পিলখানা হত্যা : ১৫২ জনের ফাঁসি ৪২৩ জনের কারাদণ্ড, ২৭১ খালাস

BgB
বাংলানিউজ॥
পিলখানায় বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) হত্যাকাণ্ড মামলায় ১৫২ আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এছাড়া ৪২৩ জনকে দিয়েছেন বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড।
তাদের মধ্যে ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২৬২ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
মোট ৮৫০ জন আসামির মধ্যে খালাস পেয়েছেন ২৭১ জন। আর ৪ জন বিচার চলাকালে মারা যাওয়ায় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।
ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন বিডিআরের তৎকালীন উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) তৌহিদুল ইসলাম, নাসির উদ্দিন খান, মির্জা হাবিব আব্দুর রহিম, আব্দুল জলিল, মেজর গোফরান মল্লিক, ল্যান্সনায়েক শাহ আলম, হাবিলদার আবু তাহের, সিপাহী সেলিম রেজা, শাহ আলম, আলতাফ হোসেন, সাজ্জাদ হোসেন, কাজল, আব্দুল মবিন, বেসামরিক সদস্য জাকির হোসেন, আজিম পাটওয়ারী, রেজাউল করিম, রফিকুল ইসলাম, মিজানুর রহমান।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে বিএনপি নেতা সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন পিন্টু ও আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলী রয়েছেন।
তারা ছাড়া অন্য ১৫৯ জন আসামিকে ৩০২ ধারায় হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন (৩০ বছর) কারাদণ্ডের সঙ্গে প্রত্যেককে ৩৮২ ধারায় অস্ত্র লুণ্ঠনের দায়ে আরও ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ কারণে তারা সাজা খাটবেন মোট ৪০ বছর করে।
নাসির উদ্দিন পিন্টু ও তোরাব আলীকে ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা ও জরিমানা অনাদায়ে আরও ৫ বছরের সাজা প্রদান করা হয়েছে।
২৬২ জন আসামিকে সর্বনিম্ন ৩ বছর থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে পুরান ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে অবস্থিত তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয়, কলঙ্কজনক এবং সর্ববৃহৎ এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানা হত্যাযজ্ঞে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। ইতিহাসের ঘৃণ্যতম নৃশংসতম এ হত্যাকাণ্ডের ৪ বছর ৮ মাস পর মামলার রায় ঘোষণা করা হলো।
রায়ের আদেশে বিচারক বলেন, আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক অনুমোদিত হলে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলিয়ে রেখে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেতে হবে। আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক অনুমোদনের নিমিত্ত মামলার নথিপত্র ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে প্রেরণ করা হোক।
বিচারক আরও বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা ইচ্ছা করলে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে আপিল দায়ের করতে পারবেন।
যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামিদের হাজতবাসকাল তার বিরুদ্ধে প্রদত্ত দণ্ড থেকে বাদ যাবে।
এ রায়ের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের ঘৃণ্যতম একটি নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বিচার শেষ হলো।
রায় ঘোষণার সময় হত্যা মামলার আটক ৮১৩ জন ও জামিনে থাকা ১০ জন আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে মামলার রায়ের পরে ২৪ জনের সাজার বিষয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। ওই আসামিরা তাদের রায় ঘোষণা করা হয়নি বলে চিৎকার শুরু করলেও রাষ্ট্রপক্ষ জানান, তাদের নাম বিচারক বললেও তারা শুনতে পাননি।
