কৃষিতে পরিবর্তনের হাওয়া

স্বাধীনতার পর চার দশক ধরে বাংলাদেশে কৃষি খাতে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। এ বিরাট পরিবর্তনটি রীতিমতো চোখে পড়ার মতো। অথচ পাকিস্তানী আমলে ষাটের দশকে সারাদেশে গরুটানা লাঙ্গল দিয়ে চাষাবাদ হতো। সে সময় সরকারি কৃষি বিভাগের উদ্যোগে হয়ত কোথাও ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করা হতো; কিন্তু কৃষকদের মধ্যে তখন তা তেমন জনপ্রিয়তা অর্জন করেনি। স্বাধীনতার পর সারাদেশেই জনজীবনের চালচিত্র বদলে যাওয়ার সূচনা হলো। এ এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সূচনা। স্বাধীনতাই বাঙালী জাতিকে সর্বেেত্র উন্নয়নমূলক পরিবর্তনের প্রেরণা দিয়েছে। চার দশকে সব খাতেই উন্নতি হয়েছে। জনগণের গড় আয়ু ও গড় আয় অনেক বেড়েছে। যান্ত্রিক চাষাবাদ চালুর কারণে কৃষিেেত্র যে নবদিগন্তের সূচনা হয়েছে তেমনটি আর অন্য কোথাও হয়নি। দেশে কৃষি উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। উন্নত প্রযুক্তি ও অধিক ফলনশীল শস্যবীজ ব্যবহারের কারণে এখন নির্ধারিত সময়ের আগেই ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কৃষি খাতে এখানে নীরব বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে। এর সবই সম্ভব হয়েছে যান্ত্রিক চাষাবাদের কারণে। দেশের বেশিরভাগ এলাকায় এখন আর লাঙ্গল-গরু দিয়ে চাষাবাদ হয় না। জমি চাষ হচ্ছে ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার দিয়ে। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে চাষাবাদের ৯০ শতাংশই হচ্ছে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার দিয়ে। শুধু কি চাষাবাদ? দেশে প্রায় ৯৫ শতাংশ ফসল মাড়াইয়ের কাজ হচ্ছে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে। আধুনিক মাড়াইযন্ত্র দেখতে পাওয়া যাবে বেশিরভাগ কৃষকের বাড়িতে।
স্বাধীনতার পর কৃষি বিভাগ দেশে যান্ত্রিক চাষাবাদ পদ্ধতি চালুর েেত্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এ ছাড়া কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছরই বেরিয়ে আসছেন মেধাবী কৃষিবিদ ও কৃষি কর্মকর্তা। এরা সবাই মিলে দেশের আদিম ও অযান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থাকে যান্ত্রিক ব্যবস্থায় উন্নীত করেছেন। আমাদের দ কৃষকরা অধিক শস্য ফলনের প্রত্যাশায় খুবই উৎসাহ নিয়ে যান্ত্রিক পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। তার ফল এখন পাচ্ছে দেশবাসী। স্বাধীনতার আগে দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। কিন্তু তখন আমাদের বিপুল পরিমাণ খাদ্য আমদানি করতে হতো। এখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ষোলো কোটি। অথচ যান্ত্রিক চাষাবাদের কারণে আমরা কৃষি উৎপাদনের েেত্র অনেকাংশে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। শুধু তাই নয়, আমরা কৃষিপণ্য নিয়মিত রফতানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছি। পর্যবেকদের মতে, আমাদের কৃষিপণ্য রফতানি আরও বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশে যান্ত্রিক চাষাবাদ পদ্ধতি মাত্র তিন দশকেই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তার প্রধান কারণ কৃষি যন্ত্রপাতি এখন আমদানি করতে হয় না। তা দেশেই পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হচ্ছে। এখন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) প্রকৌশলীরা নানা ধরনের কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি করছে এবং প্রতিবছর এগুলোর উন্নত সংস্করণ নির্মাণের উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে।
জানা গেছে, এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইউরিয়া প্রয়োগ, নিড়ানি দেয়া, ফসল কাটা প্রভৃতি কাজে কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। এ ছাড়া সেচ ও কীটনাশক প্রয়োগ সম্পূর্ণরূপে যন্ত্রনির্ভর।
এতকিছুর পরও কৃষি খাতে একটি প্রধান সমস্যা বিরাজ করছে। যান্ত্রিক চাষাবাদের মাধ্যমে আমাদের কৃষি উৎপাদন বাড়ছে। কিন্তু সেই সঙ্গে জনসংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে প্রায় ২০ লাখ এবং অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য কৃষি জমি কমছে প্রায় তিরিশ হাজার হেক্টর। ফলে কৃষি খাতে টেকসই উন্নয়ন এখন হুমকির সম্মুখীন। তাই যান্ত্রিক চাষাবাদের পাশাপাশি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

শেয়ার