হরতালের আগুন এক নিমিষে বদলে দিলো পৃথিবী!

bus1
বাংলানিউজ॥ মুহূর্তেই বদলে গেছে তাদের পৃথিবী! রাজনীতির কঠিন চালে নিয়তি বদলে গেছে অনেকগুলো মানুষের। হরতালের আগুনে পুড়েছে তাদের জীবনের স্বপ্ন ও সাধসহ অনেক কিছুই।
শুক্রবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন এ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে গিয়ে হরতালে পুড়ে যাওয়া এমন কয়েকজনকে বিছানায় কাতর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেল।
গত ৪ থেকে ৬ নভেম্বর ১৮ দলের ডাকা ৬০ ঘণ্টার হরতালকে কেন্দ্র করে নাশকতার শিকার এই মানুষগুলো এখনও মেনে নিতে পারছেন না বাস্তবতাকে। স্তম্ভিত তারা।
ছেরাগুলার বিচার চাই: সুমি
বিছানার সঙ্গে যেন মিশে আছে ছোট্ট মেয়েটি, হাতে-পায়ে মোটা ব্যান্ডেজ, ঝলসে গেছে মুখের অনেকখানি চামড়াও। নাকে বড় এক নাকফুল। কিপে বাধা চুল। ফোলা ফোলা সরল দু’টি চোখে সে তাকিয়ে।
৮ বছর বয়সী সুমি। লাল-নীল বাতির রঙিন শহর দেখার শখে দাদীর সঙ্গে ঢাকার পথে পাড়ি দিয়েছিলো সে। কিন্তু রঙিন ঢাকা দেখার আগেই নিষ্ঠুর, ভয়ঙ্কর এক অচেনা পৃথিবী দেখতে হলো তাকে।
হরতালের নাশকতার শিকার সুমি ও তার দাদীর কথা এখন দেশের অনেকেই জানেন। মিডিয়াগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে এ খবর। তবে তাতে সুমি ও তার পরিবারের কষ্ট মনোযাতনা কমার কথা নয়, কমেওনি।
সেদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে ছোট্ট সুমি বাংলানিউজকে বলে, ‘বাসে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত আসছি। ছেরারা (পিকেটাররা) আগেই বাসে উঠসিল। বোমা মাইরা চইলা গেসে। ছেরাগো বিচার চাই।’
সুমি আরও বলে, ‘পুইড়া যাওনের পরে ডাক্তার আমার ফ্রক কেঞ্চি দিয়া কাটছে, চুলও কাটছে।’
কৈলাটি ফাতেমা সরকারি বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী সে। ডিসেম্বরে পরীা, তাই ঢাকায় বেড়াতে আসায় মায়ের ছিল কঠিন নিষেধ। কিন্তু শখের ওপর তো কোনো কথা চলতে পারে না। সেজেগুজে, মাথায় বেণী গুটিয়ে দাদীর সঙ্গে রওনা দিয়েছিল তাই।
‘এখন কেমন আছো’ জানতে চাইলে হাত উঁচিয়ে দেখানোর চেষ্টা করে সুমি। জানায়, দুই হাতে ও পায়ে বেশি ব্যথা। পোড়া যন্ত্রণায় গা ভর্তি জ্বর তার। সুমির মা বললেন, ব্যথায় কিছুই খেতে চায় না মেয়ে।
মা রুবিনা বেগম ও বাবা সুজন মিয়া নেত্রকোণার দুর্গাপুরের বাড়ি থেকে ঢাকা এসেছেন বুধবার। খবর আগে পেলেও হরতালের কারণে আসতে দেরি।
নাড়িছেঁড়া ধনকে বিছানায় এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে দু’জনের চোখেই ঘোর বিষাদ। তবু মেয়ে বেঁচে আছে বলে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন তারা। পাশাপাশি বিচার দাবি করছিলেন দোষীদের।
দরিদ্র সুজন মিয়া কৃষি ও মাছ ধরার কাজ করে সংসার চালান। নিজস্ব কোনো জমিজমা নাই।
হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা উপকরণ যা দেয়, তার বাইরেও সন্তান ও মায়ের জন্য প্রতিদিন প্রায় হাজার দু’এক টাকা খরচ হচ্ছে তার। ধারদেনা হচ্ছে প্রচুর, জানালেন সুজন।
দিশেহারা সুজন বলেন, মিডিয়ায় অনেক প্রচার হইলো। কিন্তু কেউ তেমন সাহায্য করে নাই। সচিবালয় থেইকে চার হাজার টাকা আসছে শুধু।
মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এই বাবা বলেন, অনেক দিন ধইরা চিকিৎসা করা লাগবে। এতোদিন কেমনে সম্ভব হইবো বুজতাসি না। ধার কইরা আর কয়দিন!