সকাল আটটা ২৭ মিনিট থেকে শুরু করে দশটা ৫ মিনিট পর্যন্ত ডান্ডা-বেড়ি পরা ৮১৩ জন আসামিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে আদালতের এজলাসকক্ষে এনে সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়। আসামির সংখ্যাধিক্যের কারণে তাদের এনে জড়ো করতে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়।
জামিনে থাকা ১৩ জনের মধ্যে ১০ আসামি ছিলেন আসামির কাঠগড়ায়। তিনজন উপস্থিত হতে পারেননি। সব মিলিয়ে আটক ও জামিনপ্রাপ্ত ৮২৩ আসামিকে শোনানো হয় মামলাটির রায়। তবে ৮২৬ আসামির উপস্থিতিতেই গত ২০ অক্টোবর মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়।
মামলার রায় শুনতে উদগ্রীব আসামিদের চোখে-মুখে ছিল উৎকণ্ঠা। সম্ভাব্য সাজার আশঙ্কায় তারা অসহায় দৃষ্টি ও ভঙ্গিতে তাকিয়ে ছিলেন আদালতের দিকে।
বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আব্দুল আজিজ আহমেদ, ঢাকা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এহিয়া আজম খান এবং বিডিআর হত্যাযজ্ঞে নিহত ১০ সামরিক কর্মকর্তার স্বজনেরা এজলাসের সামনের সংরক্ষিত স্থানে অবস্থান করেন। তবে রায় শুনতে আসা আসামিদের স্বজনদের এজলাসকক্ষ ও মাঠের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তারা অবস্থান নেন মাঠের বাইরে।
সব মিলিয়ে পিলখানা হত্যা মামলায় আসামির সংখ্যা ছিলেন ৮৫০ জন। বিচার চলাকালে মারা যান ৪ জন। আসামিদের মধ্যে ২০ জন পলাতক আছেন। বিডিআর নন এমন ১৩ জন আসামি জামিনে আছেন। কারাগারে আটক আছেন ৮১৩ জন। কারাগারে আটক ও জামিনপ্রাপ্ত ওই ৮২৬ আসামির উপস্থিতিতেই মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়।
আসামিদের মধ্যে পোশাকধারী বিডিআর সদস্য ৭৮২ জন। বিডিআরে কর্মরত বেসামরিক সদস্য ২৩ জন।
রায় ঘোষণার আগে মামলার চার্জশিটের ১ হাজার ৩৪৫ সাক্ষীর মধ্যে ৬৫৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।
আদালতে দেওয়া সাক্ষীদের মধ্যে ঘটনার শিকার পরিবারের সদস্য, বিডিআর সদস্য, সাংবাদিক, সাধারণ নাগরিক, অস্ত্র ও মোবাইল ফোনসেট বিশেষজ্ঞ, পুলিশ সদস্য, ফায়ার সার্ভিসের সদস্য, রেডক্রিসেন্ট সদস্য, র‌্যাব সদস্য, জব্দ তালিকা প্রস্তুতকারী দলের সদস্য, ম্যাজিস্ট্রেট, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং সে সময়কার বিমান ও নৌ-বাহিনীর প্রধানও রয়েছেন।
সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান মঈন উ আহমেদ মামলার সাক্ষী থাকলেও তিনি আমেরিকায় থাকায় আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেননি।
ঘটনার সময় ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থিত পিলখানায় ৬ হাজার ৯০৩ জন বিডিআর সদস্য কর্মরত ছিলেন। তবে দরবারে উপস্থিত ছিলেন ৯৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ২ হাজার ৪৮৩ জন।
মামলায় ৫ হাজার ৯৬৪টি আলামত জব্দ করা হয়।
মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডে ২ হাজার ৪১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ফায়ার করা হয়েছিল। যার মধ্যে ছিল ১ হাজার ৮৪৫টি রাইফেল, ৫২৮টি এসএমসি, ২৩টি পিস্তল ও ১৮টি এলএমজি।
এ মামলার ১ হাজার ৩৪৫ সাক্ষীর মধ্যে ৬৫৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। ২শ’ ৩২ কার্যদিবসে ওই ৬৫৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেন আদালত।
ফিরে দেখা : কোনো বিদেশি শত্রুর আক্রমণে নয়, নিজের দেশের একদল বিপথগামী বিডিআর সদস্যের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল সেনাবাহিনীর চৌকস অফিসারদের।
