বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ : খুলনায় বছরে তালাক ১ হাজার

divorce
খুলনা ব্যুরো॥ তানিম রেদওয়ান। পিতা রেজওয়ানুল হক। বসবাস ঢাকার আদাবরে। বিয়ে করে সংসার পেতেছিলেন খুলনায়। নগরীর বাগমারা ব্যাংকার্স কলোনির আক্কাস আলীর মেয়ে নুসরাত জাহান তার স্ত্রী। কিন্তু সংসার স্থায়ী হয়নি। দেখা দেয় দাম্পত্য কলহ। স্ত্রী নুসরাত তালাক দিয়ে দাম্পত্য জীবনের ইতি টেনেছেন। নুসরাত একা নন; এভাবে পারিবারিক কলোহের জের ধরে খুলনায় দাম্পত্য বিচ্ছেদ বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। পরিসংখ্যান বলছে, গত ৫ বছরে শুধুমাত্র নগরীতেই তালাকের ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৯৮৯টি। প্রতি বছর যার গড় সংখ্যা ৯৯৭ দশমিক ৮।
ঠিক এর বিপরীতে তালাক প্রত্যাহারের ঘটনাও ঘটছে। যদিও এ সংখ্যা খুবই কম। গত দু’বছরে ২২জন দম্পতি তালাক প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তারা অভিমান ভুলে নতুন করে সংসার করছেন।
পারিবারিক কলহ, স্বামী-স্ত্রী’র স্বাধীনতায় বাধা, বেকারত্ব, অবাধ্যতা, যৌতুক, নির্যাতন, খোরপোষ না দেয়া, স্বামীর প্রতি অবহেলা, বহুবিয়ে, দারিদ্রতা, অপরিণত বয়সে বিয়ে, নিরক্ষরতা, অসচেতনতা ও পরকীয়া তালাকের প্রবণতা বৃদ্ধির কারণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি)’র আইন শাখার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে গত ৫ বছরে ৪ হাজার ৯৮৯টি তালাক দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিককালে তালাকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে ৪ শতাধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৯ সালে তালাক হয় ৭৭৮টি, ২০১০ সালে ৯৪৬টি, ২০১১ সালে ১ হাজার ৭৪টি, ২০১২ সালে ১ হাজার ১৮১টি এবং চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে ১ হাজার ১০টি তালাক নথিভূক্ত হয়েছে।
অপরদিকে, তালাক দেয়ার পর দু’ বছরে ২২ দম্পতি তা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এর মধ্যে ২০১২ সালে ১৬জন এবং চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ৬জন।
বাংলাদেশ মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার সমিতি, খুলনা জেলা শাখার সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও ৩১নং ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) ফেরদাউস হোসেনের জানান, স্বামী বা স্ত্রী কেউ তালাক দিতে এলে প্রথমে তারা নিরুৎসাহিত করেন। তালাক না দিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্ট ছেলে-মেয়েকে বিভিন্নভাবে বোঝানোরও চেষ্টা করেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কারণ এবং অভিভাবকদের সম্মতি থাকলে তালাক নোটিশ প্রদান করা হয়। এ ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের নির্ধ্বারিত ৫শ’ টাকা ফি নেয়া হয়।
সহকারী নিকাহ রেজিস্ট্রার মাওলানা মোঃ বদরুজ্জামান বলেন, যৌতুক, নির্যাতন, খোরপোষ না দেয়া, খোঁজ-খবর না রাখা এবং নেশাগ্রস্ত হওয়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্ত্রীরা স্বামীদের তালাক দিয়ে থাকেন। এছাড়াও উভয়ের ক্ষেত্রে তালাকনামার নোটিশে ১৪/১৫টি কারণ উল্লেখ রয়েছে। তালাক নোটিশের একটি কপি সিটি কর্পোরেশনের আইন শাখায়ও পাঠানো হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কেসিসি’র সচীব ও নিকাহ সালিশী পরিষদের চেয়ারম্যান এম ইদ্রিস সিদ্দিকী বলেন, তালাকনামা পাওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই তালাক প্রত্যাহার করে মীমাংসার জন্য নোটিশ দেয়া হয়। এর ৯০ দিনের মধ্যে দু’ পক্ষ তালাক প্রত্যাহারের জন্য সালিশী পরিষদে হাজির হলে তা শর্ত সাপেক্ষে প্রত্যাহার করা হয়।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা, খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাড. মোমিনুল ইসলাম বলেন, বছরে গড় তালাকের সংখ্যা উদ্বেগজনক। মূলত, সামাজিক ও পারিবারিক শৃংখলা এবং যৌথ পরিবার ভেঙ্গে যাওয়ার কারণেই এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে। সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন মজবুত করতে পারলে এ অবস্থার উত্তোরণ ঘটানো সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শেয়ার