জীবনে রাজনীতি করি নাই। রাজনীতির জন্য আমার মাইয়াডারে এমন কষ্ট ক্যান করতে হইলো?- প্রশ্ন সুমির বাবার।
এ সময়, সুমির ফুপা নজরুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, এরা তো এমনিতেই অসহায়। তার মধ্যে এখন এই দশা হইলো। কিছু সাহায্য পাইলে তাদের ভালো হইতো।
নাতনীডার কষ্ট সইবার পারি না: রহিমা
সুমির বিছানার উল্টোদিকেই শুয়ে আছেন একইসঙ্গে পুড়ে যাওয়া দাদী রহিমা খাতুন (৪৫)। তার অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক বলে জানান সিনিয়র স্টাফ নার্স পারুল আক্তার।
রহিমা বাংলানিউজকে বলেন, নাতনীডারে বাঁচাইতে গিয়া বেশি পুড়সি। তবু তো পারলাম না। আমি ম্যালা সময় অজ্ঞান আসিলাম।
আল-আমিনকে পোড়াতে চেয়েছিল দৃর্বত্তরা
পেটের দায়ে হরতালের মধ্যে লেগুনা নিয়ে বের হওয়াই প্রধান অপরাধ ১৯ বছর বয়সী আল-আমিনের।
নিজের দায়িত্বশীলতার বিনিময়ে ৩৮ শতাংশ পুড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে এখন তিনি হাসপাতালের বিছানায়। হাত, পা ও উরুর অংশ মারাত্মকভাবে ঝলসে গেছে তার।
ধীরে ধীরে ঘটনার বর্ণনা করেন তিনি। হরতালের দ্বিতীয় দিন হাজারীবাগ থেকে গুলিস্তান যাওয়ার পথে বিজিবি দুই নম্বর ফটক পার হচ্ছিলেন আল-আমিন। ভেতর মাত্র একজন যাত্রী।
হঠাৎ দ্ইু ব্যক্তি এসে আমিনের পাশের যাত্রীকে নেমে যেতে বলে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাউডার ছড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় তার শরীরে।
আমিন বলেন, রাজনীতি করি নাই জীবনে, অথচ সেই রাজনীতির কারণেই পুড়তে হইলো। আগুন দেওয়া দুই জনের চেহারা মনে আছে। দেখলেই চিনবো।
তিনি জানান, একবার এসে মালিক তাকে হাজার খানেক টাকা দিয়ে গেছেন। অথচ, হাসপাতালের দেওয়া চিকিৎসার বাইরে প্রতিদিনই তার খরচ পড়ছে প্রায় দেড় হাজার টাকার মতো।
আমিনের বাড়ি কুমিল্লার হোমনায়, ঢাকায় হাজারীবাগে থেকে লেগুনা হেল্পারি করে পরিবারের ব্যয় বহন করেন তিনি। ছোট বোনটি মাদ্রাসায় পড়ে, বাবা হুমায়ুন কবির রিকশাচালক।
আল-আমিনের খালা বিলকিস বলেন, ছেলেটা পরিবার দেখে। এখন তার এই অবস্থা। পরিবারটা এখন কিভাবে চলবে? তার বাবার বয়স হইছে, এই বয়সে তো রিকশা চালানোও সম্ভব না।
রুকুনের পরিবারে শুধুই অন্ধকার
মা, বাবা, ভাই সকলেই আছেন, কিন্তু সমস্যা একটাই যে, সকলেই তারা অসুস্থ। আর তাদের দেখাশোনা ও ব্যয় বহন করছিলেন কাভার্ড ভ্যান চালক রুকুন। বিয়ে থাও করেননি চলমান দায়িত্ব পালনে ঘাটতি হবার আশঙ্কায়।
কিন্তু ঘাটতি তবু পড়েই গেল! হরতালের আগের সন্ধ্যায় (রোববার) গাজীপুর বাইপাস এলাকায় তাকেসহ তার ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয় হরতাল সমর্থকরা। ২০ শতাংশ পুড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে এখন তিনি হাসপাতালের বিছানায়।