রেহাই পাননি তাদের স্ত্রী-সন্তানরাও। হত্যার আগে তাদের ওপর চালানো হয়েছে নির্যাতন। পানির ট্যাংক, বাথরুম কিংবা গাড়ির ভেতরে লুকিয়েও প্রাণ রক্ষা করতে পারেননি তারা। শিকারি কুকুরের মতো গন্ধ শুঁকে শুঁকে বের করে এনে একে একে হত্যা করা হয় তাদের।
আসলে কি ঘটেছিল সেদিন জাতি হয়তো কোনোদিনই জানতে পারবে না। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিছিন্নভাবে কিছু ঘটনা জানা গেলেও অনেক ঘটনা আড়ালেই রয়ে গেছে।
ইতিহাসের বৃহত্তম এ ফৌজদারি মামলার তদন্ত কাজটাও তাই ততোটা সহজ ছিল না। মামলার আলামত মুছে ফেলতে লাশ পুড়িয়ে দেওয়া, গণকবর, ম্যানহোলে ফেলে দেওয়াসহ নেওয়া হয়েছিল বিভিন্ন পদক্ষেপ। তারপরও ঘটনার মাত্র ১ বছর সাড়ে ৪ মাস পর বৃহত্তম এ মামলার বিশাল চার্জশিট আদালতে জমা দেয় সিআইডি।
মামলার কেস ডকেটসহ (সিডি) তদন্ত প্রতিবেদনের ওজন প্রায় আধা মণ। বড় ডিমাই সাইজের কাগজে খুব ছোট অক্ষরে অফসেট কাগজের উভয় পৃষ্ঠায় কম্পিউটার কম্পোজকৃত মূল চার্জশিটটি ১৩২ পৃষ্ঠার। পরে সম্পূরক চার্জশিট দেওয়া হয়।
মামলার পূর্বাপর : বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পুলিশের পরিদর্শক নবজ্যোতি খীসা প্রথমে লালবাগ থানায় এবং পরে নিউমার্কেট থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দু’টি মামলা দায়ের করেন।
মামলা দু’টিতে মোট আসামি ছিলেন ২ হাজার ৩২৮ জন। আসামিদের মধ্যে গ্রেফতার করা হয় ২ হাজার ৩০৮ জনকে। এখনো পলাতক আছেন ২০ জন।
মামলা দায়েরের পর ২ হাজার ১শ’ ৮৭ জনকে গ্রেফতার করে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ড শেষে ৫৫৯ জন আসামি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
পরে প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ১ হাজার ৪৭৪ জনকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এদের মধ্যে বিডিআর নন এমন আসামির সংখা ১৭ জন। মামলার তদন্তকালে মারা যান ৭ জন আসামি।
তদন্ত শেষ করে ২০১০ সালের ১২ জুলাই হত্যা মামলায় ও ২৭ জুলাই বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ।
বিডিআর হত্যা মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামির সংখ্যা ৮৫০ জন। তাদের মধ্যে পোশাকধারী বিডিআর সদস্য ৮২৭ জন এবং বেসামরিক লোক ২৩ জন। বেসামরিক আসামিদের মধ্যে বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন পিন্টু ও আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীও রয়েছেন।
২০১০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মামলা বিচারের জন্য মহানগর দায়রা জজ আদালতে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর মামলা দু’টির ৮৭ হাজার পৃষ্ঠার নথি মহানগর দায়রা আদালতে স্থানান্তর করা হয়।
ঢাকার সিএমএম আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখার তৎকালীন জেনারেল রেকর্ডিং অফিসার (জিআরও) ইন্সপেক্টর মো. রতন শেখ এটিকে উপমহাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ নথি বলে দাবি করেছিলেন।
২০১১ সালের ২৮ মার্চ মামলার এজাহার পাঠের মধ্য দিয়ে অভিযোগ (চার্জ) গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওই বছরের ১০ আগস্ট ৮৫০ আসামির সবার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ওইদিন আসামিরা সবাই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছিলেন।
আসামিদের মধ্যে ২০ জন পলাতক আছেন। বিচার চলাকালীন সময়ে মারা যান আরও ৪ জন। বিডিআর নন এমন ১৩ জন আসামি জামিনে ছিলেন। কারাগারে আটক আছেন ৮১৩ জন।
বিদ্রোহের বিচার নিজস্ব আইনে : গত বছরের ২০ অক্টোবর পিলখানা বিদ্রোহের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর বিচার শেষ হয়েছে বিডিআরের নিজস্ব আইনে। ওই দিন সদর রাইফেলস ব্যাটালিয়নের ৭২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিদ্রোহ মামলার বিচার শেষ হয়।
