সমঝোতার লক্ষ্যে কূটনীতিকদের তৎপরতা বাড়ছে

flage
বাংলানিউজ॥ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সমঝোতা আনতে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা।
বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে প্রধান দু’দলের মধ্যে সংলাপেই সমাধান দেখছেন তারা। আর তাই দু’দলের প্রতি বারবারই থাকছে তাদের সমঝোতার আহ্বান।
খোদ জাতিসংঘ থেকে শুরু করে সব বন্ধু রাষ্ট্রই বাংলাদেশ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে। সবারই চাওয়া যেকোনো মূল্যেই প্রধান দু’দলের মধ্যে সমঝোতা আনা। তারা মনে করেন, দু’দল সমঝোতায় পৌঁছালেই এদেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হবে। গণতন্ত্র রক্ষা পাবে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব কাটাতে যখনই সব উদ্যোগ ব্যর্থ হচ্ছে, তখনই বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে তৎপরতা বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
নিজেদের মধ্যে আলোচনা ছাড়াও রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। তবে এ আলাপ আলোচনা প্রকাশ্যের চেয়ে অপ্রকাশ্যেই বেশি।
রোববার রাতেও বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আসা মার্কিন প্রতিনিধি দলের সম্মানে মার্কিন শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের বাসায় এক পার্টিতে রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী নেতা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। মূলত সংলাপ, সমঝোতাই ছিল আলোচনার বিষয়বস্তু।
আলোচনায় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, রিয়াজ রহমান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, ব্যাবসায়িক প্রতিনিধিদের মধ্যে সালমান এফ রহমান, ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করায় তিনি এ পার্টিতে ছিলেন না।
বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের মধ্যেও এ ধরনের বৈঠক বা পার্টিতে মিলিত হওয়া বেশ কিছুদিন ধরে বেড়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানায়।
এদিকে রাজনৈতিক সংকট নিয়ে জাতিসংঘসহ প্রভাবশালী কিছু দেশের দূতাবাস থেকে নানা বক্তব্য-বিবৃতি এসেছে। হরতালকালীন সহিংসতা বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সব দলকে গণতান্ত্রিক আচরণের আহ্বান জানানো হয়েছে এসব বিবৃতিতে।
এসব দেশের কূটনীতিকরা দলগুলোর ফর্মুলা জানতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেও দেখা করছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এদেশে অবস্থানরত কূটনীতিকদের ডেকে সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফিং করেছেন। সেখানেও কূটনীতিকরা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে দু’দলের সংলাপের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে সমঝোতার পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রত্যেক দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কন্নোয়নে এদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি বলেই মনে করেন কূটনীতিকরা। এ লক্ষ্যে সংলাপের আহ্বান অব্যাহত রেখেছেন তারা।
সর্বশেষ এক বার্তায় জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে পরমত সহিষ্ণুতা চর্চা ও শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন। সংলাপ আয়োজনে সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো অব্যাহত থাকবে বলেও জাতিসংঘের মহাসচিব আশা প্রকাশ করেন।
কূটনৈতিক সূত্র বলছে, এদেশের রাজনৈতিক জটিল পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি এসব বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন।
এদিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো হলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মাথা ঘামাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে প্রধান প্রতিবেশী দেশ ভারত। তবে বাংলাদেশ বিষয়ে দৌঁড় ঝাপ অব্যাহত রেখেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মজীনা।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি রাজনৈতিক সংকট বিষয়ে সরকার, বিরোধী দলীয় নেতা এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সূত্র বলছে, ভারত সফরের পরে বাংলাদেশ বিষয়ে দেশটির মনোভাব এবং এদেশের বতর্মান রাজনৈতিক অবস্থা ওয়াশিংটনের কাছে ব্যাখ্যা করবেন মজীনা।
এদিকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার আগে গত মঙ্গলবার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণের বাসভবনে গিয়ে সোয়া এক ঘণ্টা বৈঠক করেন। এখানেও বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
তবে সূত্র জানায়, কূটনীতিকদের এসব তৎপরতার পেছনে প্রতিটি দেশের আলাদা কিছু স্বার্থ জড়িত রয়েছে। বিভিন্ন দেশের আঞ্চলিক নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব বিবেচনা করেই তারা এ ধরনের ভূমিকা রাখেন বা উদ্বেগ প্রকাশ করেন বলে জানিয়েছে একাধিক কূটনৈতিক সূত্র।
তবে ঢাকার সাবেক কূটনীতিকরা বলছেন, বন্ধু হিসেবে সমঝোতার পরামর্শ দেওয়া বা এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া খারাপ কিছু নয়। তবে এটি যাতে চাপে পরিণত না হয় সে বিষয়ে রাজনীতিবিদদের শক্ত অবস্থান নিতে হবে। রাজনীতিবিদদের যেকোনো ধরনের দুর্বলতা বিদেশিদের সুযোগ করে দেবে।
এ বিষয়ে অবশ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি কূটনীতিকদের ‘কূটনৈতিক শিষ্টাচার’ মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বন্ধু রাষ্ট্র উদ্বেগ জানাবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু শিষ্টাচার মেনে যেকোনো উদ্বেগ আমাদের জানালেই ভালো হবে।

শেয়ার