মুখম-ল পুড়ে গেছে তার। এছাড়াও শরীরের বেশিরভাগ অংশেই ব্যথা ও চামড়ায় টান পড়ছে বলে জানান তিনি। সহকর্মী মো. ইব্রাহিম ও বোন এ সময়ে পাশে রয়েছেন।
রুকুনের চিকিৎসায় কোম্পানি থেকে এখনও কিছুটা খরচ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেটা কতদিন তা ভাববার বিষয়। এভাবে দীর্ঘদিনের চিকিৎসার খরচ কোম্পানি দেবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে পরিবারের।
কবে নাগাদ সুস্থ হবেন, পুরোপুরি সুস্থ হলেও কাজে আর যোগ দেওয়া যাবে কিনা এসব নিয়েও সংশয়। পরিবারের খরচই বা কিভাবে চলবে জানেন না রাজবাড়ির রুকুন।
সহকর্মী ইব্রাহিম বলেন, তিন বছর ধরে ওএনটি গ্রুপ-এ কাজ করেন রুকুন। তিনি গাড়ি চালান, কোনো রাজনীতির সঙ্গে নেই।
হাসুর ভাগ্য বদল হলো, তবে অন্যভাবে…
মা-বাবা, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে হাসু মিয়ার পরিবার। একমাত্র উপার্জনম ব্যক্তি তিনি। ১৪ বছর আগে ঢাকা এসেছিলেন নিজের ভাগ্য বদলাতে। ভাগ্য বদলেছেও তার, তবে সেটা একটু অন্যভাবে।
সাভারের বিশ্বাস সিনথেটিক-এর মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন তিনি। হরতালের আগের দিন কোম্পানির কাজে পুরান ঢাকা থেকে যন্ত্রপাতি নিয়ে ফিরছিলেন।
বহনকারী সিএনজি অটোরিকশাটি সাভার ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে পেট্রোল ছুঁড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। অগ্নিদগ্ধ হাসু, তার সহকর্মী মোস্তাফিজুর রহমান ও সিএনজি রিকশা চালক আসাদুল গাজীকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।
কিন্তু পরদিনই মারা যান মোস্তাফিজ। আর এখনও চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন হাসু ও আসাদুল।
ভবিষ্যৎ জানেন না আসাদুল
পটুয়াখালীর বাউফলের আসাদুল ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে থাকেন। জীবিকার টানে স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে ঢাকায় আসেন তিনি। চোখে মুখে সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
কিন্তু অগ্নিদগ্ধ শরীরের তের দিকে তাকিয়ে সেই স্বপ্ন এখন অনেক দূরের বলে মনে হয় তার।
ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল বাংলানিউজকে বলেন, হরতালের কারণে পোড়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।
তিনি বলেন, আক্রান্তদের ত কবে নাগাদ সারবে সেটি আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। নিয়ম-কানুন মেনে চলার ওপরও নির্ভর করছে সুস্থতার সময়।
কোন দায়ে এই তি! পূর্বশত্রুতা নেই, বিনা অপরাধে কেন এই পরিণতি- ভেবে পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা।
এই তি পূরণ করবে কে? আদৌ আছে কিনা কোনো তিপূরণের বরাদ্দ, তাও জানতে চাওয়ার সুযোগ নেই যেন!

শেয়ার