বিদ্রোহের ঘটনায় ১১টি বিশেষ আদালতে ৬ হাজার ৪৬ জওয়ানকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। তাদের মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে ৫ হাজার ৯২৬ জনের। খালাস পেয়েছেন ১১৫ জন।
তবে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় পিলখানা বিদ্রোহের ঘটনায় পরিকল্পনাকারীদের অন্যতম তৌহিদসহ ছয় ডিএডিকে বিদ্রোহ মামলায় বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। ফৌজদারি অপরাধের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় তারা বিচারের মুখোমুখি হন।
১৯৭৪ সালের যে আইনে বিদ্রোহ মামলার বিচার হয়, তাতে বিদ্রোহের সর্বোচ্চ সাজা সাত বছর। বর্তমানে বিজিবি আইনে বিদ্রোহের সাজা মৃত্যুদণ্ড। পিলখানা বিদ্রোহের পর বিডিআরের নাম বদলে বিজিবি এবং লোগো ও পতাকাও পরিবর্তন করা হয়।

পিন্টুর যাবজ্জীবন

সমাজের কথা ডেস্ক॥ বহুল আলোচিত পিলখানা হত্যা মামলার রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু ও আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড নেতা তোরাব আলীও রয়েছেন।
ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আখতারুজ্জামান মঙ্গলবার ঢাকার বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
৮৪৬ জন জীবিত আসামির সাজা ঘোষণার এক পর্যায়ে বিচারক পিন্টু ও তোরাব আলীকে আলাদাভাবে ডেকে সামনে নিয়ে আসেন এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন।
পাশাপাশি তাদের পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো পাঁচ বছর কারাদণ্ডের আদেশ দেন তিনি।
২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর সদরদপ্তরে বিদ্রোহের ওই ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ অন্তত ৭৪ জন নিহত হন।
ওই হত্যাকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগে পিন্টু ও তোরাব আলীকে ৩০২ ধারায় এই সাজা দেন বিচারক।
রায় ঘোষণার পর ঢাকা মহানগরের ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি তোরাব আলী নিরব থাকেন।
তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা পিন্টু বলেন, “সাক্ষী ছাড়া আমাকে দণ্ড দেয়া হয়েছে। নির্দোষ একটি মানুষকে এই দণ্ড দেয়া হলো।”
পরে প্রিজন ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়ার সময় পিন্টু গণমাধ্যমকর্মীদের ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়েন।
এ মামলায় পিন্টুর বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিদ্রোহের আগের দিন তিনি এ বিষয়ে ‘একটি ষড়যন্ত্রমূলক’ সভায় অংশ নেন। বিদ্রোহ চলাকালে হত্যাযজ্ঞ ও লাশ গুমে সহায়তা করেন। অপরাধ সংগঠনের পর তিনি বিদ্রোহীদের পালাতেও সহায়তা করেন। বিদ্রোহীদের সমর্থনে করা মিছিলে উপস্থিত থেকে হাততালি দিয়ে উৎসাহ দেন।
আর তোরাব আলীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে বলা হয়, বিডিআরের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসাবে তিনি সুপরিকল্পিত এ বিদ্রোহের কথা আগেই জানতে পারেন। কিন্তু তিনি তা কর্তৃপক্ষকে জানাননি।

ন্যায়বিচার হয়েছে: রাষ্ট্রপক্ষ

সমাজের কথা ডেস্ক॥ পিলখানা হত্যা মামলায় ১৫২ আসামির ফাঁসির রায়ে ন্যায়বিচার হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল।
মঙ্গলবার এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ওই দিন সেনা কর্মকর্তাদের খুন করা হয়েছে, লুটপাট করা হয়েছে, সেনা কর্মকর্তাদের সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে। তাদের মৃতদেহকে অসম্মান করা হয়েছে। এই ঘটনার বিচার হলো।”
চার বছর আগে পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে রক্তাক্ত বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়।
ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আখতারুজ্জামান মঙ্গলবার বহু আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে এ মামলার জীবিত ৮৪৬ আসামির মধ্যে ১৫২ জনের ফাঁসির আদেশ দেন বিচারক।
এছাড়া ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২৫৬ জনকে তিন থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেয়া হয়। অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেয়া হয় ২৭৭ জনকে।
রায়ের পর মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, “যে বিচার পেয়েছি তাতে মনে হচ্ছে আমরা ন্যায়বিচারই পেয়েছি।”
যারা খালাস পেয়েছেন, তাদের বিষয়ে আপিল করা হবে কি না-নথিপত্র দেখে সে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
রক্তাক্ত ওই বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পুনর্গঠন করা হয়। নাম বদলের পর এ বাহিনী এখন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) হিসেবে পরিচিত।

‘বাহিনীর কলঙ্ক দূর হলো’

সমাজের কথা ডেস্ক॥ পিলখানায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের মধ্য দিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ‘কলঙ্কতিলক’ দূর হলো বলে মন্তব্য করেছেন বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ।
মঙ্গলবার এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “দীর্ঘদিন আমরা এই রায়ের জন্য অপেক্ষা করে ছিলাম। বিজিবিতে যে কলঙ্কতিলক ছিল- আজ এই রায় ঘোষণার মাধ্যমে তা দূর হলো।”
চার বছর আগে পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে রক্তাক্ত বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়।
ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আখতারুজ্জামান মঙ্গলবার বহু আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে এ মামলার জীবিত ৮৪৬ আসামির মধ্যে ১৫২ জনের ফাঁসির আদেশ দেন বিচারক।
এছাড়া ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২৫৬ জনকে তিন থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেয়া হয়। অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেয়া হয় ২৭৭ জনকে।
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বিজিবির মহাপরিচালক বলেন, “দৃষ্টান্তমূলক সাজা হয়েছে। পরিবারগুলোর যে ক্ষত, তা কাটিয়ে সান্ত্বনা পাবেন। শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে।
“আমি আমার অনেক কোর্সমেটকে হারিয়েছি। এই রায়ের মাধ্যমে আমারও শান্তি লাগছে।”
যারা শাস্তি পেয়েছে, তাদের প্রতি কোনো ‘সহানুভূতি নেই’ বলেও উল্লেখ করেন আজিজ আহমেদ।
২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে পিলখানার দরবার হল থেকে বিডিআর বিদ্রোহের সূচনা হয়। বিডিআরের তখনকার মহাপরিচালক শাকিল আহমেদের বক্তব্যের সময় দুজন সিপাহি মঞ্চে উঠে পড়ে, শুরু হয় রক্তাক্ত বিদ্রোহের।
পরের দুই দিন ধরে বিডিআর মহাপরিচালকসহ ৭৪ জনকে হত্যা করে বিদ্রোহী জওয়ানরা। পিলখানার ভেতরে কর্মকর্তাদের বাড়িঘরে চালানো হয় ব্যাপক লুটপাট ও ভাঙচুর। ৩৩ ঘণ্টা পর শ্বাসরুদ্ধকর এ বিদ্রোহের অবসান হয় আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে।
শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় এ বিদ্রোহের ঘটনা নানা জল্পনা আর অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। পুরো বিশ্বেই ঘটনাটি আলোড়ন তোলে।
রক্তাক্ত ওই বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পুনর্গঠন করা হয়। নাম বদলের পর এ বাহিনী এখন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) হিসেবে পরিচিত।

শেয়ার