ার্ন – টেস্ট ক্রিকেটে ব্র্যাডম্যানের অবিশ্বাস্য ব্যাটিং-গড়ের (৯৯.৯৪) মতো এই ছবিটির ‘অমর’ হয়ে থাকাও বোধহয় নিশ্চিত।
ভারতকে যেমন দু হাত উজাড় করে দিয়েছেন, তেমনি স্বদেশও তাকে অজস্র সম্মানে ভূষিত করেছে। ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘পদ্মবিভূষণ’, সর্বোচ্চ ক্রীড়া পুরস্কার ‘রাজীব গান্ধী খেল রতœ’, ভারতীয় রাজ্যসভার সম্মানসূচক সদস্য পদ অবশ্য তার প্রাপ্যই। টেন্ডুলকারকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘ভারতরতœ’ দেয়ার দাবিতে বহু ভারতীয় দীর্ঘ দিন ধরে সোচ্চার।
তবে ক্রিকেটের সফলতম ব্যাটসম্যানের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বিশ্বের সব প্রান্তের মানুষের নিখাদ, অকৃত্রিম ভালবাসা। তার বিদায়বেলায় তাই ক্রিকেট-বিশ্বে রীতিমতো হাহাকার। সেই ছবির মতো কাভার ড্রাইভ, নিখুঁত স্কয়ার কাট, স্টেপ আউট করে বেরিয়ে ছক্কা মারার দৃষ্টিসুখকর দৃশ্যগুলো আর দেখা যাবে না কখনো। শচীন রমেশ টেন্ডুলকারের অবসর মানে ক্রিকেটের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়েরও সমাপ্তি।

শেয়ার