বলকুড়ানো ছেলে থেকে গলফের রাজপুত্র

siddikur4
সমাজের কথা ডেস্ক॥ কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবের সবুজ প্রান্তর কি জানতো দেশের বিত্তবান আর সামরিক বাহিনীর শৌখিন অফিসারদের হাঁকানো বল কুড়িয়ে আনা ছেলেটাকে নিয়ে একদিন দেশে-বিদেশে মাতামাতি শুরু হবে। বল এনে দেয়ার বিনিময়ে ক’টা টাকা বখশিশ পাওয়া যায়, সেটাই ছেলেটার সংসারে কাজে আসতো খুব। কিন্তু এ ছেলের মধ্যে ছিল গলফের প্রতি এক দুর্দমনীয় প্রেম। বলবয় সিদ্দিকুরকে সেই প্রেম বানিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তারকা।
মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান এখন আমাদের গলফের রাজপুত্র। তবে শুধু ‘সিদ্দিকুর’ নামটাকে স্কোরকার্ডে দেখতে পছন্দ করেন এই গলফার।
পেশাদার গলফের এই দুনিয়ায় টুর্নামেন্ট থেকে অর্জিত অর্থেই মাপা হয় সাফল্য। ইন্ডিয়ান ওপেন জিতে পাওয়া ২ লাখ ২৫ হাজার ডলারের প্রাইজমানি সিদ্দিকুরকে তাই এশিয়ান ট্যুরের এ বছরের অর্ডার অব মেরিটের তিন নম্বর অবস্থানে তুলে এনেছে। আর ২০০৯ সাল থেকে গলফ খেলে এ পর্যন্ত তার মোট আয় ১২ লাখ ৭৯ হাজার ৮৩৪ ডলার বা প্রায় ১০ কোটি টাকা। অংকটার দিকে তাকালে, চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় সিদ্দিকুর বাংলাদেশের অন্যতম ধনী ক্রীড়াবিদ।
এত এত নাম-যশ, তারকা খ্যাতি আর অর্থের পেছনের যে অসাধারন মানুষটা, তার শুরুটা কিন্তু একদম সাধারণ। বাবা আফজাল হোসেন অটোরিকশা চালাতেন। মা মনোয়ারা বেগম সেই আয়ে চালাতেন সংসার। সিদ্দিকুররা চার ভাই, ঠিক মতন তিনবেলা খাওয়া জুটতো না তাদের। থাকতেন ধামালকোটের বস্তিতে। সেখানে থাকতেই পাশের বাড়ির এক ছেলে কুর্মিটোলা ক্লাবে বল কুড়ানোর কাজ জুটিয়ে দেয় সিদ্দিকুরকে। সেই প্রথম গলফকোর্স দেখা, সিদ্দিকুরের গলফের প্রেমেও পড়া তখন থেকেই।
‘বলবয়’ হিসেবে শুরু। বল কুড়াতে কুড়াতে এক সময় ক্যাডি, মানে খেলোয়াড়দের ক্লাব (গলফ খেলার সরঞ্জাম) রাখার ব্যাগ বহনের কাজ পেয়ে গেলেন সিদ্দিকুর। খেলাটাকে আরো একটু কাছ থেকে আরো একটু ভালো করে দেখার সুযোগ হলো তার। সিদ্দিকুরের তর আর সয় না, এবার মাঠে নেমে একটু খেলতেই হয়। কিন্তু ক্লাব পাবেন কোথায়, তারতো দাম অনেক! কিন্তু সিদ্দিকুরকে আটকানো গেল না। পাড়ার ঝালাইয়ের দোকান থেকে ভাঙা ক্লাবের মাথার সাথে লোহার রড় জুড়ে সেটা দিয়েই অনুশীলন শুরু করলেন।
২০০০ সালে একটা সুযোগ এলো। সুবিধাবঞ্চিত খেলোয়াড়দের জন্য একটা ক্যাম্প করা হল, মানে বলবয় আর ক্যাডিদের খেলার সুযোগ করে দেয়ার একটা উদ্যোগ। সিদ্দিকুরের জন্য সেই ছিল স্বপ্নপূরণের শুরু। কোচ বাবু আহমেদের অধীনে অনুশীলন করতে গিয়ে শিখে ফেললেন দরকারি অনেক কিছুই। আগ্রহ আর অধ্যাবসায় তাকে এনে দিল সাফল্যও। অপেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে বারোটা শিরোপা জিতলেন সিদ্দিকুর রহমান। ২০০৮ সালে হয়ে গেলেন পেশদার গলফার। তারপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। একটার পর একটা শিরোপা জিততে জিততে চলে এলেন এশিয়ার সেরাদের তালিকায়।
দিল্লিতে ইন্ডিয়ান ওপেনের সুর্বণ জয়ন্তীর আসরেই বাঘা বাঘা ভারতীয় গলফারদের পেছনে ফেলে সিদ্দিকুর জিতে নিয়েছেন নিজের দ্বিতীয় এশিয়ান ট্যুর শিরোপা। সিদ্দিকুরের জন্য এ খেতাব নতুন নয়, এর আগেও ২০১০ সালে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে এশিয়ান ট্যুর (ব্রুনাই ওপেন) জিতেছিলেন তিনি। কিন্তু এবারের খেতাবের গুরুত্বটা একটু অন্যরকম। এ মাসেই যে অস্ট্রেলিয়ায় দেশের প্রথম গলফার হিসেবে গলফ বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছেন তিনি। সিদ্দিকুর এখন স্বপ্ন দেখেন বিশ্বকাপে বিশ্বসেরাদের কাতারে শীর্ষ বিশের মধ্যে থাকার, যেখানে নিশ্চিতভাবেই প্রেরণা হয়ে থাকবে সর্বশেষ সাফল্যটি।
গলফে সিদ্দিকুরের আদর্শ আর্নি এলস। সিদ্দিকুরের আশা আর্নি এলস, টাইগার উডস আর রিকি ফাউলারের সাথে ম্যাচ খেলার সুযোগটা পেয়ে যাবেন তিনি। নিজেকে সেজন্য শানিয়ে নিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোচ শেন গিলেসপির কাছ থেকে নিয়মিত কোচিং নিয়ে। হিরো ইন্ডিয়ান ওপেনে কিন্তু দেখা গেছে বদলে যাওয়া সিদ্দিকুরকে। প্রথম রাউন্ড থেকেই আক্রমণাত্মক শব শট খেলেছেন, শেষে রাউন্ডের চাপেও খেলার ধরন বদলাননি। গত মাসে মালয়শিয়ার সিআইএমবি ক্লাসিকে একটি মেজরজয়ী মার্কিন গলফার বুবা ওয়াটসন ও পিজিএ চ্যাম্পিয়শিপ জেতা আরেক মার্কিনি কিগান ব্র্যাডলির সঙ্গে খেলে আক্রমণাত্মক খেলায় উদ্বুদ্ধ হন তিনি।

ইন্ডিয়ান ওপেন চলাকালেই সিদ্দিকুর জানিয়েছিলেন তার খেলার ধরণ বদলানোর কারণ। ২০১০ সালে ব্রুনাই ওপেন যখন জেতেন তখন তার লক্ষ্য ছিল এশিয়ান ট্যুরে খেলার সুযোগটা যাতে হাতছাড়া না হয়। ক্যারিয়ারে এগুনোর জন্য প্রয়োজন ছিল অনেক অর্থেরও। রক্ষণাত্মক খেলে আগে মোটামুটি একটা সাফল্য নিশ্চিত করতে চেয়েছেন তাই।

এখন আর এশিয়ান ট্যুরে টিকে থাকার চিন্তা নেই। অর্থের চাহিদা তো আগেই ফুরিয়েছে। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বকাপ গলফে খেলতে যাচ্ছেন সিদ্দিকুর। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে আগামী ২১ থেকে ২৪ নভেম্বর এই প্রতিযোগিতায় স্বভাবসুলভ খেলেই গলফের দুনিয়ায় বাংলাদেশের পতাকাটা আরো জোরে ওড়াতে চান তিনি।

শেয়ার